সববাংলায়

হুসাইনারা খাতুন বনাম বিহার স্বরাষ্ট্র সচিব মামলা

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে বিভিন্ন সময়ে বিচারালয়ের কাছে এমন কিছু মামলা এসেছে যা সংবিধানের কোন কোন ধারাকে বিশেষত মৌলিক অধিকার সংক্রান্ত ধারাগুলিকে পুনরায় বিস্তারিতভাবে ব্যাখার সুযোগ করে দিয়েছে। ১৯৭৯ সালে সুপ্রিম কোর্টে তেমনই একটি মামলা এসেছিল, যেটি হুসাইনারা খাতুন বনাম বিহার স্বরাষ্ট্র সচিব মামলা (Hussainara Khatoon and other v. Home Secretary, State of Bihar)নামে পরিচিত। এই মামলা দায়ের করার নেপথ্যে ছিলেন আইনজীবী পুষ্প কপিলা হিঙ্গোরানি যাঁকে ভারতের জনস্বার্থ মামলার মা বলা হয়। মূলত বিচারাধীন অবস্থায় বন্দীদের দীর্ঘ সময়ে কারাগারে বন্দী থাকার মতো ঘটনা ছিল এই মামলার কেন্দ্রবিন্দু। বিহার জেলে তেমনই বিচারাধীন নারী ও শিশুসহ অসংখ্য মানুষের হদিশ পাওয়া গিয়েছিল বিচারের জন্য অপেক্ষা করে করে দীর্ঘ সময় জেলে কাটিয়ে যাদের শোচনীয় অবস্থা হয়েছিল। এমন অনৈতিকভাবে কারাবন্দী থাকার বিরুদ্ধে এই মামলা আওয়াজ তুলেছিল এবং এমন অমানবিক ঘটনা বন্ধ করবার প্রয়াস করেছিল।

গভীরে যাওয়ার আগে কীভাবে এই মামলার সূত্রপাত হল, সেদিকে লক্ষ করা যাক। ১৯৭৭ সালে জাতীয় পুলিশ কমিশন গঠিত হয়েছিল। রিপোর্ট তৈরি করবার জন্য কমিটির অন্যতম এক সদস্য স্যার আর.এফ রুস্তম বিহারের জেলগুলি পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। সেই সময় তিনি মুজাফফরপুর ও পাটনার জেলগুলিতেও গিয়েছিলেন৷ সেইসব জেলে তিনি এমন অনেক কয়েদিদের দেখেছিলেন যারা দীর্ঘসময় ধরে কেবল বিচারাধীন অবস্থায় বন্দী হয়ে ছিল। তিনি এও খতিয়ে দেখেছিলেন যে, বিচারে অপরাধী প্রমাণিত হলে আদালত তাদের যত বছরের শাস্তি দিত, কোন কোন কয়েদি তার চেয়েও বেশিদিন কেবল বিচারের অপেক্ষায় কারাবন্দী হয়ে ছিল। এমনকি এও দেখা গিয়েছিল যে, কোন কোন কয়েদির মামলায় বিচার পর্যন্তও শুরু হয়নি, কখনও আবার দীর্ঘ বছর পেরিয়ে গেলেও তদন্ত শেষ হয়নি। দরিদ্র সেইসব কয়েদিদেরও নিজেদের প্রতিরক্ষার্থে কিংবা জামিনের জন্য ব্যয় করবার সামর্থ্যও ছিল না। নারী ও শিশুসহ অনেক মানুষ এইভাবে জেলবন্দী হয়ে ছিল।

এই ঘটনাই পরবর্তীকালে ১৯৭৯ সালে ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ নিউজপেপারে প্রতিবেদন আকারে প্রকাশিত হয়েছিল। আইনজীবী পুষ্প কপিলা হিঙ্গোরানি যখন এই বিষয়ে জানতে পারেন তখন সুপ্রিম কোর্টে হুসাইনারা খাতুন নামে একজন বিচারাধীন মহিলা বন্দীর নামে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেন। ভারতীয় সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদের অধীনে আদালতে একটি রিট পিটিশন হেবিয়াস কর্পাস দাখিল করা হয়েছিল। এছাড়াও ১৭জন বিচারাধীন বন্দীর মুক্তির জন্য একটি রিট পিটিশন দাখিল করা হয়।

পিটিশনে বিচারাধীন অবস্থায় জেলবন্দী থাকা এমনকি ছোটখাটো অপরাধের জন্য বিচারাধীন অবস্থায় ৫-১০ বছর কারাগারে থাকা, দারিদ্র্যের কারণে জামিন গ্রহণের সামর্থ্য না থাকা—পিটিশনে এই সবকিছুরই স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছিল।

এই সমস্যাগুলির ফলে এই মামলায় সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১ এবং ৩৯এ-এর কথা প্রসঙ্গত উঠে আসে। অনুচ্ছেদ ২১ মৌলিক অধিকারের কথা বলে। ২১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি ব্যতীত কোন ব্যক্তির জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা হরণ করা যাবে না। ফলত দ্রুত বিচারের অধিকার মৌলিক অধিকারের একটি অংশ হওয়া উচিত কিনা এই প্রশ্ন ওঠে। দ্বিতীয়ত, ৩৯এ অনুচ্ছেদে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা প্রদানের অধিকারের কথা উল্লিখিত রয়েছে। সংবিধানের এই দুই ধারাকে সামনে রেখে মামলাটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আদালত।

বিচারাধীন অবস্থায় দীর্ঘ সময় জেলবন্দী অবস্থায় কাটিয়েছে বহু মানুষ –  এমনকি কেউ কেউ অপরাধ অনুযায়ী আদালত প্রদত্ত শাস্তির মেয়াদের থেকেও যে বেশি সময় জেলে কাটিয়েছে তা স্পষ্টত আদালতের সামনে তুলে ধরেছিলেন পিটিশনকারী। অনুচ্ছেদ ২১-এ বর্ণিত মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনেরও দাবি করা হয়েছিল।

তবে বিপক্ষের আইনজীবীও পিটিশনের বিরুদ্ধে পাল্টা যুক্তি দিয়েছিলেন। এই উত্তরদাতারা জানিয়েছিলেন যে, পাটনা সেন্ট্রাল জেলে, মুজফফরপুর সেন্ট্রাল জেলে এবং রাঁচী সেন্ট্রাল জেলে আটক থাকা অনেক বিচারাধীন বন্দীকে নিয়মিত ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে হাজির করা হয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ অনুযায়ী তাদের বারবার বিচার বিভাগীয় হেফাজতে রাখা হয়েছিল। তবে আদালত এই যুক্তিকে সত্য বলতে মানতে নারজ ছিল, কারণ বিচারাধীন বন্দীদের পুনরায় হেফাজতে নেওয়ার কোন যথাযথ তারিখ বিপক্ষের আইনজীবীরা দেখাতে পারেননি। এছাড়াও তাঁরা বলেন যে, বিশেষজ্ঞদের মতামত প্রাপ্তিতে বাধা তৈরি হওয়ায় মামলার তদন্তগুলি বন্ধ করতে হয়েছিল। আদালত এই যুক্তিটিও খারিজ করে দিয়েছিল, কারণ রাজ্যের কাছে বিকল্প পদ্ধতি গ্রহণ ও ব্যবহারের ক্ষমতা রয়েছে, অতএব কেবল বিশেষজ্ঞদের মতামতের অভাবে মামলার তদন্ত বন্ধ হয়ে থাকবে, এই যুক্তিতে আদালত সন্তুষ্ট হয়নি।

ঐতিহাসিক এই মামলার বিচারের দায়িত্ব যে তিন বিচারপতিকে নিয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চের অধীনে ছিল, তাঁরা হলেন বিচারপতি পি.এন ভগবতী, বিচারপতি আর.এস পাঠক এবং বিচারপতি এ.ডি কোশল। ১৯৭৯ সালের ৯ মার্চ আদালত হুসাইনারা খাতুন বনাম বিহার স্বরাষ্ট্র সচিব মামলা-র রায় ঘোষণা করেছিল।

আদালতের সিদ্ধান্তগুলি উল্লেখ করার পূর্বে এই মামলায় আদালতের কয়েকটি মত নিয়ে কথা বলা যাক। সুপ্রিম কোর্ট বিচারাধীন বন্দীদের শোচনীয় অবস্থার কথা স্বীকার করেছিল এবং এর ফলে তাদের অধিকারও যে খর্ব হয়েছিল, সেই তত্ত্বটিকেও মান্যতা দিয়েছিল। আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগে বন্দীদের ব্যর্থতা এবং মানবাধিকারকে উপেক্ষা করা—এই দুই প্রধান সমস্যা এবং তার সমাধানের ওপর আদালত গুরুত্ব দিয়েছিল। বিচারাধীন বন্দীদের তালিকায় যাদের নাম ছিল তারা যে সত্যিই দীর্ঘদিন কারাগারে ছিল এবং বিচারে শাস্তি হলে শাস্তির মেয়াদ যত হত তার থেকেও বেশিদিন যে তারা কারাবন্দী ছিল আদালত সেই বিষয়গুলিকেও খতিয়ে দেখে এর সত্যতা স্বীকার করেছিল। সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দিয়েছিল যে, কয়েদিদের দ্রুত বিচারের সাংবিধানিক অধিকার কোন রাজ্যই অস্বীকার করতে পারে না এবং ন্যায়বিচারের সমান অধিকারকেও অবশ্যই মান্যতা দিতে হবে।

আদালতের গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়ে এবারে আলোচনা করা যাক।

অ্যাডভোকেট পুষ্প কপিলা হিঙ্গোরানির জমা দেওয়া তালিকায় যাদের নাম ছিল সেই সমস্ত বিচারাধীন বন্দীদের ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছিল আদালত। আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছিল যে, বিচারাধীন অবস্থায় দীর্ঘদিন আটক করে রাখা আদতে বেআইনি এবং তা ২১ অনুচ্ছেদে বর্ণিত মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে, কারণ, বিচারে অভিযুক্তরা দোষী সাব্যস্ত হলেও আদালত তাদের যতটুকু শাস্তি দিত, তারচেয়েও বেশিদিন বিচারাধীন অবস্থায় তাদের জেলে কাটাতে হয়েছে। জীবনের অধিকারকে তা খর্ব করে। অতএব দ্রুত বিচারের বিধি ২১ অনুচ্ছেদেরই অংশ হিসেবে ধরা যায়।

আদালত এও আদেশ দিয়েছিল যে, এরপর থেকে জামিনযোগ্য অপরাধে অভিযুক্ত বিচারাধীন বন্দীকে প্রদত্ত তারিখেই ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে বিচারের জন্য যখন হাজির করতে হবে এবং তখন রাজ্য সেই অভিযুক্তকে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা প্রদান করবে এবং নিজেদের খরচায় একজন আইন উপদেষ্টা দেবে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল, যাতে বিচারাধীন দরিদ্র বন্দীরাও জামিনের জন্য সহজেই আবেদন করতে পারে।

এছাড়াও সুপ্রিম কোর্ট বিহার রাজ্য সরকার এবং হাইকোর্টকে নির্দেশ দিয়েছিল যে, বিহার রাজ্যের সমস্ত দায়রা আদালত ও ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের অবস্থান এবং প্রত্যেকটি আদালতে বিচারাধীন মামলার মোট সংখ্যার বিশদ হিসেব উচ্চ আদালতে জমা দিতে হবে। শুধু জমা দিলেই হবে না, আদালত জানিয়েছিল, কোন মামলা ছয় মাসের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন থাকলে মামলা নিষ্পত্তির বিলম্বের কারণগুলিও জানাতে হবে।

সুপ্রিম কোর্ট এমনকি সংসদকেও এই বেইল (BAIL) ব্যবস্থাটির পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছিল যাতে নামহীন দরিদ্ররা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হয়। এই মামলায়, আদালত জানিয়েছিল, একজন আসামি ব্যক্তিগত বন্ডের ভিত্তিতে জামিন নিতে পারে তবে এই ধরনের জামিনের ক্ষেত্রে আসামির কয়েকটি জিনিস বিবেচনা করে নিতে হবে।

ন্যায়বিচারের দিক দিয়ে ভেবে দেখতে গেলে এই মামলাটি বাস্তবিকই খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই মামলার রায়ের পরে বহু বিচারাধীন বন্দীর মুক্তি হয়েছিল। এমনকি জনস্বার্থ মামলার গুরুত্ব ও পরিধিও প্রসার লাভ করেছিল। তাই হুসাইনারা খাতুন বনাম বিহার স্বরাষ্ট্র সচিব মামলা যে নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী মামলা, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading