বিজ্ঞান

রক্তদাতা নির্বাচন করা হয় কিভাবে

রক্তদান জীবনদান – এই কথাটা অনেকেই জানি, আর জানি বলেই অনেকেই চাই রক্তদান করে বিপন্ন মানুষের প্রাণ বাঁচাতে। অথচ আমরা অনেকেই জানি না রক্তদাতা নির্বাচন করা হয় কিভাবে। আমরা এখানে রক্তদাতা নির্বাচন সংক্রান্ত ভারত সরকারের ন্যাশানাল এইডস কন্ট্রোল অরগানাইজেশন (NACO) প্রদত্ত নির্দেশিকা তুলে ধরব। রক্তদাতা নির্বাচন করার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন ব্লাড ব্যাঙ্ক বা ব্লাড ডোনেশন ক্যাম্পে উপস্থিত চিকিৎসক। পাঠকের সুবিধার্থে এই নির্দেশিকাগুলি কয়েকভাগে ভাগ করে দিচ্ছি। এখানে সাধারণ নির্দেশাবলী দেওয়া হল যা সকলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আশা করব এটি পড়ে আপনার অনেক ভুল ধারণা কেটে যাবে এবং রক্ত দান করে বিপন্ন মানুষের জীবন বাঁচিয়ে তুলবেন। সাধারণ নিয়মাবলী ছাড়াও বিভিন্ন রোগ ও ওষুধ রক্তদাতা নির্বাচনে কিভাবে প্রভাব ফেলে তা জানতে এই লিঙ্কে ক্লিক করে দেখুন।

রক্ত দাতা নির্বাচনের সাধারণ শর্তাবলী

১. সাধারণ সুস্থতা: রক্তদাতাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ ও সক্রিয় হতে হবে এবং রক্তদাতা কারাবন্দী অথবা সংশোধনাগারের অধিবাসী হওয়া চলবে না। 
বিশেষভাবে সক্ষম অথবা যাঁদের দৃষ্টিশক্তি ও কথা বলা সংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে তাঁদেরকে পরিষ্কার ও বিশ্বস্তভাবে রক্তদান পদ্ধতিটা বোঝাতে হবে এবং তাঁরা সম্পূর্ণ অবহিত হয়ে বৈধ সম্মতি দান করার পরেই রক্তদান করতে পারেন। 

২. বয়সসীমা: ন্যূনতম ১৮ বছর থেকে  সর্বাধিক ৬৫ বছর। তবে জীবনের প্রথম রক্তদান ৬০ বছরের বেশি বয়সে করা যাবে না। তবে যাঁরা ৬০ বছর বয়সের আগেই রক্ত দিয়েছেন তাঁরা সর্বাধিক ৬৫ বছর বয়স অব্দি রক্তদান করতে পারেন। 
অ্যাফেরেসিস (Apheresis) রক্তদাতার (এসডিপি ডোনেশন বা সিঙ্গল ডোনার প্লেটলেট্স ডোনেশন) ক্ষেত্রে বয়সের নিম্ন ও উর্দ্ধসীমা যথাক্রমে ১৮ ও ৬০ বছর।

৩. ওজন ও সংগৃহীত পূর্ণ রক্তের পরিমাণ (whole blood volume) :   ৩৫০ মিলিলিটার রক্তদানের জন্য ন্যূনতম ওজন হওয়া  দরকার ৪৫ কেজি; ৪৫০ মিলিলিটার রক্তদানের জন্য ওজন ৫৫ কেজির বেশি হতে হবে;   অ্যাফেরেসিস (Apheresis) দাতার ক্ষেত্রে  ন্যূনতম ওজন ৫০ কেজি হতে হবে।  

৪. রক্তদানের ব্যবধান (interval) : পূর্ণ রক্তদানের (whole blood donation) ক্ষেত্রে, পরপর দুটি রক্তদানের ব্যবধান পুরুষ রক্তদাতার বেলায় ৯০ দিন এবং মহিলা রক্তদাতার বেলায় ১২০ দিন।
অ্যাফেরেসিস (Apheresis) এর ক্ষেত্রে অন্তত ৪৮ ঘন্টা পরে আবার প্লেটলেটস/প্লাজমা দেওয়া যায় (তবে সেটা সপ্তাহে দু-বার এবং বছরে মোট ২৪ বারের বেশি নয়)।
একবার পূর্ণরক্তদানের পরে, ২৮ দিনের মধ্যে প্লেটলেটস দেওয়া যাবে না। 
অ্যাফেরেসিস (Apheresis) পদ্ধতিতে প্লেটলেটস দানের ২৮ দিন পরে পূর্ণ রক্তদান সম্ভব যদি লোহিত রক্তকণিকার ঘাটতি পূরণ হয়। নাহলে ৯০ দিনের আগে পূর্ণ রক্তদান গ্রহণীয় নয়।
বোন ম্যারো প্রতিস্থাপনের ১২ মাস এবং পেরিফেরাল স্টেম সেল প্ৰতিস্থাপনের ক্ষেত্রে ৬ মাস পর্যন্ত সবরকম রক্তদান থেকে বিরত থাকতে হবে।

৫. রক্তচাপ (Blood Pressure): ১০০ – ১৪০ মিমি HG সিস্টোলিক, ৬০ – ৯০ মিমি HG ডায়াস্টোলিক (ওষুধ খেয়ে অথবা না খেয়ে), তবে ওষুধ বা ওষুধের মাত্রা শেষ ২৮ দিনে কোনও পরিবর্তন হওয়া চলবে না । রক্তদানের আগে ডাক্তারি পরীক্ষায় যদি বোঝা যায় যে প্রান্তিক অঙ্গের (end organ) কোনো ক্ষতির সম্ভাবনা আছে, অথবা আনুষঙ্গিক জটিলতা (হৃৎপিণ্ডঘটিত, মূত্রাশয়, চোখ বা রক্তনালী সম্পর্কিত) দেখা দিতে পারে অথবা আগে মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হওয়ার কোনো অভিজ্ঞতা আছে তাহলে রক্তদান করা যাবে না।

৬. নাড়ি (Pulse): মিনিটে ৬০ – ১০০ নিয়মিত।

৭. তাপমাত্রা (temperature): স্বাভাবিক, ৩৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড/ ৯৮.৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট।

৮. শ্বাসক্রিয়া (respiration): রক্তদাতার তীব্র শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত কোনো রোগ থাকা চলবে না।

৯. হিমোগ্লোবিন: ১২.৫ g/dL বা তার বেশি। থ্যালাসেমিয়া ক্যারিয়ার রক্তদাতা চলবে যদি তাঁর রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা গ্রহণযোগ্য হয়।

১০. আহার: রক্তদানের আগে বা রক্ত দেওয়ার সময় উপবাসে থাকা চলবে না। রক্তদানের অন্তত ৪ ঘণ্টা আগে খাবার খেতে হবে। রক্তদানের আগে মদ্যপান নিষিদ্ধ এবং রক্তদানের আগে কোনোরকম নেশাগ্রস্ততা যেন না থাকে। যাঁরা নিয়মিতভাবে প্রচুর মদ্যপান করেন, তাঁরা রক্ত দিতে পারবেন না। 

১১. পেশা: যে সব রক্তদাতা উড়োজাহাজের কর্মী, দূরপাল্লার গাড়ি চালক, অথবা যাঁরা জরুরি পরিষেবার সাথে যুক্ত বা কাজের ধরণ খুব ক্লান্তিকর তাঁরা পরবর্তী কাজে যোগদানের অন্তত ২৪ ঘণ্টা আগে রক্ত দেবেন না। যাঁরা নাইট শিফ্টে কাজ করেন এবং পর্যাপ্ত ঘুম হয় না, তাঁরা রক্তদানে বিরত থাকবেন।

১২. ঝুঁকি-পূর্ণ আচরণ (Risk Behaviour): উপস্থিত রক্তদাতাকে পরীক্ষা করে বা তাঁর ইতিহাস ঘেঁটে যতদুর সম্ভব নিশ্চিত করার চেষ্টা করতে হবে যে রক্তদাতার এমন কোনো রোগ নেই যা রক্তের মাধ্যমে সংক্রামিত হতে পারে।
যাঁদের হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি, এইচআইভি হবার আশঙ্কা আছে (যেমন রূপান্তরকামী, সমকামী, যৌনকর্মী, যাঁদের একাধিক যৌনসঙ্গী বর্তমান, যাঁরা ইনজেকশনের মাধ্যমে ড্রাগ নেয় ইত্যাদি ) তাঁদের ঝুঁকিপূর্ণ (at risk) রক্তদাতা ধরা হয়। এইসব ঝুঁকিপূর্ণ রক্তদাতারা রক্তদান করতে পারবেন না। এছাড়া রক্তদানের সময় উপস্থিত চিকিৎসক কাউকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ রক্তদাতা বলে মনে করতে পারেন এবং সিদ্ধান্ত নিতে পারেন তিনি রক্তদান করতে পারবেন কি না।

 ১৩. ভ্রমন ও বাসস্থান: রক্তদাতা এমন কোনো ভৌগোলিক অঞ্চলে গিয়ে থাকেন বা সে অঞ্চলের অধিবাসী হন যে অঞ্চলের স্থানীয় কোন অসুখ (যার জন্য স্ক্রিনিং বাধ্যতামূলক নয় বা ভারত সরকারের কোন নির্দেশিকা নেই) রক্তের মাধ্যমে সংক্রামিত হয়, তাহলে তিনি রক্তদান করতে পারবেন না।

১৪. রক্তদাতার ত্বক: রক্তদাতার হাতে বিশেষত যে জায়গা থেকে রক্ত নেওয়া হবে (at the site of phlebotomy) সেখানে চর্মরোগজনিত কোন সমস্যা যেন না থাকে। রক্তদাতার হাতে পেশাদারি রক্তদাতা কিম্বা সিরিঞ্জের মাধ্যমে নিষিদ্ধ ড্রাগ সেবনকারীদের মতো সূচ ফোটানোর দাগ থাকা চলবে না।

মহিলা রক্তদাতার শারীরিক অবস্থা 

১৫. গর্ভাবস্থা ও প্রসব: সন্তান প্রসবের পর ১২ মাস রক্তদান বন্ধ রাখতে হবে।

১৬. গর্ভপাত: গর্ভপাতের পরে ৬ মাস রক্ত দেওয়া চলবে না।

৭. স্তন্যপান: শিশুকে স্তন্যদুগ্ধ পান করানোর পুরো সময় জুড়ে রক্তদান বন্ধ থাকবে।

১৮. ঋতুচক্র: মাসিক চলার সময় রক্তদানে বিরত থাকতে হবে।

স্বরচিত রচনা পাঠ প্রতিযোগিতা, আপনার রচনা পড়ুন আপনার মতো করে।

ভিডিও

বিশদে জানতে ছবিতে ক্লিক করুন। আমাদের সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করুন। ইমেল – contact@sobbanglay.com

 


তথ্যসূত্র


http://naco.gov.in/
Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।