বিজ্ঞান

মৌমাছি মধুর সন্ধান পেলে বাকি মৌমাছিদের জানায় কিভাবে

প্রতিদিন সকালে মধুর সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে অনুসন্ধানী মৌমাছি বা scout মৌমাছি।এই মৌমাছি যখন মধুর সন্ধান পায় তখন সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে মৌচাকে ফিরে যায় তার দলবলকে খবর দিতে। মৌমাছি উড়ে উড়ে চলে, তাই তারা পিঁপড়ের মত ফেরোমেন (বিশেষ রাসায়নিক পদার্থ) খরচ করে সহজে খাবারের দিক নির্দেশ করতে পারে না। তাহলে উপায়? আমরা এখানে জেনে নেব, মৌমাছি মধুর সন্ধান পেলে বাকি মৌমাছিদের জানায় কিভাবে?

মৌমাছি যখন কোনো ফুলে মধু খুঁজে পায় তখন সেই ফুলের থেকে মকরন্দ (nectar) নিয়ে আসে মুখে করে, তারপর মৌচাকে এসে অন্যান্য কর্মী মৌমাছিদের দেখায়, তাদের সাথে আলোচনা করে মধু কি ভালো হবে নাকি খারাপ হবে। তারপর কি হবে? সেই মৌমাছিটা মধুর উৎস ফুলের দিকে সবগুলো মৌমাছিকে নিজের পিছু পিছু ধরে নিয়ে যাওয়ার কথা, তাই না? কিন্তু তারা সেটা করে না।

তারা মধু পাওয়ার পর যেটা করে সেটা হচ্ছে তারা প্রথমে নেকটার কিংবা মধুর উৎস কোনদিকে এবং দুরত্ব কতটুকু সেটার একটা হিসাব করে দেখায় মৌচাকে যারা থাকে তাদেরকে।এই তথ্যগুলি স্কাউট মৌমাছি নৃত্যের ছন্দে ছন্দে বাকি মৌমাছি দের বোঝায় - এই নৃত্যকে স্পন্দন নৃত্য বা “waggle dance” বলে।

এই নাচ দেখেই মৌচাকের অন্যান্য সহকারীরা বুঝতে পারে যে মধুর উৎস কোথায় আছে, কেমন আছে।এটা কোন সাধারন ড্যান্স না !এটা এমন একটা নাচ যেটার ভেতর সুন্দর একটা হিসাব করে দেখায় মৌমাছিরা, মধু কত দূরে ও কোন দিকে আছে।

স্পন্দন নৃত্য

ছবি - ১

এক্ষেত্রে ওরা সূর্যের অবস্থানের উপর ভিত্তি করে ফুলের অবস্থান নির্দেশ করে। কিভাবে? তারা অভিকর্ষ বল যেদিকে কাজ করে (মানে মাটির দিকে) সেদিকটাকে নীচের দিক আর সূর্য যেদিকে থাকে সেদিকটাকে উপরের দিক ধরে। আর মৌচাকের সামনে এসে সূর্যের সাথে একটা কোণ তৈরি করে ফুলের/উৎসের দিকে মুখ বরাবর এঁকেবেঁকে চলে(Waggle phase) । এই চলাটাই হচ্ছে একটা নাচের মত। নাচ শেষ হবার পর ডান পাশে অর্ধবৃত্তাকার পথ ধরে সে অতিক্রম করে আগের জায়গায় ফিরে আসে (return phase), আবার সেই স্টাইলিশ ড্যান্সিং (Waggle phase) করে ফুলের দিকে দিক নির্দেশ করে। তারপর আবার অর্ধবৃত্তাকার পথ পাড়ি দিয়ে বাম পাশ দিয়ে (return phase) আগের অবস্থানে আসে। এভাবে বাংলায় ৪ এর মত দেখতে কংবা ইংরেজি 8 (ছবি - ১) এর মত দেখায় তার ড্যান্সটা। কিন্তু তার নৃত্যের মাঝখানের এই উদ্ভট নাচের জায়গাটার দিকে ভালোমতো খেয়াল করে কর্মী মৌমাছিরা ধরে ফেলে হ্যাঁ, মধু ওইদিকেই আছে।

মৌমাছির মধু আহরণ

ছবি - ২

যেমন, ২ নম্বর ছবির প্রথম মৌমাছিটির খাবারের উৎস সূর্যের দিকে, তাই সে মৌচাকে আসার পর তার নাচের সোজা পথটি (Waggle phase) হবে মৌচাকের নীচ থেকে খাড়া উপরের দিকে। খাড়া উপরের দিক মানে সূর্যের দিক।

দ্বিতীয় মৌমাছিটির খাবারের উৎস হলো মৌচাক থেকে যেদিকে সূর্য, তার সাথে ৯০ ডিগ্রি কোণে ডান দিকে। তাই মৌচাকে আসার পর এর নাচের সোজা পথটিও সূর্যের দিকের সাথে ৯০ ডিগ্রি কোণে ডান দিকে হবে।

অন্যদিকে তৃতীয় মৌমাছিটির খাবারের উৎস হলো, যেদিকে সূর্য, তার সাথে ১৩৫ ডিগ্রি কোণে বাম দিকে। তাই এর নাচের সোজা পথটি হবে সূর্যের দিকের সাথে ১৩৫ ডিগ্রি কোণে বাম দিকে।

কিন্তু সূর্য তো আর বেশিক্ষণ এক জায়গায় থাকে না! প্রতি ৪ মিনিটে ১ ডিগ্রী করে পশ্চিমে হেলে পড়ে। তাহলে উৎস যদি অনেক দূরে হয় আর ফিরে আসতে আসতে বেচারার যদি এক ঘন্টা লাগে (তখন সূর্য ১৫ ডিগ্রি হেলে পড়ে) তখন? তখন আসলে কিছুই হবে না। এরা খুব সুন্দর করে নিজেদের ইন্দ্রিয়র সাথে প্রকৃতিকে মানিয়ে নিয়েছে। সূর্য যখন একটু একটু করে সরে যেতে থাকে তখন এরাও একটু একটু করে উৎসের সাথে সূর্যের কোনের মান পরিবর্তন করে। অনেকটা আমরা বাড়িতে ভেতর থেকেও বুঝতে পারি এখন সকাল নাকি সন্ধ্যা।তাই এরা যখন অন্য কাউকে যেকোনো সময়ে পথ দেখায়, সেটা সূর্যের দিকের সাথে একটি নির্দিষ্ট কোন করে ফেলে তারপর দেখায়, না হলে প্রত্যেক মৌমাছি শেষে মধুর উৎস খুঁজে পেতো না আর না খেয়ে পুরো জাতিটাই ধ্বংস হতো। এমনকি মেঘলা দিনেও এরা সূর্যের অবস্থান নির্ণয় করতে পারে কারণ মৌমাছির চোখের পুঞ্জাক্ষি অতিবেগুনি রশ্মি সনাক্ত করতে পারে। তাই তারা মেঘে ঢাকা আকাশে অন্ধকারের মধ্যেও সূর্য ঠিক কোথায় আছে সেটা বলে দিতে।

আর কতদূরে মধুর উৎস সেটা কিভাবে হিসেব করে ? সেটাও কিছুটা আন্দাজে, সময়ের উপর নির্ভর করে হিসেব করে। যদি ফুলটি দূরে হয়, তাহলে সোজা পথটি অতিক্রম করার সময় বা Waggle phase এ মৌমাছিটি বেশি সময় নিবে, কাছে হলে কম সময়। সোজা পথের সময় দেখে অন্যরা হিসেব করে নেয় কত দূরে খাবারের উৎস। একটি বিশেষ প্রজাতির মৌমাছির উপর গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১০০ মিটার দূরত্বের জন্য স্পন্দন নৃত্যের সময় ৭৫ মিলিসেকেণ্ড করে বেড়ে যায়। অন্য প্রজাতির ক্ষেত্রে ফলাফলটি ভিন্ন হতে পারে। তবে যেকোনো প্রজাতির ক্ষেত্রে দূরত্বের সাথে সময়ের সর্বদাই একটি সুনির্দিষ্ট সরলরৈখিক সম্পর্ক (linear relationship) বিদ্যমান।

বিজ্ঞানী কার্ল ফন ফ্রিশ ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে তাঁর বইয়ে এই তত্বের কথা লেখেন এবং তার প্রায় চার দশক পর এই আবিস্কারের জন্য ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে নোবেল পুরস্কার পান।

 

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!