ঘ্রাণ নিই কীভাবে​

আমরা ঘ্রাণ নিই কীভাবে​

আমাদের পঞ্চেন্দ্রিয়ের একটি ইন্দ্রিয় হল নাসিকা বা নাক। নাক শ্বাসতন্ত্রের প্রথম অংশ। এটি বায়ু থেকে অক্সিজেন গ্রহণ ও দেহে উৎপন্ন কার্বন-ডাই -অক্সাইড নির্গমণের পথ হিসাবে কাজ করে। দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে এটি সাহায্য করে। এছাড়াও আর একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ নাক করে। এই কাজটি হল ঘ্রাণ গ্রহণে সাহায্য করা। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য ঘ্রাণশক্তি বা গন্ধ অনুভূতি ভালো হওয়া প্রয়োজন। খাবার বাসি বা টাটকা বুঝতে, আগুন লাগা বা গ্যাস লিকের মতো দুর্ঘটনার ইঙ্গিত পেতে এটি আমাদের সাহায্য করে। এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, নাকের সাহায্যে আমরা ঘ্রাণ নিই কীভাবে​? এখানে আমরা জানব ঘ্রাণ প্রক্রিয়ায় কোন কোন অংশ সাহায্য করে এবং কীভাবে এই ঘ্রাণ প্রক্রিয়াটি সংঘটিত হয়।

ঘ্রাণ নিই কীভাবে​​​ (চিত্র – ১)

অলফ্যাক্টরি স্নায়ু (Olfactory Nerve): যে করোটিক স্নায়ু নাক থেকে মস্তিষ্কে ঘ্রাণ অনুভূতি নিয়ে যায় তা হল প্রথম করোটিক স্নায়ু বা অলফ্যাক্টরি স্নায়ু।এতে ঘ্রাণবাহী সংবেদী স্নায়ুতন্তু থাকে। অলফ্যাক্টরি স্নায়ু একটি সংবেদী স্নায়ু (Sensory nerve)। এটি নাসাগহ্বরের উপরের অংশে অলফ্যাক্টরি মিউকোসা থেকে উৎপন্ন হয়। অলফ্যাক্টরি মিউকোসা থেকে স্নায়ুটি (যা আসলে অনেকগুলি ছোট ছোট স্নায়ুগুচ্ছ) এথময়েড অস্থির ক্রিব্রিফর্ম প্লেট অতিক্রম করে মস্তিষ্কে পৌঁছায়।

এথময়েড অস্থি (Ethmoid Bone): এটি নাকের উপরিভাগে থাকে। এটি নাসিকা গহ্বর আর মস্তিষ্ককে আলাদা করে। ঘনক আকৃতির (Cuboidal) এই অস্থিটি খুব হালকা ও তিনটি অংশ নিয়ে গঠিত – ক্রিব্রিফর্ম প্লেট (Cribriform Plate), পারপেন্ডিকুলার প্লেট (Perpendicular Plate), এথময়ডাল ল্যাবিরিন্থ (Ethmoidal Labyrinth)।

ক্রিব্রিফর্ম প্লেট: ক্রিব্রিফর্ম প্লেট অনেকগুলি ছিদ্র যুক্ত। এটি এথময়েড অস্থির একটি চালনি সদৃশ কাঠামো। ক্রিব্রিফর্ম প্লেটের ছিদ্রগুলির মধ্য দিয়ে স্নায়ুগুচ্ছ অলফ্যাক্টরি বাল্বের মধ্যে প্রবেশ করে ও সাইন্যাপস গঠন করে।বাল্বগুলি থেকে (নাকের দুইদিকে একটি করে) ঘ্রাণ সংক্রান্ত তথ্য অলফ্যাক্টরি ট্র্যাক্টের মাধ্যমে মস্তিষ্কে সঞ্চারিত হয়।

মাইট্রাল কোষ ( Mitral Cell): অলফ্যাক্টরি বাল্বের মধ্যে এক প্রকার কোষ থাকে যাদের মাইট্রাল কোষ ( Mitral Cell) বলে। এই মাইট্রাল কোষগুলি অলফ্যাক্টরি কোষ থেকে সংবাদ আহরণ করে। অলফ্যাক্টরি কোষগুলি ন্যাসাল এপিথেলিয়ামে উপস্থিত থাকে।

অলফ্যাক্টরি এপিথেলিয়াম (Olfactory Epithelium): নাসিকা গহ্বরে অবস্থিত অলফ্যাক্টরি এপিথেলিয়ামে মিউকাসের আবরণ থাকে। এই আবরণের মধ্যে কিছু নার্ভ সেল থাকে ।

 ডেনড্রাইটস নামের রজ্জুগুলি যা স্নায়ু কোষ থেকে নাসিকা গহ্বরের দিকে ছড়ানো থাকে তা সূক্ষ্ম আর্দ্র পদার্থের একটি স্তর দিয়ে ঢাকা থাকে। এই আর্দ্র স্তরটির মধ্যে নাসিকা বাহিত ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র আণুবীক্ষণিক গন্ধ নিঃসরণকারী কণাগুলি দ্রবীভূত হয়।

অলফ্যাক্টরি এপিথেলিয়ামের মধ্যে কিছু অলফ্যাক্টরি রিসেপ্টর কোষ থাকে যা সিলিয়াযুক্ত। এই সিলিয়াগুলিই গন্ধ নিঃসরণকারী কণাগুলিকে বাতাস থেকে টেনে এনে নাসিকা গহ্বরের আর্দ্র স্তরটির মধ্যে দ্রবীভূত করে। স্নায়ুকোষগুলি তখন রাসায়নিক ভাবে ঊদ্দীপ্ত হয়। মানুষের প্রায় ৩৫০ ধরণের অলফ্যাক্টরি রিসেপ্টর থাকে। এগুলির মাধ্যমে মানুষ প্রায় ১০,০০০ রকমের গন্ধ শনাক্ত করতে পারে। অলফ্যাক্টরি নার্ভ এবং অলফ্যাক্টরি বাল্বের মধ্যে যে রিসেপ্টর কোষ থাকে সেগুলি প্রত্যেকটি গন্ধের জন্য আলাদা আলাদা সিগন্যাল দেয়। সিলিয়ায় অবস্থিত সেন্সরি রিসেপ্টরগুলি প্রোটিন ধর্মী অর্থাৎ অ্যামিনো অ্যাসিড দিয়ে তৈরী। অ্যামিনো অ্যাসিডের ধরণের তারতম্যের জন্যই সেন্সরি রিসেপ্টরগুলি ভিন্ন ভিন্ন গন্ধের প্রতি সংবেদনশীল হতে পারে।এক একটি বিশেষ রিসেপ্টর এক একটি বিশেষ গন্ধকে শনাক্ত করতে পারে। এরপর তারা ওই বিশেষ গন্ধযুক্ত কণাটিকে আবদ্ধ করে। সেন্সরি রিসেপ্টরের সাথে যুক্ত সেন্সরি নিউরোনটি এরপর উদ্দীপ্ত (Stimulated) হয়।উদ্দীপ্ত সেন্সরি নিউরোনটি গন্ধের সিগন্যালটি সরাসরি মস্তিষ্কের সেরিব্রাল কর্টেক্সে পাঠিয়ে দেয়। তখনই আমরা গন্ধ চিনতে পারি।

নাসিকা গহ্বরে অবস্থিত অলফ্যাক্টরি কোষগুলি কিছু কিছু ক্ষতিকারক কণাকেও প্রশ্বাস গ্রহণকালে টেনে ফেলে। ন্যাসাল এপিথেলিয়াম, অলফ্যাক্টরি কোষগুলি বায়ুবাহিত ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থ বা টক্সিন দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্নায়ুকলা বা নিউরোনেরও এর থেকে ক্ষতি হবার আশংকা থাকে। আমরা জানি স্নায়ুকোষ সৃষ্টি হতে পারে না। একবার নষ্ট হয়ে গেলে আর নতুন করে এই কোষ তৈরী হতে পারে না। এই বিপদ থেকে রক্ষা পাবার জন্য অলফ্যাক্টরি কোষগুলির আয়ু ৬০ দিন হয়। অর্থাৎ ৬০ দিন অন্তর নতুন অলফ্যাক্টরি কোষ তৈরী হয়। ন্যাসাল এপিথেলিয়াল কলা থেকে নতুন অলফ্যাক্টরি কোষ ধারাবাহিক ভাবে তৈরী হতে থাকে।

একটি ফ্লো চার্টের মাধ্যমে ঘ্রাণ নেওয়ার পদ্ধতিটি দেখানো হলো –

ঘ্রাণ নিই কীভাবে​ (চিত্র – ২)

আমরা ঘ্রাণ পাই অলফ্যাক্টরি স্নায়ুর মাধ্যমে যা নাসিকার উপরিভাগে ছড়ানো থাকে। এটি সরাসরি মস্তিষ্কের সাথে যুক্ত। কোনো কারণে এই স্নায়ুটি নষ্ট হয়ে গেলে আমরা ঘ্রাণ বা গন্ধ পাই না। একে এনোসমিয়া (Anosmia) বলে। ঘ্রাণ বা গন্ধ না পেলে আমাদের জিহ্বার টেস্ট বাড বা স্বাদ কোরক যা আমাদের স্বাদ পেতে সাহায্য করে তা-ও অকার্যকর হয়ে যায়। ফলে একই সাথে নাকে ঘ্রাণ না পেলে আমরা মুখে স্বাদ ও পাই না।

জিন, ত্বকের ধরণ, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদির মতো বিভিন্ন বিষয় আমাদের ঘ্রাণশক্তি নিয়ন্ত্রণ করে। যেমন –

  • আমাদের যখন খুব খিদে পায় আমাদের ঘ্রাণ ক্ষমতা প্রচণ্ড বেড়ে যায়।
  • মেয়েদের ঘ্রাণ শক্তি ছেলেদের চেয়ে বেশী।
  • ভোরবেলায় আমাদের ঘ্রাণ শক্তি দিনের অন্য সময়ের চেয়ে দুর্বল থাকে।
  • আবহাওয়া কোনো বস্তুর গন্ধের পরিবর্তন করতে পারে।

বস্তুর ঘ্রাণ পাওয়ার কতগুলি শর্ত –

  • যে বস্তুটির গন্ধ অনুভূতি আমরা নেব রাসায়নিক ভাবে সেটি উদ্বায়ী (Volatile ) হতে হবে। অর্থাৎ এটিকে গ্যাসীয় অবস্থায় থাকতে হবে।
  • রাসায়নিকটিকে জলে দ্রাব্য (Water Soluble) হতে হবে । কারণ অলফ্যাক্টরি এপিথেলিয়ামের তরলটির মধ্যে একে দ্রবীভূত হতে হবে।
  • রাসায়নিকটি দ্রবীভূত হলে তবেই অলফ্যাক্টরি রিসেপ্টর উদ্দীপ্ত হবে এবং সিলিয়ার প্রোটিনের সাথে যুক্ত হতে পারবে।

পঞ্চেন্দ্রিয় অর্থাৎ চোখ, কান ইত্যাদি দিয়ে দেখা, শোনা ইত্যাদি কীভাবে হয় সেই সম্পর্কে আমরা এই লিঙ্কে জেনেছি, এই নিবন্ধে ঘ্রাণ নিই কীভাবে​ তা জানা গেল।

আপনার মতামত জানান