সববাংলায়

ভারতীয় নির্বাচনে জামানত বাজেয়াপ্ত

নির্বাচন এলেই বিভিন্ন প্রার্থীকে অপর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী সম্পর্কে বলতে শোনা যায় তিনি নাকি এতটাই কম ভোট পাবেন যে তাঁর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়ে যেতে পারে। এখন ভারতীয় নির্বাচন প্রক্রিয়ায় এই জামানত ব্যাপারটা কি আর জামানত বাজেয়াপ্তই বা হয় কেন সেটা কিন্তু অনেকেই জানেন না। এখানে সেটাই আলোচনা করা হল।

ভারতীয় নির্বাচনী ব্যবস্থায় যখন কোন প্রার্থী কোনও আইনসভার আসনের জন্য নির্বাচনে লড়ার জন্য দাঁড়ান তাঁকে নির্বাচনে দাঁড়ানোর অনুমতি নেওয়ার জন্য নির্বাচনী কর্তৃপক্ষকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমা করতে হয়। এই অর্থকেই জামানত (security deposit ) বলে।

জনগণের প্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫১ এর ধারা ৩৪, ১ (ক) অনুসারে সংসদীয় আসনের ক্ষেত্রে সাধারণ প্রার্থীদের জন্য ২৫,০০০ টাকা এবং বিধানসভা আসনের জন্য ১০০০০ টাকা জামানত হিসেবে নির্বাচন কমিশনকে দেওয়া বাধ্যতামূলক। ধারা ৩৪, ১ (খ) অনুসারে তপশিলি জাতি ও উপজাতিদের ক্ষেত্রে উপরিউক্ত অর্থের অর্ধেক জামানত হিসেবে জমা করতে হয়। অর্থ জমা করার বিষয়টি না থাকলে হয়ত অনেকেই খেলাচ্ছলে প্রার্থী হিসেবে ইচ্ছেমত মনোনয়ন জমা দিয়ে আবার ইচ্ছেমত তা প্রত্যাহারও করে নিতে পারত। এই সম্ভাবনা কমাতেই টাকা জমা দেওয়ার এই নিয়মটি কমিশন তৈরি করেছে যাতে প্রকৃত ইচ্ছুক প্রার্থীরাই কেবল নির্বাচনে লড়তে পারে।

সাধারণ ক্ষেত্রে, প্রার্থী নির্বাচন কমিশন প্রদত্ত ভোটের একটি নির্দিষ্ট অনুপাত প্রাপ্ত হলে গণনা শেষে প্রার্থীদের তাঁদের থেকে জামানত হিসেবে সংগ্রহ করা আমানত বা অর্থ ফেরত দেওয়া হয়। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে এই অর্থ ফেরত না দেওয়া হলে একে জামানত বাজেয়াপ্ত করা বলা হয়। ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, কোনও কেন্দ্রে মোট যত বৈধ ভোট পড়েছে, কোনও প্রার্থী তার ১/৬ অংশের কম ভোট পেলে তাঁর জামানত বাজেয়াপ্ত (forfeiture of security deposit) হয়। অর্থাৎ কোনও প্রার্থী যদি কোনও আসনে প্রদত্ত মোট বৈধ ভোটের ১/৬ অংশের কম ভোট পান তবে প্রার্থী মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময় জামানত হিসেবে যে টাকা(সংসদীয় আসনের ক্ষেত্রে সাধারণ প্রার্থীদের জন্য ২৫,০০০ টাকা এবং বিধানসভা আসনের জন্য ১০০০০ টাকা) জমা দিয়েছিলেন তা তিনি আর ফেরত পাবেন না।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যদি কোনও বিধানসভা আসনে এক লক্ষ বৈধ ভোট পড়ে, তবে প্রতিটি প্রার্থীকে সেই বিধানসভা আসনের জন্য মোট বৈধ ভোটের ১/৬ অংশ অর্থাৎ ১৬,৬৬৬ এর বেশি ভোট অবশ্যই পেতে হবে। যদি এর থেকে একটিও ভোট তিনি কম পান অথবা যদি ঠিক ১/৬ অংশ পরিমাণ ভোট পান তাহলে তাঁর জামানত বাজেয়াপ্ত করা হবে।

১৯৫১-৫২ সালে আয়োজিত প্রথম লোকসভা নির্বাচনে ১৮৭৪ জন প্রার্থীর মধ্যে ৭৪৫ জন অর্থাৎ সারা দেশের মোট প্রার্থীর প্রায় ৪০ শতাংশের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। এরপরথেকে প্রায় সমস্ত লোকসভা নির্বাচনে ধারাবাহিকভাবে জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়ার ধারাটি বজায় থাকে। ১৯৯৬ সালে একাদশ লোকসভা নির্বাচনের সময়ে এসেছিল, যেখানে মোট ১৩৯৯২ জন প্রার্থীর ৯১ শতাংশ বা ১২৬৮৮ জন প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছিল।

কেবল বাজেয়াপ্ত নয় জামানত ফেরতও দেওয়া হয়। জামানত যে যে কারণে ফেরত দেওয়া হয় সেগুলি হল –

১. যদি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের তালিকায় প্রার্থীর নাম না দেখানো হয় তবে এর অর্থ হল নির্বাচন কমিশন তাঁর নামটি প্রত্যাখ্যান করেছে বা তিনি প্রার্থী পদ প্রত্যাহার করেছেন। বা

২. ভোটদান শুরুর আগে প্রার্থী মারা গেলে; বা

৩. প্রার্থী নির্বাচনে জয়ী হলে; বা

৪. যদি কোন প্রার্থী বিজয়ী না হন তবে তিনি নির্বাচনী এলাকায় মোট বৈধ ভোটের ১/৬ অংশের বেশি ভোট পেলে।

তবে এমনও দেখা গেছে যখন কোনও নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থী মোট বৈধ ভোটের ১/৬ অংশ না পেয়েও জিতেছেন। সেক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে কোন নির্বাচনে জয়ের জন্য ন্যূনতম ভোট পাওয়ার কোনও সীমা নেই।

ভারতের নির্বাচন কমিশন দেশে অবাধ ও নিরপেক্ষ সংসদ ও বিধানসভা নির্বাচন পরিচালনা করতে বিবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। নির্বাচনে লড়ার জন্য অর্থ জমা নেওয়া তাদের মধ্যে অন্যতম একটি পদক্ষেপ।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading