ইতিহাস

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ

বিংশ শতাব্দীর বিশ্ব সাহিত্যে জাদুবাস্তবতার উদ্‌গাতা হিসেবেই বিখ্যাত লাতিন আমেরিকার সাহিত্যিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ (Gabriel García Márquez)। একাধারে একজন কলম্বিয়ান ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, সাংবাদিক এবং চিত্রনাট্যকার ছিলেন তিনি। সমগ্র লাতিন আমেরিকা জুড়ে ‘গ্যাবো’ নামেই সমধিক পরিচিত ছিলেন মার্কেজ। ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত তাঁর লেখা ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অফ সলিচিউড’ অর্থাৎ ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ উপন্যাসটিই তাঁকে আবিশ্ব বিখ্যাত করে তোলে। স্পেনীয় ভাষায় লেখা তাঁর সাহিত্যকৃতির জন্য ১৯৮২ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ । মার্কেজের লেখা ‘লাভ ইন দ্য টাইম অফ কলেরা’, ‘দ্য অটাম অফ দ্য প্যাট্রিয়ার্ক’, ‘ক্রনিকল অফ এ ডেথ ফোরটোল্ড’ ইত্যাদি তাঁর বিখ্যাত উপন্যাসগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

১৯২৭ সালের ৬ মার্চ কলম্বিয়ার আরাকাটাকাতে গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের জন্ম হয়। তাঁর বাবা সান্তিয়াগো মার্কেজ ইগুয়ারান একজন ফার্মাসিস্ট ছিলেন এবং তাঁর মায়ের নাম ছিল গ্যাব্রিয়েল এলিজিও গার্সিয়া। তাঁর বাল্যকালের ডাকনাম ছিল ‘গ্যাবো’। ছোটবেলায় কাজের সূত্রে তাঁর বাবা-মা দুজনেই আরাকাটাকায় দাদু-দিদার কাছে গ্যাবোকে রেখে চলে গিয়েছিলেন বারানকুইলোয়। মার্কেজের দাদুর নাম ছিল কর্নেল নিকোলাস রিকার্দো মার্কেজ মেজিয়া এবং দিদার নাম ছিল ডোনা ট্র্যাঙ্কুইলিনা ইগুয়ারান। মার্কেজের শৈশবে তাঁর দাদু-দিদার এক বিরাট প্রভাব ছিল। তাঁর দাদু ছিলেন এক যুদ্ধের সৈনিক। কলম্বিয়ার উদারপন্থীদের কাছে একজন বীর হিসেবে যথেষ্ট সম্মানিত ছিলেন তিনি। একইসঙ্গে তিনি দারুণ সুন্দর গল্প বলতে পারতেন। দাদুর কাছেই অভিধান দেখে দেখে শব্দ শিখেছেন মার্কেজ, প্রতি বছর দাদুর সঙ্গে সার্কাসে যেতেন তিনি এবং দাদুই তাঁকে প্রথম বরফ চিনিয়েছিলেন। অন্যদিকে তাঁর দিদা ডোনা ট্র্যাঙ্কুইলিনাও গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছিলেন মার্কেজের জীবনে। ভূত, প্রেত, দৈত্য-দানব ইত্যাদি নানাবিধ অলৌকিক আজগুবি বিষয়ের বইপত্র ছিল তাঁর দিদার কাছে। এমনকি তাঁর দিদা নিজেও অসম্ভব ভালো রূপকথার গল্প বলতে পারতেন। অসম্ভব, মিথ্যা, অলীক অনেক গল্প তাঁর দিদা এমনভাবে উপস্থাপন করতে পারতেন তা মার্কেজের বাল্যকালে সত্য বলেই মনে হত। পরবর্তীকালে ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ উপন্যাস লেখার সময় তাঁর দিদার এই গল্পকথন রীতি তাঁকে প্রভূত সহায়তা করেছিল। পরবর্তীকালে ১৯৫৮ সালে মার্সিডিজ বারাক্কার সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়।

রিও ম্যাগডেলেনার বন্দর বারানকুইলাতে সুক্‌র নামের একটি শহরে প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় মার্কেজের। এখানে পড়ার সময় থেকেই একজন ভিতু, আত্মমগ্ন বালক হিসেবে তাঁর পরিচিতি গড়ে উঠল যে কিনা অসাধারণ সব কবিতা আর কমিক স্ট্রিপ লিখতে পারত। খেলাধুলায় তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল না বলে তাঁর সহপাঠীরা তাঁকে ‘এল ভেইজো’ নামে ডাকত। ১৯৪০ সালে ‘কলেজিও জেসুইটা স্যান দোজ’ নামের একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রথম বছরেই বিদ্যালয়ের পত্রিকায় ‘জুভেন্টুড’ নামে তাঁর লেখা কবিতা প্রকাশিত হয়। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে একটি বৃত্তি পান মার্কেজ এবং প্রথমে বোগোটায় আর তারপরে ‘লিসিও ন্যাশনাল ডি জিপুকুইরা’ (Liceo Nacional de Zipaquirá) প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন তিনি। বোগোটায় পড়াকালীন ফুটবল, বেসবল এবং দৌড়ে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করেছিলেন গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ, এমনকি তিনি তাঁর স্কুলের দলের অধিনায়ক পদেও উন্নীত হয়েছিলেন। ১৯৪৭ সালে স্নাতক উত্তীর্ণ হওয়ার পরে বোগোটার ইউনিভার্সিদাদ ন্যাশনাল ডি কলম্বিয়া প্রতিষ্ঠানে আইন পড়ার জন্য ভর্তি হন মার্কেজ। কিন্তু বেশিরভাগ সময়েই তিনি গল্প-উপন্যাস পড়েই কাটিয়ে দিতেন। বোর্হেসের অনূদিত ফ্রানৎজ কাফকার লেখা ‘মেটামরফোসিস’ বইটি তাঁকে প্রভূত অনুপ্রাণিত করেছিল। এরপর থেকেই দিদার গল্প বলার শৈলী অনুসরণ করে নিত্যদিনের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই তাঁর সাহিত্যচর্চার সূত্রপাত ঘটে। ১৯৪৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ‘এল এস্পেক্টেদোর’ নামের একটি সংবাদপত্রে মার্কেজের লেখা প্রথম গল্প ‘লা টার্সেরা রেসিগনেসিওন’ অর্থাৎ ‘তৃতীয় পদত্যাগ’ প্রকাশিত হয়। তাঁর বাবাকে খুশি করতে ১৯৪৮ সালে আইন পড়া চালিয়ে যান তিনি। ঠিক এই সময়েই কলম্বিয়ার একজন বিখ্যাত নেতার হত্যাকে কেন্দ্র করে উত্তেজিত জনতা মার্কেজের হোস্টেল বাড়িটি আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এরপরে গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ ‘ইউনিভার্সিদাদ ডি কার্টেগনা’-তে স্থানান্তরিত হয়ে যান এবং ‘এল ইউনিভার্সাল’ পত্রিকায় একজন সাংবাদিক হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন তিনি।

সাংবাদিকতার মধ্য দিয়েই প্রথমে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ। ‘এল হেরাল্ডো’ পত্রিকাতেও সাংবাদিকতা করেছিলেন তিনি। লেখাপড়া শেষ করে স্থায়ীভাবে বারানকুইলা শহর চলে আসেন মার্কেজ। ১৯৫০ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত বারানকুইলার স্থানীয় পত্রিকায় ‘সেপ্টিমাস’ নামে একটি ধারাবাহিক লেখা লিখেছিলেন তিনি। এই সময় ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত ‘এল এক্সপেক্টোদর’ পত্রিকার জন্য চলচ্চিত্র সমালোচনাও করেছেন মার্কেজ। ১৯৫৭ সালে ‘মোমেন্টো’ পত্রিকায় কাজ করতে শুরু করেন। ১৯৫৮ সালের মার্চ মাসে কলম্বিয়ায় ফিরে যান গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ। স্বল্প দিনের মধ্যেই ‘ভেনেজুয়েলা গ্রাফিকা’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে কাজ করতে শুরু করেছিলেন মার্কেজ। আজীবন সমাজতান্ত্রিক বিশ্বাসের প্রতি অনুগত থেকে ঘোষিত বামপন্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ। ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল। অ্যাঙ্গোলার গৃহযুদ্ধে কিউবার মানুষদের সক্রিয় অংশগ্রহণকে উদ্বুদ্ধ করতে তিনি ১৯৯১ সালে প্রকাশ করেন ‘চেঞ্জিং দ্য হিস্ট্রি অফ আফ্রিকা’। ১৯৫৫ সালে ‘এল এক্সপেক্টেদোর’ পত্রিকার জন্য ধারাবাহিকভাবে ১৪টি কিস্তিতে ‘দ্য স্টোরি অফ এ শিপরেকেড সেইলার’ নামে তাঁর প্রথম উপন্যাস লেখেন গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ। কলম্বিয়া নৌবাহিনীর একজন নাবিক লুইস আলোসান্দ্রো ভ্যালেস্কোর সাগরের বুকে বেঁচে থাকার সংগ্রামকে কেন্দ্র করেই এই উপন্যাসটি লিখেছিলেন মার্কেজ। পরে নাবিক ভ্যালেস্কোর স্বাক্ষর সম্বলিত আকারে এই উপন্যাসটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। মূলত পত্রিকার জন্য নেওয়া ভ্যালেস্কোর সাক্ষাৎকার অবলম্বনেই এই উপন্যাসটি লেখা সমাপ্ত করেছিলেন তিনি। উত্তম পুরুষে এবং ছদ্মনামে এই উপন্যাসটি লিখেছিলেন মার্কেজ। কিন্তু এই উপন্যাস প্রকাশের পরেই তৎকালীন সরকারের আক্রোশ গিয়ে পড়ে মার্কেজের উপর এবং তিনি বাধ্য হয়ে দেশ ছেড়ে ইউরোপের নানা শহরে ঘুরে ঘুরে বিদেশি সংবাদপত্রে সাংবাদিকতা করতে থাকেন গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ।

তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘লিফ স্টর্ম’ প্রকাশ পেয়েছিল উপন্যাস লেখার সাত বছর পর। ১৯৫৫ সালে এই উপন্যাসটি প্রকাশ পায় এবং মার্কেজ পরবর্তীকালে নিজেও এই লেখাটিকে তাঁর একান্ত পছন্দের বলে মনে করতেন। এরপর ১৯৬২ সালে প্রকাশ পায় তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘ইন এভিল আওয়ার’। এই উপন্যাসের বেশ কিছু চরিত্র পুনরায় লক্ষ্য করা যায় মার্কেজের লেখা সবথেকে জনপ্রিয় উপন্যাস ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অফ সলিচিউড’-এ। দীর্ঘ আঠারো মাস ঘরবন্দি হয়ে এই উপন্যাস লেখা শেষ করেছিলেন গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ। ১৯৬৭ সালে এই বইটি প্রকাশ পায় এবং তারপর থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত প্রায় ৩ কোটি কপি বিক্রি হয়েছে এই বইটির। তাছাড়া বিশ্বের মোট ৩৭টি ভাষায় মার্কেজের এই উপন্যাসের অনুবাদও হয়েছে। বলা যায় এই উপন্যাসটিই তাঁকে আবিশ্ব বিখ্যাত করে তুলেছে এবং চিরস্মরণীয় করে রেখেছে। এক্ষেত্রে ফ্যান্টাসি এবং পরাবাস্তবতার মিশেলে তাঁর দিদার গল্প বলার শৈলী অনুসরণ করেছেন মার্কেজ। শোনা যায় দীর্ঘ সময় কোনও কাজ বা উপার্জন না করে এই উপন্যাস লেখায় যাতে মনোনিবেশ করতে পারেন, তাই পরিবার প্রতিপালনের জন্য নিজের অতি প্রিয় গাড়িটিও বিক্রি করে দিয়েছিলেন মার্কেজ। মাকোন্দো নামের একটি কল্পিত শহরের বুয়েন্দিয়া পরিবারের সাত প্রজন্মের কাহিনী নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অফ সলিচিউড’ উপন্যাসটি। এরপরে ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত হয় মার্কেজের আরেকটি বিখ্যাত উপন্যাস ‘লাভ ইন দ্য টাইম অফ কলেরা’ অর্থাৎ ‘কলেরার দিনগুলিতে প্রেম’ যা কিনা প্রকাশের পরপরই ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়। ২০০৭ সালে এই উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে। এছাড়াও তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস হল ‘দ্য অটাম অফ দ্য প্যাট্রিয়ার্ক’ যেখানে কুখ্যাত এক স্বৈরতান্ত্রিক ক্যারিবিয়ান নায়কের কথা বলা আছে। সমালোচকেরা মনে করেন এই নায়ক আসলে কলম্বিয়ার স্বৈরাচারী শাসক জেনারেল গুস্তাভো। এই জেনারেলের হুমকিতেই দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ। শুধু উপন্যাস নয়, বহু ছোটগল্প লিখেছেন তিনি, লিখেছেন বেশ কিছু নিবন্ধও। এমনকি নিজের লেখা গল্প-উপন্যাস অবলম্বনে বহু চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেছেন মার্কেজ।

১৯৮২ সালে ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ উপন্যাসটির জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ।

২০১৪ সালের ১৭ এপ্রিল গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের মৃত্যু হয়।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

তথ্যসূত্র


  1. উৎপল ভট্টাচার্য (সম্পা:), 'সাক্ষাৎকার সংগ্রহ গ্যাব্রিয়ে গার্সিয়া মার্কেস', কবিতীর্থ, জানুয়ারি ২০১৬, পৃষ্ঠা ৪৬-৭০
  2. https://www.britannica.com/
  3. https://en.wikipedia.org/
  4. https://www.nobelprize.org/
  5. https://www.cliffsnotes.com/
  6. https://www.anandabazar.com/

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়