সববাংলায়

মাকাল ঠাকুর | মাকাল চন্ডী

বিভাগঃ ,

বঙ্গদেশের বিভিন্ন জেলায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষদের মধ্যে লৌকিক যেসব দেবদেবীর পূজার প্রচলন লক্ষ করা যায়, তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘদিনের ইতিহাস। বাংলার সমৃদ্ধ লোকঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এইসব দেবদেবী এবং তাঁদের পূজা ও পূজাকেন্দ্রিক নানা আচার-সংস্কার। নদীমাতৃক বঙ্গদেশের মৎস্যজীবী অর্থাৎ জেলে সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যেও তেমনই এক দেবতার পূজার ব্যাপক প্রচলন রয়েছে, যে দেবতা মাকাল ঠাকুর নামে পরিচিত। বিশেষত দক্ষিণবঙ্গের নিম্ন গাঙ্গেয় এবং জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চলের মৎস্যজীবিদের কাছে মাকাল ঠাকুর বিশেষভাবে পূজিত হন। জেলেরা তাদের কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার পূর্বে এবং বিশেষ বিশেষ দিনে মাকাল ঠাকুরের পূজা করে থাকেন। মাকাল ঠাকুরের সঙ্গে আবার মহাদেবের যোগসূত্র রয়েছে। খুব সহজ লৌকিক পদ্ধতিতে এই দেবতার পূজা করা হয়। কোন কোন অঞ্চলে মাকাল ঠাকুর আবার মাকাল চন্ডী নামেও পরিচিত।

একদল গবেষকের মতে, মাকাল ঠাকুরের সঙ্গে আসলে শিব অর্থাৎ মহাকালের যোগ রয়েছে। ‘মাকাল’ শব্দটি সম্ভবত ‘মহাকাল’ শব্দেরই অপভ্রংশ। কেউ কেউ আবার মনে করেন যে, মহাকাল শব্দটির ধ্বনিলোপ পেয়ে মাকালে পরিণত হয়েছে। মাকাল ঠাকুর মূলত মৎস্যজীবীদের উপাস্য দেবতা এবং শিব বা মহাকালের সঙ্গে মাছের যোগসূত্রটা সাধারণ লৌকিক গল্পগাথাতেই পাওয়া যায়।
বৈদিক যুগ থেকেই শিবের অস্তিত্ব। ভারতবর্ষের অন্যতম প্রাচীন দেবতাদের মধ্যে একজন হলেন শিব। কালে কালে তাঁর নানা মূর্তি নানা রূপ মানুষের বিশ্বাসে ও ভক্তিতে গড়ে উঠেছে। ঐতিহাসিকদের মতে, সিন্ধু সভ্যতায় প্রাপ্ত পশুপতির মূর্তিটি থেকেই শিবের বিবর্তন। তারপর নানা সময়ে বহুল বিবর্তন ঘটেছে। দেবতার সঙ্গে দূরত্ব ঘুচিয়ে মানুষ ক্রমে তাঁকে নিজের ঘরের নিজের কাছের মানুষ করে তুলেছে। নিজেদের জীবনযাত্রা, আচার সংস্কারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেবতাকেও গড়েপিঠে নিজেদের একজন করে নিয়েছে মানুষ। শিবের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। মানুষের জীবনযাত্রা সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়া এইসব দেবতাদের নিয়ে রচিত হয়েছে পালাগান। এই লৌকিক পালাগানগুলিতে নানাবিধ মনোরঞ্জক কাহিনির মধ্যে দিয়ে দেবতারা বিবিধ রূপে ধরা দিয়েছেন। শিবের গাথা নিয়ে রচিত শিবায়ন কাব্যের মধ্যে শিবকে কৃষিকাজের দেবতা হিসেবে উপস্থাপিত করা হয়েছে। শিবের হাতেই নাকি মর্ত্যলোকে চাষাবাদের গোড়াপত্তন হয়েছিল। শিবায়ন কাব্যে শিব নিজেই একজন প্রান্তিক চাষীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তবে কৃষিকাজ বলতে তো কেবলই ধান বা ফসলের চাষ নয়, মৎস্যচাষও বটে। সেই কারণে মৎস্যজীবীদের মধ্যে মাকাল ঠাকুরের পূজার রীতি প্রচলিত রয়েছে। লৌকিক পালাগানে দেখা যায় যে, মহাদেব এবং গৌরীদেবী নিজেরাই ধানক্ষেতের জমা জল থেকে মাছ ধরছেন এবং সেই মাছ নিজেরাই মাথায় করে নিয়ে বিক্রি করতে যান। সেই কারণেই হয়তো প্রান্তিক মৎসজীবীরা হরগৌরীকে জেলেদের দেবদেবী বলে মান্যতা দিয়ে মাকাল ঠাকুর নামে পূজা করে থাকেন।

তবে অন্য একটি মতে, শিবের সঙ্গে আদতে মাকাল ঠাকুরের কোন যোগ নেই। আসলে নাকি ‘মাখাল’ শব্দটি অপভ্রংশ হয়ে ‘মাকাল’ হয়েছে। মাখাল শব্দের অর্থ হল নদীস্রোত। তবে মাকাল ঠাকুর দেব না দেবী সেক্ষেত্রেও সন্দেহ জাগে। হাওড়া অঞ্চলে মাকাল চন্ডী নামে এক বিশেষ লৌকিক দেবীর পূজা প্রচলিত রয়েছে, যাঁকে মাকাল দেবতারই স্ত্রী হিসেবে মনে করা হয়।

তবে এসবের বাইরেও মাকালের উৎস বিষয়ে আরেকটি মত প্রচলিত রয়েছে। সেই মত অনুযায়ী মাকালের সঙ্গে আদতে আজীবকের যোগ রয়েছে। প্রাচীন যুগে ব্রাহ্মণ্যধর্মের বিরোধিতা করে যেমন বৌদ্ধ ও জৈন দর্শনের উত্থান ঘটেছিল তেমনই শৈবরা মাখখাল গোশালের নেতৃত্বে নতুন দর্শন গ্রহণ করেন, যে দর্শন থেকেই আজীবক সম্প্রদায়ের উদ্ভব। মাখখাল গোশাল ছাড়া আজীবকদের আর কোনও প্রবক্তার নাম পাওয়া যায় না। আজীবকদের কোনও সন্ন্যাসী বা পুরোহিত না থাকলেও গুরু ছিল। এই আজীবকদের সঙ্গে সম্রাট অশোকের সংঘাত সৃষ্টি হয়। অশোক হয়ে উঠেছিলেন ঘোরতর আজীবক-বিদ্বেষী। অশোকের নিযুক্ত ধর্মমহামাত্ররাও যখন আজীবকদের অশোকের দর্শন দ্বারা প্রভাবিত করতে পারেননি তখন অশোক আজীবকদের উদ্বাস্তু করে দিতে শুরু করেন। সেই ঘরছাড়া আজীবকদের একটি অংশ গাঙ্গেয় দক্ষিণবঙ্গের দ্বীপ অঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাঁরা সেখানে নিজেদের মাখখাল নামে পরিচয় দিতে শুরু করেন এবং মৎস্যজীবীদের পেশা বেছে নেন। আজীবকরা ঈশ্বর বিশ্বাস করতেন না, তাই বৌদ্ধদের মতো স্তুপ নির্মাণ করে তাঁরা মাখখালকে স্মরণ করতেন ও ‘গুরু সত্য’ উচ্চারণ করতেন। মাখখাল থেকেই মাকাল-এর উৎপত্তি বলে মনে করা হয়৷ মাকাল পুজোতেও তিনবার ‘গুরু সত্য’ শব্দটি উচ্চারণ করা হয়। মাকাল ঠাকুরের উৎপত্তি সম্পর্কে এইসব অনুমানই কেবল আমাদের সামনে রয়েছে।

মাকাল ঠাকুরের পুজো বছরের বিভিন্ন সময়ে হয়। সাধারণত বর্ষাকালেই সবচেয়ে বেশি হয় মাকাল ঠাকুর পূজা। মাকাল ঠাকুরের নির্দিষ্ট আকৃতি কিছু নেই। খুব সহজ পদ্ধতিতে কাদামাটি দিয়ে একরকম প্রতীকী মূর্তি গড়ে নিয়ে পূজা করা হয়। কখনও একটি কখনও আবার একসঙ্গে দুটি মাটির স্তুপ গড়ে নিয়ে পূজা করা হয়। স্তুপটি অনেকটাই উল্টানো গ্লাসের মতো দেখতে হয়। পুকুর থেকে কাদামাটি সংগ্রহ করে হাতের তালুতে ঘষে ঘষে চার থেকে ছয় ইঞ্চি লম্বা এক কাল্পনিক মূর্তি গড়া হয় এবং বুড়ো আঙুলের সাহায্যে তাতে চোখ, নাক, মুখ তৈরি করে নিয়ে পূজার বেদীতে বসানো হয়। মাকাল ঠাকুরের বেদীটি তিনটি স্তরবিশিষ্ট, সেই কারণে এর মধ্যে বৌদ্ধ প্রভাব এসে পড়েছে বলে মনে করেন গবেষকরা। ওই তিনটি স্তরের সঙ্গে তাঁরা আসলে বুদ্ধ, ধর্ম ও সংঘের সাযুজ্য খুঁজে পায়। সেই বেদীর চারকোণে চারটি তীরকাঠি পুঁতে দেওয়া হয়। অনেক সময় আবার মাকাল ঠাকুরের বিগ্রহের সামনে কুমীরের অবয়বও দেখতে পাওয়া যায়।

মাকাল দেবতা পূজার নির্দিষ্ট কোন মন্ত্র নেই এবং সেই অর্থে কোন ব্রাহ্মণেরও দরকার হয় না। মৎস্যজীবীরাই সম্মিলিতভাবে মাকাল ঠাকুরের পূজা করে থাকেন। আতপ চাল, বাতাসা এবং পাকা কলা মূলত নৈবেদ্য হিসেবে দেওয়া হয়ে থাকে। এছাড়াও চিনির সন্দেশ, ফলমূল ইত্যাদিও দেওয়া হয়ে থাকে। সাধারণত রাতের দিকে শেয়ালের ডাক শুনেই মাকাল ঠাকুরের পুজো শুরু করা হয়। শেয়াল ডাকলে তাকে ‘শাঁখ ডাকা’ বলা হয়। পুজোতে জ্বালানো হয় ধূপ ও প্রদীপ। এছাড়াও সন্ধেবেলায় মাকাল ঠাকুরের কাছে খড় জ্বালানো হয়। যারা মাছ ধরতে যায় তারাই খড় জ্বালিয়ে পুজো করে৷ ঠাকুরের সামনে পাতা হয় ঘট। এই পুজোতে কলকে এবং গাঁজাও দেওয়া হয় বলে শিবের সঙ্গে এই লৌকিক দেবতার যোগসূত্রের অনুমানটি আরও দৃঢ় হয়। এছাড়াও চড়কের শিবের মতোই মাকাল ঠাকুরেরও ফুলযাত্রা হয়। মাকাল ঠাকুরের প্রতীকী স্তুপের ওপর চাঁপাফুল চাপানো হয় এবং যতক্ষণ না সেই ফুল খসে মাটিতে পড়ছে ততক্ষণ ভক্তেরা প্রার্থনা করে চলে। খসে পড়া সেই ফুল গামছায় বেঁধে নিয়ে জেলেরা নদীপথে পাড়ি দেয়। ফুলযাত্রার রীতি চড়কেও লক্ষ করা যায়। এই পুজোতে চকলেট, চুষিকাঠি, লাট্টুর মতো জিনিসপত্রও দেওয়া হয়ে থাকে। কোনরকম বাজনা বা বলির বন্দোবস্ত নেই এ-পুজোতে।

বনাঞ্চলে আবার আট মাকাল নামে একটি পুজো হয়। সেখানে আটটি স্তুপ করা হয় এবং মধ্যিখানের স্তুপটিকে বলা হয় আটেশ্বর দেবতা।

মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে পূজিত এই লৌকিক দেবতা বাংলার লোকসংস্কৃতির ও ঐতিহ্যের যে এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ তা বলার অপেক্ষা রাখে না।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading