সববাংলায়

গ্লোরিয়া রামিরেজ ।। এক বিষাক্ত নারী

বিভাগঃ ,

গ্লোরিয়া রামিরেজ এর (Gloria Ramirez) জন্ম ১৯৬৩ সালের ১১ জানুয়ারি আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ায় এবং ১৯৯৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারী ৩১ বছর বয়সে সার্ভিক্যাল ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। তিনি ইতিহাসে বিষাক্ত নারী (toxic lady) নামেই খ্যাত হয়ে আছেন। সার্ভিক্যাল ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তিনি যখন একটি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি হন চিকিৎসার কারণে তাঁর দেহ এবং রক্তের সংস্পর্শে আসা চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের বেশ কয়েকজন অজ্ঞান হয়ে পড়েন, কেউ আবার প্রবল শ্বাসকষ্টে ভুগতে শুরু করেন। এই অসুস্থ স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে পাঁচজনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয় যাদের মধ্যে একজনের অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক হয়ে পড়লে তাঁকে ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (ICU) দু’সপ্তাহ ভর্তি থাকতে হয়।

হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর চিকিৎসকরা দেখেন তাঁর হৃদস্পন্দন অত্যন্ত দ্রুত হচ্ছে সেই সাথে শ্বাস প্রশ্বাসের হার কমে আসছে। তখন তাঁরা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নেন তাঁকে জীবনদায়ী ইঞ্জেকশান দিতে হবে। ইঞ্জেকশান দেওয়ার জন্য গ্লোরিয়ার কাছে গেলে স্বাস্থ্যকর্মীরা দেখেন তাঁর মুখ থেকে একপ্রকার ঝাঁঝালো গন্ধ নির্গত হচ্ছে। তাঁরা দ্রুত কার্যকরী ড্রাগ ভ্যালিয়াম, ভারসেড এবং অ্যাটিভান একসাথে তাঁর শরীরে ইঞ্জেক্ট করেন যাতে তিনি ঘুমিয়ে পড়েন ও সেই সাথে গ্লোরিয়ার হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক করতে লিডোকেইন (LIDOCAINE) ও ব্রেটিলিয়াম প্রয়োগ করেন। এতেও যখন গ্লোরিয়ার শারীরিক অবস্থার কোন উন্নতি দেখা গেল না তখন তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন তাঁর হৃদপিণ্ডে ইলেকট্রিক চার্জ করে ডিফাইব্রিলেট করতে হবে। এজন্য তাঁরা তাঁর জামা ছিঁড়ে তাঁর বুকে প্যাডেড ইলেকট্রোড বসাতে গিয়ে দেখেন তাঁর সারা গা তৈলাক্ত হয়ে আছে। এরপর নার্স যখন তাঁর হাত থেকে রক্তের নমুনা সংগ্রহ করেন তিনি দেখেন গ্লোরিয়ার রক্ত থেকে অ্যামোনিয়ার মত একপ্রকার গন্ধ নির্গত হচ্ছে। যে সমস্ত চিকিৎসক তাঁর চিকিৎসায় নিয়োজিত ছিলেন তাঁরা এই সিদ্ধান্তে আসেন যে গ্লোরিয়ার হৃদযন্ত্র বিকল হওয়ার সঙ্গে এই অস্বাভাবিক ব্যাপারের কোনও সম্বন্ধ নেই। এর মধ্যেই হঠাৎ সেখানে উপস্থিত এক নার্স অজ্ঞান হয়ে যান। অন্য আরেক নার্সের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। তৃতীয় আরেক নার্সের প্রথম দু’জনের মতো অবস্থা না হলেও তিনি টের পান তাঁর হাত এবং পা অসাড় হয়ে গেছে।

গ্লোরিয়া রামিরেজ সেই রাত্রেই মারা যান। এমনকি রোগী মারা যাওয়ার পরেও গোটা হাসপাতাল এক রহস্যময়তায় আবৃত থাকে। মুহূর্তের মধ্যে দেশজোড়া আকর্ষণের বিষয় হয়ে ওঠে এই হাসপাতাল। হাসপাতালের ৩৭ জন এমার্জেন্সি স্বাস্থ্যকর্মীর মধ্যে ২৩ জন কোন না কোন উপসর্গ অনুভব করেন তাঁদের শরীরে। মৃতদেহ হস্তান্তরের সময় লরেন্স লিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির (যারা পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর সাথে যুক্ত) ফরেন্সিক বিজ্ঞানীদের একটি স্পেশাল টিম অত্যন্ত সাবধানতার সাথে মৃতদেহের কাছে কোনও বিষাক্ত গ্যাস, বিষাক্ত রাসায়নিক অথবা কোনও বাইরের বস্তু তাঁর মধ্যে আছে কিনা দেখতে যান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁরা তাঁদের তদন্ত শেষে হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মী যাঁরা গ্লোরিয়ার চিকিৎসা করছিলেন তাঁদের অসুস্থ হওয়ার পেছনে কোনও বিশেষ কারণ খুঁজে পাননি।

সেই স্পেশাল টিম গ্লোরিয়ার মৃতদেহটিকে একটি অ্যালুমিনিয়ামে ঢাকা আধারে এক সপ্তাহ রেখে দেয়। ফরেন্সিক(Forensic)বিভাগ এই ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত শুরু করে এরপর। বিভাগের আধিকারিকরা গ্লোরিয়া দেহের তিনবার ময়না তদন্ত করেন। প্রথমটি গ্লোরিয়ার মৃত্যুর ছয় দিন পরে। তারপর ছয় সপ্তাহ পরে এবং শেষেরটি তাঁকে কবরস্থ করার ঠিক আগে।

সব মিলিয়ে তাঁরা এই ধারণায় আসেন গ্লোরিয়া রামিরেজ ঘরোয়া ব্যাথা উপশমকারী ওষুধ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে ডাইমিথাইল সালফক্সাইড ব্যবহার করছিলেন। আইসিইউ তে যখন তাঁকে অক্সিজেন দেওয়া হয় অক্সিজেনের সংস্পর্শে এই ডাইমিথাইল সালফক্সাইড বিক্রিয়া হয়ে ডাইমিথাইল সালফোনে রূপান্তরিত হয়। সাধারণ তাপমাত্রায় এই ডাইমিথাইল সালফোন ক্রিস্টালে পরিণত হয় যার প্রমাণ গ্লোরিয়ার রক্তেও পাওয়া যায়। তাঁর বুকে যখন ইলেকট্রিক শক দেওয়া হয় সেই ইলেকট্রিক শকে ডাইমিথাইল সালফোন ভেঙ্গে গিয়ে তৈরি হয় ডাইমিথাইল সালফেট যা অত্যন্ত বিষাক্ত এবং ঝাঁঝালো একটি গ্যাস। এই গ্যাসের কারণেই স্বাস্থ্যকর্মীরা অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তবে মনে রাখার বিষয় এটি একটি ধারণা। আসল কারণ এখনো অধরা।

গ্লোরিয়া রামিরেজকে অলভিউড মেমোরিয়াল পার্কে কবর দেওয়া হয়। সে সময় সংবাদপত্রে এই ঘটনা বেশ ফলাও করে ছাপা হয়েছিল।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading