ইতিহাস

বাংলায় রথযাত্রার ইতিহাস

জগন্নাথের সাথে রথযাত্রা আর রথযাত্রার সাথে ওড়িশার নাম অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত । কিন্তু ওড়িশার এই সুপ্রাচীন ঐতিহ্যশালী রথযাত্রাটি কিভাবে বাংলার সংস্কৃতিতে(history of rathyatra in Bengal) ঢুকে পড়ল সেটা আমরা অনেকেই জানিনা।আজ সেটাই একটু জেনে নেব।

প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়, হুগলি জেলার মাহেশ-এর রথযাত্রাই বাংলার প্রাচীনতম রথযাত্রা।১৩৯৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে এই মাহেশের রথযাত্রা

হাওড়ার বাঁদুরি পরিবারের জগন্নাথ রথের দিনেও মাসির বাড়ি যায়না। পরিবারের ৬০০ বছরের রীতি বাঁদুরি পরিবারে জগন্নাথ দেব, রথের দিন বিকেলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে মেলা ঘুরে আবার নিজের বাড়ি ফিরে আসে।পরিবারের প্রথম পুরুষ সূর্য কুমার বাঁদুরি এই  রথযাত্রার প্রচলন করেন।

প্রাচীনত্বের নিরিখে সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের রথযাত্রা  কম প্রাচীন নয়। ১৭১৯ সালে বড়িশা গ্রামে সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের রথযাত্রা শুরু করেছিলেন রায় কৃষ্ণদেব মজুমদার চৌধুরী। সেসময় ন’টি চূড়াবিশিষ্ট রথে শালগ্রামশিলা নিয়ে যাওয়া হত জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রার পরিবর্তে।পরবর্তীকালে ১৯১১-এ জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামের বিগ্রহ ও একটি ত্রিতল রথ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৩৪ থেকে মূর্তি গুলিকে রথের সময় হীরালাল বসুর বাড়িতে (যেটিকে জগন্নাথের 'মাসির বাড়ি' ধরে নেওয়া হয়) নিয়ে যাওয়া হয়। ১৯৮৪ সাল নাগাদ স পুরী থেকে কারিগর এনে নতুন রথ তৈরি করা হয়।

১৭৪০ সালে  হুগলী জেলার গুপ্তিপাড়ার রথ উৎসব শুরু করেন মধুসুদানন্দ।পুরীর রথের সঙ্গে গুপ্তিপাড়ার রথের প্রধান পার্থক্যই হল, পুরীর রথকে জগন্নাথ দেবের রথ বলে। আর গুপ্তিপাড়ার রথকে বলে বৃন্দাবন জীউর রথ। এখানকার রথের প্রধান বৈশিষ্ট্য, এখানে ভান্ডার লুট হয়।রথযাত্রায় ভারতবর্ষের কোথাও এই ভান্ডার লুট হয়না।

মেদিনীপুরের মহিষাদলের রথের ঐতিহ্যের কথা এ প্রসঙ্গে না বললেই নয়।মহিষাদল রাজ পরিবারের রাজা আনন্দলাল উপাধ্যায়  মারা যাওয়ার পর সহধর্মিণী রানি জানকী রাজত্ব  ভার গ্রহন করেন।১৭৭৬ সালে রানি জানকীই এই রথযাত্রা শুরু করেন।তৎকালীন সময়ে এই রথ তৈরিতে খরচ পড়েছিল প্রায় ৬৪ হাজার টাকা।

১৮৩৮ সালে এক লক্ষ ২২ হাজার ১১৫ টাকা খরচ করে রুপোর রথ বানিয়ে রথ যাত্রা শুরু করে রানি রাসমণি। সেই রথের সঙ্গে ছিল দু’টি সাজানো ঘোড়া, একটি সারথি এবং চারটি পরী। এগুলিও ছিল রুপোর। এই রথযাত্রা শুরু হয় ১৮৩৮ সালে। রথযাত্রা উপলক্ষে সে যুগে যুঁই ফুলের মালা কেনা হত কম করে আড়াই থেকে তিন মণ। আগে জানবাজারের রানি রাসমণির বাড়িতে হলেও এখন এই রথযাত্রা হয় দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দিরে।

প্রায় দুশো বছর ধরে দর্জিপাড়ায় রাজকৃষ্ণ মিত্রের বাড়িতে হয়ে আসছে কূলদেবতা রাজরাজেশ্বরের রথযাত্রা। বাড়ির সকলে এ দিন চামর দিয়ে বাতাস করতে করতে তিন বার রথকে প্রদক্ষিণ করেন। পুজোয় করবী ফুল দিয়ে হোম করা হয়। এই উপলক্ষে দেওয়া হয় হরির লুঠ। রথের আর এক ঐতিহ্য ইলিশবরণ। নোড়ার উপর জোড়া ইলিশ রেখে ছোট মাছটির মাথায় সিঁদুর দেওয়া হয়। পরে ধানদূর্বা দিয়ে মাছ দু’টিকে বরণ করা হয়।

১৮৬২ তে নৈহাটির কাঁঠালপাড়ায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের গৃহদেবতা বিজয় রাধাবল্লভ জিউর রথযাত্রা শুরু হয় যা আজও চলছে। সূচনা করেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্রের দাদা তমলুকের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট শ্যামাচরণ চট্টোপাধ্যায়। এ প্রসঙ্গে আরও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনার কথা না বললেই নয়।১৮৬২-র রথযাত্রার দিনই শুরু হয় শিয়ালদহ থেকে রানাঘাট ট্রেন চলাচল। সেই সময় এই রথযাত্রা এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল যে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে রথের সময় বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করত। ই রথযাত্রাকে নিয়ে নানা জনশ্রুতি প্রচলিত আছে। ১৮৭৫-এ রথ উপলক্ষে ছুটি নিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র নৈহাটির বাড়িতে এসেছিলেন। ঠিক সেই বছরই রথের মেলায় প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে একটি মেয়ে হারিয়ে গিয়েছিল। ঘটনাটি শুনে বঙ্কিম নিজেও মেলার মধ্যে মেয়েটির অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছিলেন। এই ঘটনাটির কয়েক মাস পরেই বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছিলেন ‘রাধারানি’ উপন্যাসটি।

বউবাজার অঞ্চলে গোবিন্দ সেন লেনে জগন্নাথ বিগ্রহ ও রথ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন চুনিমনি দাসী প্রায় ১২৫ বছর আগে। পাঁচটি চূড়াবিশিষ্ট ত্রিতল এই রথে সাবেক শিল্পরীতির নমুনা দেখা যায়। রথের চার দিকে আছে চারটি পুতুল এবং রথের গায়ে আঁকা আছে দেবদেবীর ছবিও। শোনা যায়, এক বার পুরীর নব কলেবরের সময় অবশিষ্ট এক খণ্ড নিমকাঠ দিয়ে তৈরি হয়েছিল এই পরিবারের নিমকাঠের জগন্নাথ বিগ্রহটি।প্রতি বছর পুরী থেকে পাণ্ডারা আসেন রথ উপলক্ষে।

কোলকাতার মুক্তারামবাবু স্ট্রিটের মার্বেল প্যালেসে আজও প্রাচীন রীতি মেনে  মা লক্ষ্মীর ঘর থেকে আরতি করে রথযাত্রার শুভ সূচনা হয়। এর পরে রথে বসিয়ে জগন্নাথের মূল পুজো হয়। একে বলে ‘দাঁড়ে ভোগ’। এতে থাকে সন্দেশ, ফল ইত্যাদি ভোগ। তার পরে রথের রশিতে টান পড়ে। রথের মহাপ্রসাদের মধ্যে থাকে জগন্নাথবল্লভ, খাজা, গজা, খয়েরচূড়, নিমকি, কটকটি ইত্যাদি। আর ৫৬ ভোগের মধ্যে থাকে সাত-আট রকমের ডাল, ভুনিখিচুড়ি, শাক, নারকেলের পদ, বড়া, বড়ি, ঘণ্ট, ছেঁচকি, পরমান্ন ইত্যাদি। আর থাকে কাসুন্দি ও আচার। এ বাড়ির রথ বাড়ির বাইরে বেরয় না, বাড়ি সংলগ্ন নীলমণি উদ্যানেই টানা হয়।

উত্তর ২৪ পরগনা ও নদিয়া জেলার সংযোগস্থল কাঁচরাপাড়ার রথতলার কৃষ্ণরাই-এর রথযাত্রা বিশেষ ঐতিহ্যপূর্ণ। শোনা যায়, কৃষ্ণরাই বিগ্রহটি বহু প্রাচীন। পুরনো মন্দিরটি নদীগর্ভে বিলীন হলেও, এখানকার জমিদার বীরেশ্বর নন্দীর পরিবারের কোনও এক পূর্বপুরুষ স্বপ্নাদেশ পেয়ে একটি কাঠের রথ তৈরি করে দিয়েছিলেন।

 

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top
error: Content is protected !!