বিজ্ঞান

পিঁপড়েরা খাবারের সন্ধান পায় কিভাবে

আপনারা হয়ত দেখেছেন সারি দিয়ে লাল, কালো পিঁপড়ের দল চলেছে আপনার রান্নাঘরে রাখা কোনো নির্দিষ্ট কৌটার দিকে বা আপনার ঘরের মেঝেতে পড়ে থাকা কোনো মরা আরশোলা বা প্রজাপতির দিকে। আপনি হয়তো তার পছন্দের খাবারটা একটু সরিয়ে অন্য কোথাও রেখে দিয়েছেন কিন্তু একটু পরেই দেখলেন সারিবদ্ধ পিঁপড়ের দল খাবারের সেই নতুন জায়গাটি ঠিক খুঁজে নিয়েছে। কখনও কি ভেবেছেন পিঁপড়েরা খাবারের সন্ধান পায় কিভাবে? এখানে আমরা সেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করব।

পিঁপড়েরা হল পতঙ্গ শ্রেণীর প্রাণী, যাদের বাইরের খোলস শক্ত চিটিন নির্মিত আবরণীতে ঢাকা। আমরা যেমন আমাদের খাবার দেখে (এবং কখনো গন্ধ শুঁকে) তার অবস্থান বুঝতে পারি, সেরকম পিঁপড়েরাও তাদের খাবারের অবস্থান বুঝতে পারে নির্দিষ্ট কিছু জ্ঞানেন্দ্রিয়র মাধ্যমে। এদের চোখ মানুষের মত নয়, বরং অনেকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চোখের সমাহার যাকে পুঞ্জাক্ষি বলে। তারা একমাত্র দ্রুত আলোর নড়াচড়া বুঝতে পারে, খাদ্যসন্ধানে সেই পুঞ্জাক্ষির কোনো ভূমিকা নেই। খুব কাছ থেকে কোনো পিঁপড়েকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে তাদের চোখের পাশে মাথার দুদিকে দুটি শুঁড়ের মত এন্টেনা বেরিয়ে আছে। এই শুঁড়গুলি তাদের স্বাদ ও ঘ্রানেন্দ্রিয়। এটির সাহায্যেই তারা তাদের আশেপাশের পরিবেশ সম্পর্কে একটা ধারণা করতে পারে এবং খাবারের সন্ধান পায়। এই অ্যান্টেনা ছাড়া তাদের খাদ্য খুঁজতে সাহায্য করে আরেকটি রাসায়নিক, যার নাম ফেরোমন (Pheromone)।

পিঁপড়ের ফেরোমনগুলো বেশ কয়েক রকমের হয়, যেগুলো ব্যবহার করে তারা তাদের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করে। এবার প্রশ্ন হল খাবার খোঁজার সাথে যোগাযোগ রক্ষার কি সম্পর্ক? পিঁপড়েরা সমাজবদ্ধ জীব, তারা একসাথে কলোনি করে থাকে। প্রসঙ্গত জেনে রাখা ভালো, তাদের এক একটা কলোনি কয়েক ফুট থেকে কয়েক হাজার মাইল পর্যন্তও বিস্তৃত হতে পারে। সেখানে কয়েক হাজার থেকে কয়েক কোটি পিঁপড়েকে খাদ্য জোগাড় করতে প্রতিদিনই অনেক কসরত করতে হয় এবং খাদ্যের সন্ধান পেলে কলোনির বাকি পিঁপড়েদের খবরও দিতে হয়। এই কাজটা মূলত করে কর্মী পিঁপড়ের দল।যখন কোন কর্মী পিঁপড়ে খাবার খুঁজতে বের হয়, তাদের শরীর থেকে ফেরোমন রাসায়নিক নির্গত হয় এবং তাদের চলার পথ বরাবর ছড়িয়ে পড়ে। পিঁপড়েটা যেদিকে যায়, সেদিকেই এই ফেরোমন ছড়াতে ছড়াতে যায় যাতে তারা পথ হারিয়ে না ফেলে এবং তাদের নির্দিষ্ট কলোনিতে ফিরতে পারে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, পিঁপড়েদের ঘ্রানেন্দ্রিয় তাদের এন্টেনাতে থাকে। তারা যখন হাঁটে, তাদের এন্টেনা গুলো এদিক ওদিক দোলাতে থাকে। এতে কোনোরকম খাবারের গন্ধ এসে পড়লেই তারা বুঝতে পারে যে আশেপাশে খাবার আছে।

লরেন্স যুইবেল (Lawrence Zwiebel) এর গবেষণায় জানা যায় পিঁপড়েদের ঘ্রাণশক্তি অত্যন্ত বেশি, তারা প্রায় চারশ রকমের গন্ধ আলাদা আলাদা ভাবে চিনতে পারে। এই গন্ধ চেনার কাজে তাদের সাহায্য করে চারশ রকমের প্রোটিন রিসেপ্টার। রিসেপ্টারগুলো তাদের অ্যান্টেনাতে থাকে এবং নির্দিষ্ট গন্ধে উদ্দীপ্ত হয়। অন্যান্য পতঙ্গ শ্রেণীর প্রাণীদের থেকে তাদের রিসেপ্টারের সংখ্যা অনেকটাই বেশি থাকে (মৌমাছি ১৭৪, রেশম মথ ৫২ ও মশা ৭৪-১৫৮ রকমের গন্ধ পায়)। তারা যে শুধু খাবারেরই গন্ধ পায় তাই নয় বিষাক্ত জিনিসেরও গন্ধ পায়। এই কাজে তাদের সাহায্য করে আরেক ধরনের রোধক (inhibitory) রিসেপ্টার, যেগুলো সেই বিষাক্ত জিনিস থেকে তাদের দূরে সরে থাকতে সাহায্য করে। বিশ্বখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা নেচারের একটি জার্নালে (সাইন্টিফিক রিপোর্টস) প্রকাশিত গবেষণাপত্র থেকে জানা যায় যে এই রিসেপ্টারগুলো বিভিন্ন পিঁপড়ের প্রজাতির ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন ধরনের হতে পারে এবং এর থেকে সেই পিঁপড়ের বিবর্তনের একটা আভাস পাওয়া যেতে পারে। পিঁপড়ের খাদ্যবস্তু থেকে কোন অনু যখন হাওয়ায় ভেসে তাদের এন্টেনার রিসেপ্টারে এসে পড়ে তখন তাদের রিসেপ্টারে কিছু গাঠনিক ও রাসায়নিক পরিবর্তন হয়, যার ফলে তাদের মস্তিষ্কে খাদ্যবস্তুর উপস্থিতি ধরা পড়ে। তারা তাদের এন্টেনা এদিক ওদিক নাড়িয়ে বুঝতে পারে কোনদিক থেকে বেশি ঘ্রাণ পাওয়া যাচ্ছে। স্বাভাবিক ভাবেই যেদিক থেকে বেশি ঘ্রাণ আসবে সেদিকেই খাদ্যবস্তু থাকার সম্ভাবনা বেশি। যখনই তারা মোটামুটি একটা লক্ষ্যস্থল স্থির করে নেয়, তখনই তাদের শরীর থেকে ফেরোমনের নিঃসরণ বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ, বাকি পিঁপড়েদের তথ্য দেওয়া যে এবার যেদিকে সে যাবে সেদিকে খাবারের সন্ধান পাওয়া গেছে। এভাবে তারা বাকিদের জন্য খাদ্যের অবস্থানের তথ্য রাখতে রাখতে এগিয়ে চলে তার নির্দিষ্ট খাদ্যবস্তুর দিকে। ইতিমধ্যে অন্যান্য কর্মী পিঁপড়ে, যারা এদিক ওদিক ঘুরছিলো খাদ্যের সন্ধানে, তারা ফেরোমনের তীব্র গন্ধে পূর্বের পিঁপড়ের পথ অনুসরণ করে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে তারা যখন দল বেঁধে যায়, তখন তারা সারিবদ্ধভাবে একটাই লাইন অনুসরণ করে। ওই লাইন বরাবরই প্রথম পিঁপড়ের ফেরোমনের অস্তিত্ব সবচেয়ে বেশি থাকে। নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে (খাদ্যের উৎস) পৌঁছে এরপর তাদের কাজ হল তাদের শক্তিশালী চোয়াল দিয়ে ছোট ছোট টুকরোয় সেই খাদ্যকে ভাঙা আর সেগুলো বহন করে আগের ফেরোমনের গন্ধ বরাবর তাদের কলোনিতে ফিরে যাওয়া। যদি ইতিমধ্যে অন্য কোন কর্মী পিঁপড়ে সেই তীব্র ফেরোমনের গন্ধে খাদ্যের লক্ষ্যে না উপস্থিত হয়, তবে প্রথম পিঁপড়েটি তার কলোনিতে ফিরে গিয়ে বাকিদের খবর দেয় যে কোথায় গেলে খাবার পাওয়া যাবে। সাথে সাথে এক ঝাঁক কর্মী পিঁপড়ে কলোনি থেকে বেরিয়ে সেই ফেরোমন পথ অনুসরণ করে পৌঁছে যায় লক্ষ্যবস্তুতে।

এখানে মনে একটা প্রশ্ন জাগতে পারে যে প্রথমে যেই পিঁপড়েটা খাদ্যের সন্ধান পেয়ে ফেরোমন ছেড়ে গেল, সেই ফেরোমন পথ অনুসরণ করে অন্যান্য প্রজাতির পিঁপড়েও তো খাবারের সন্ধান পেয়ে যেতে পারে? দেখা গেছে দুটো আলাদা আলাদা প্রজাতির পিঁপড়ের ফেরোমন আলাদা হয়। ইনসেক্টস জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে দুটো আলাদা প্রজাতির পিঁপড়ের ফেরোমন এবং ঘ্রান রিসেপ্টারও আলাদা হয়। অর্থাৎ জীবজগতে পিঁপড়ের মত এত ক্ষুদ্র একটি প্রাণীও তাদের অতি শক্তিশালী ঘ্রানেন্দ্রিয় ও ফেরোমনের মাধ্যমে গোষ্ঠীবদ্ধ ভাবে তাদের খাদ্যের সন্ধান করে জীবনযাপন করে।

এই বিষয়ে পড়তে পড়তে যদি আপনার মনে প্রশ্ন জাগে মৌমাছি মধুর সন্ধান পেলে বাকি মৌমাছিদের জানায় কিভাবে তাহলে এখানে ক্লিক করে দেখুন

তথ্যসূত্র


  1. Masaru et al, Scientific Reports, 2015, article number 13541
  2. Chalisseri et al, Insects, 2019, Pubmed ID: 31683791
  3. https://en.wikipedia.org/
  4. https://news.vanderbilt.edu/

1 Comment

1 Comment

  1. Pingback: পিঁপড়েরা খাদ্যের সন্ধান পায় কীভাবে – সহজ বিজ্ঞান

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর - জন্ম সার্ধ শতবর্ষ



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন