কেরালা – ভারতের মধ্যে সবথেকে বেশি শিক্ষার হার এই রাজ্যেই। আর এই রাজ্যেই পর্বত আর অরণ্য বেষ্টিত এডামালাকুডি গ্রামে সারা রাজ্যের মধ্যে শিক্ষার হার সবথেকে কম। বিষয়টা সত্যিই ভাবায়। যেখানে সামান্য একটা বই আনতে ছেলে-মেয়েদের গভীর জঙ্গল আর পার্বত্য পথ পেরিয়ে যেতে হয় অনেকটা রাস্তা, সেখানে জ্ঞানচর্চার আলো অনির্বাণ হয়ে জ্বলে থাকবে কীভাবে? কথায় বলে, প্রদীপের তলাতেই অন্ধকার। আর সেই অন্ধকারের পথে আলো জ্বেলে সেই পথেই মনীষার জাগরণ ঘটালেন এডামালাকুডি পল্লীর সামান্য এক চা-বিক্রেতা আর একজন শিক্ষক। জঙ্গলের মাঝে চা-দোকানেই গড়ে উঠেছে ভারতের নির্জনতম লাইব্রেরী (India’s loneliest library)।
সাম্প্রতিক পোস্ট
অরণ্য এখানে এতটাই গভীর যে এতদিন পর্যন্ত পায়ে হেঁটেই পৌঁছাতে হতো এডামালাকুডি পল্লীর এই জায়গাটিতে যার নাম ইরুপ্পুকাল্লু। কিন্তু এখন জিপ যাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। মনে হয় এটাই পৃথিবীর একমাত্র নির্জনতম অরণ্যসঙ্কুল স্থানে অবস্থিত গ্রন্থাগার। আর সেটা গড়ে উঠলো কোথায়? – সামান্য এক চায়ের দোকানে। চা-দোকানে রাজ্য-রাজনীতি-বিপ্লব-ফুটবল-সাহিত্য সব আলোচনাতেই থেকেছেন আপনারা, কখনও ভেবেছেন চা-দোকানেই যদি থাকতো বইয়ের সম্ভার কেমন হতো? আপনি অসম্ভব বলে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতেই পারেন, কিন্তু এই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছেন কেরালার সামান্য এক চা-বিক্রেতা পি.ভি.চিন্নাথাম্বি আর স্কুল শিক্ষক পি.কে.মুরলীধরন। চলুন জেনে নিই এই নির্জনতম লাইব্রেরীর আপাত-অসম্ভব কাহিনী।
শিক্ষক মুরলীধরন প্রায় কুড়ি বছর ধরে পড়ে আছেন এই ইরুপ্পুকাল্লু পল্লীতে শুধুমাত্র এখানকার আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে শিক্ষার বিস্তার ঘটাবেন বলে। স্থানীয়দের কাছে তিনি জীবন্ত কিংবদন্তী। তাঁর কথায় জানা যায় যে, তাঁর এক বন্ধু উন্নি প্রসন্থ কাজ করতেন তিরুবনন্তপুরমের আকাশবাণী এবং রেড এফ.এম-এর দপ্তরে। সেই উন্নি প্রসন্থ ২০০৯-২০১০ সালের মধ্যে এখানে একদিন এসে উঠেছিলেন চা-বিক্রেতা চিন্নাথাম্বির কুটিরে আর তার সঙ্গেই এলাকার শিক্ষাগত অবস্থা নিয়ে আলোচনা করছিলেন মুরলীধরন। আর তখনই প্রথম এই এলাকায় একটি লাইব্রেরী খোলার পরিকল্পনা করা হয়। ঠিক এর কয়েকমাস পরেই উন্নি প্রসন্থ আর তার বন্ধু কেরালা-কৌমুদী পত্রিকার সহ-সম্পাদক বি.আর. সুমেশ মোট ১৬০টি বই যোগাড় করে নিয়ে আসেন এখানে। সেই ১৬০টি বই দিয়েই শুরু হয় চিন্নাথাম্বি আর মুরলীধরনের স্বপ্নের লাইব্রেরীর যাত্রা। এখন প্রশ্ন হতে পারে চা-দোকানেই কেন তৈরি হল এই লাইব্রেরী? এ প্রসঙ্গে চিন্নাথাম্বি স্বয়ং জানাচ্ছেন যে, তার দোকানে এমনিতেই অনেক লোকের আসা-যাওয়া লেগে থাকে। আর সেই সময়েই চা-বিস্কুট এটা সেটা খেতে খেতে তারা হয়তো বইও পড়তে পারে – এই ভাবনাই কাজ করেছিল তখন। একটা সময় পরে দেখা গেল, শুধু বই পড়তেই মানুষ এই চা-দোকানে আসছেন, কিংবা খুব সামান্য মূল্যের বিনিময়ে বই বাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন পড়বার জন্য। অন্যান্য লাইব্রেরীর মতোই এখানেও ক্রমে রেজিস্টার খাতা চালু হল। আর বার্ষিক ২৫ টাকার একটা সদস্যপদের চাঁদা এবং তার সঙ্গে মাসিক ২ টাকার চাঁদা নেওয়া শুরু হল।
বিস্ময়ের কথা হল, এই লাইব্রেরীতে কোনো জনপ্রিয় পত্রিকা, সাময়িকী বা জনপ্রিয় উপন্যাস-গল্প ইত্যাদি রাখা হয়না, বরং এখানে থাকতো সিলাপ্পাথিকারম্-এর মতো অনূদিত ক্লাসিক বই, কিছু রাজনৈতিক বই এবং বিখ্যাত মালয়ালম সাহিত্যিক ভাইকম্ মুহম্মদ বশীর, এম.টি বাসুদেবন নায়ার, কমলা দাস, এম মুকুন্দন, ললিথাম্বিকা অন্থর্জনম প্রমুখের সব বিখ্যাত বই। স্থানীয়দের ভাষায় একে ‘কাটিল্ ওরু লাইব্রেরী’ অর্থাৎ জঙ্গলের মধ্যে লাইব্রেরী বলা হতো। সর্বপ্রথম সাংবাদিক পি. সৈনাথ এই গ্রামে গিয়ে লাইব্রেরীটি আবিষ্কার করেন এবং তারপরই অনেকেই এই লাইব্রেরীকে আরো উন্নত করে তুলতে সহায়তা করেছেন। সাংবাদিক কে.এক শাহজি একটি ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে হাজারটি বই সংগ্রহ করে দেন চিন্নাথাম্বির লাইব্রেরীর জন্য। কেরালার ‘মঙ্গলম’ পত্রিকার সম্পাদক আইভি বাবু বইগুলির যথাযথ সংরক্ষণের জন্য একটি আলমারি উপহার দেন চিন্নাথাম্বিকে। একটা সময় যে চটের বস্তায় ফেলে দেওয়া ডাবের খোলা বা চাল থাকতো চিন্নাস্বামীর দোকানে, এখন সেই বস্তাতেই ভরে উঠেছে বই। একটা আলমারিতেও আর সব বই রাখার স্থান সংকুলান হচ্ছে না। বই, বই, শুধুই বই।
কিন্তু এত আশার মাঝেও অভিযোগের সুর শোনা যায় চিন্নাথাম্বির কণ্ঠে। এডামালাকুডির গ্রাম পঞ্চায়েত প্রথমে পঞ্চাশ হাজার টাকার অনুদান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও তারা কেউই তা পালন করেনি। ৭৩ বছর বয়সে বার্ধক্যে উপনীত চিন্নাথাম্বি দুশ্চিন্তা করেন আজও যে একা একা এই পুরো লাইব্রেরীটা সামান্য চা-দোকানের মধ্যে আর কতদিনই বা তিনি চালাতে পারবেন! যদিও স্থানীয় মুথাভান সম্প্রদায়ের মানুষ সকলেই অনেক সাহায্য করেছেন তাঁকে এই লাইব্রেরীর সংরক্ষণের জন্য। ২০১৭ সালে এই লাইব্রেরীর সব বই দিয়ে দেওয়া হয় একটি স্থানীয় স্কুলে এবং তাঁর নাম দেওয়া হয় ‘অক্ষরা’। চিন্নাথাম্বির এই লাইব্রেরী ইরুপ্পুকাল্লু গ্রামের দারিদ্র্য-কবলিত এলাকায় ভাতের ক্ষুধা মেটাতে না পারুক, জ্ঞানের পিপাসা মিটিয়ে চলেছে। চিন্নাথাম্বি হয়তো থাকবেন না, থেকে যাবে তাঁর স্বপ্নের লাইব্রেরী, ভারতের নির্জনতম লাইব্রেরী ‘অক্ষরা’।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান