আজকের দিনে

১০ ডিসেম্বর ।। মানবাধিকার দিবস

প্রতি বছর প্রতি মাসের নির্দিষ্ট কিছু দিনে বিভিন্ন দেশেই কিছু দিবস পালিত হয়। ঐ নির্দিষ্ট দিনে অতীতের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে স্মরণ করা বা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করতেই এই সমস্ত দিবস পালিত হয়। পালনীয় সেই সমস্ত দিবসগুলির মধ্যেই একটি হল মানবাধিকার দিবস (Human Rights Day)।

প্রতি বছর ১০ ডিসেম্বর সারা বিশ্ব জুড়ে সর্বজনীন মানব অধিকার সংক্রান্ত ঘোষণাকে বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে ‘মানবাধিকার দিবস’ পালিত হয়ে থাকে।

১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ অধিবেশনে প্রথম মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা গৃহীত হয়। রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদে এই তারিখেই উক্ত ‘সার্বজনীন মানব অধিকার’ ঘোষিত হয়েছিল যা একটি মাইলফলক। এই অধিকারের বলে জাতি, বর্ণ, ধর্ম, লিঙ্গ, ভাষা, রাজনৈতিক মতাদর্শ, জাতীয় পরিচিতি কিংবা সম্পত্তি নির্বিশেষে সমস্ত মানুষকেই সমান অধিকারের যোগ্য বিবেচনা করা হয়। ৫০০টিরও বেশি ভাষায় সর্বাধিক অনূদিত নথি হল এই সার্বজনীন মানব অধিকার। তবে ১৯৪৮ সালে গৃহীত হলেও ১৯৫০ সাল  থেকে এই দিনটি মানবাধিকার দিবস হিসেবে পালন করা শুরু হয় সারা পৃথিবী জুড়ে। ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রসংঘের ডাক প্রশাসন (Postal administration) এই বিশেষ দিনটির স্মরণে ডাকটিকিট প্রকাশ করলে তার প্রায় ২ লক্ষ অগ্রিম অর্ডার আসে নানা দেশ থেকে, এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল সেই ডাকটিকিট। ১৯৬৩-তে সোভিয়েত ইউনিয়ন মানবাধিকার দিবসের ১৫তম বার্ষিকী উপলক্ষেও একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করে এবং ১৯৯৮ সালে জার্মানি ৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে আরেকটি ডাকটিকিট প্রকাশ করে। রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভায় ৪৮টি দেশের সম্মতিতে এই সর্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণা গৃহীত হয় যা সমস্ত জাতির ও ধর্মের সাধারণ মানুষের বিশেষ কৃতিত্বের সূচক। তবে ১৯৪৮ সাল থেকে ১০ ডিসেম্বর সমগ্র পৃথিবীজুড়ে মানবাধিকার দিবস পালিত হলেও, দক্ষিণ আফ্রিকায় এই দিনের বদলে ২১ মার্চ মানবাধিকার দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এ প্রসঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার এই ব্যতিক্রমী দিবস-পালনের ঘটনাটি সংক্ষেপে জেনে নেওয়া যাক। দক্ষিণ আফ্রিকায় একটি নিয়ম ছিল যাতে দেশের বাইরে থেকে আসা বা অভ্যন্তরস্থ সকল কর্মী-শ্রমিককে সবসময় একটি পরিচয়পত্র তথা পাস (pass) সঙ্গে রাখতে হত, পাস না থাকলে যেকোনো মুহূর্তে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে অন্যত্র পাঠিয়ে দিতে পারতো। এর বিরুদ্ধেই ১৯৬০ সালের ২১ মার্চ সকলে দক্ষিণ আফ্রিকার গুটেং-এর শার্পভিলে থানার সামনে বহু লোক জড়ো হয় ‘পাস’ ছাড়াই। পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘাতের ফলে ১৮০ জন আহত হন এবং ৬৭ জন মারা যান। মানবাধিকারের দাবিতে এই শহীদদের স্মৃতিতেই দক্ষিণ আফ্রিকায় ১০ ডিসেম্বরের পরিবর্তে ২১ মার্চ তারিখে পালিত হয় মানবাধিকার দিবস। দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষদের এই প্রতিবাদ ছিল সাম্য, মর্যাদা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, জমায়েতের স্বাধীনতা এবং আন্দোলনের স্বাধীনতার সপক্ষে। দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি নেলসন ম্যাণ্ডেলা এই দিনটিকে জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করেন। 

সাধারণভাবে রাষ্ট্রের সংবিধান স্বীকৃত যে সকল অধিকার মানুষের জীবন নির্বাহের সহায়ক সেগুলিই মানবাধিকার। মানবাধিকার সমাজের সকল মানুষের জন্মগত, অলঙ্ঘ্যনীয়, সর্বজনীন এবং সহজাত। মানুষ এই অধিকারগুলি ভোগ এবং চর্চা করবে, তবে তা অন্যের ক্ষতিসাধন ছাড়াই। পৃথিবীর সর্বত্র মানবাধিকারের গুরুত্ব ও ব্যাপ্তি সমান। রাষ্ট্রসংঘের ‘ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অফ হিউম্যান রাইটস’ (Universal Declaration of Human Rights)-এর প্রথম অনুচ্ছেদে লেখা আছে, ‘ All human beings are born free and equal in dignity and rights.’ অর্থাৎ জন্মগতভাবে সকল মানুষ স্বাধীন এবং সমান সম্মান-মর্যাদার অধিকারী। এই মানবাধিকারের বিষয়টি বহুচর্চিত এবং পৃথিবীতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময় মানবাধিকার বিষয়টি বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। দেশের আইন ও সংবিধানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে মানুষ জাতি, বয়স, লিঙ্গ নির্বিশেষে অন্যের অধিকারকে সম্মান জানানোর পাশাপাশি নিজেও সেই অধিকার ভোগ করতে পারেন। বর্তমান বিশ্বে মানবাধিকারের পথে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হল দারিদ্র্য। তাই মানবাধিকার সংরক্ষণের জন্য দারিদ্র্য দূরীকরণ সর্বপ্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত। ঐতিহ্য-পরম্পরায় এই ১০ ডিসেম্বরেই দুটি পুরস্কার প্রদান করা হয়। প্রথমটি পঞ্চবার্ষিকী রাষ্ট্রসংঘ পুরস্কার এবং অপরটি হল নোবেল শান্তি পুরস্কার।

এই দিনটিতে একদিকে পৃথিবীর নানা প্রান্তে রাজনৈতিক আলোচনাসভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি মানবাধিকারের নানা দিক কেন্দ্র করে বিভিন্ন প্রদর্শনী হয়ে থাকে। রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের উচ্চ আধিকারিক (High Commissioner) প্রতি বছর এই মানবাধিকার দিবস পালনের বিষয়টি তদারকি করে থাকেন। এই দিন উপলক্ষে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন এক বাণীতে প্রতিটি রাষ্ট্রকে বছরের প্রত্যেক দিন মানবাধিকার রক্ষায় তাদের বাধ্যবাধকতা পালনের ডাক দিয়েছেন। 

১৯৫০ সাল থেকে মানবাধিকার দিবস পালন শুরু হলেও প্রথমদিকে এই বিশেষ দিনের কোনো প্রতিপাদ্য ছিল না। ২০০৬ সালে প্রথম প্রতিপাদ্য সহ এই দিনটি পালিত হয়। ২০০৬ সালে মানবাধিকার দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে অবস্থান’ (Stand against Poverty)। এরপরে ২০১৬ সালে এই দিনের প্রতিপাদ্য ছিল ‘ আমাদের অধিকার, আমাদের স্বাধীনতা’ (Our Rights, Our Freedoms, Always)। ২০১৭-তে ‘সাম্য, সুবিচার এবং মর্যাদার জন্য লড়াই’ (Let’s Stand Up for Equality, Justice and Human Rights) এই প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে মানবাধিকার দিবস পালিত হয়েছিল। ঠিক তার পরের বছর ২০১৮ সালে বিশেষ প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘মানবাধিকারের জন্য আন্দোলনে সামিল হও’ (Stand Up for Human Rights) আর গত বছর অর্থাৎ ২০১৯-এর প্রতিপাদ্য ‘মানবাধিকারের জন্য আন্দোলনে যুবক-যুবতীরা সামিল হও’ (Youths Stand Up for Human Rights)। ২০২০ সালে রাষ্ট্রসংঘ এই দিনের প্রতিপাদ্য বিষয় স্থির করেছে ‘মানবাধিকারের জন্য আন্দোলনে সামিল হও – অধিকার ফিরিয়ে আনো’ (Recover Better – Stand Up for Human Rights)।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

শুধুমাত্র খাঁটি মধুই উপকারী, তাই বাংলার খাঁটি মধু খান


ফুড হাউস মধু

হোয়াটস্যাপের অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন