ভারতবর্ষে চাকরি এবং শিক্ষাক্ষেত্র ছাড়াও আরও নানান বিষয়ে সংরক্ষণের ব্যবস্থা খুবই গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে রয়েছে। মূলত ভারতের অনগ্রসর ও পশ্চাৎপদ শ্রেণির জন্যই সংবিধানে এই সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এই সংরক্ষণের নীতি কীসের ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত তা নিয়ে বিস্তর জলঘোলা হয়েছিল এবং সেখান থেকে ইন্দ্র সাহনি বনাম ভারত মামলা-র (Indra Sahwaney vs Union of India) মতো ঐতিহাসিক এক মামলার সূত্রপাত হয়েছিল। ১৯৯২ সালের এই মামলা আবার মন্ডল কমিশন মামলা নামেও পরিচিত। সংরক্ষণ বিষয়ক বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এই মামলা থেকে উঠে এসেছিল। সুপ্রিম কোর্টের এই রায় ভারতবর্ষে চাকরি, শিক্ষা এবং অন্যান্য সরকারী পরিষেবার ক্ষেত্রে সংরক্ষণকে নিশ্চিত করেছিল, যা নিঃসন্দেহে এক যুগান্তকারী ঘটনা।
ভারতীয় সংবিধানের ৩৪০(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ১৯৫৩ সালের ২৯ জানুয়ারি অনগ্রসর শ্রেণি কমিশন গড়ে উঠেছিল, যা কাকা কালেলকর কমিশন নামেও পরিচিত। ১৯৫৫ সালের ৩০ মার্চ একটি রিপোর্ট পেশ করে কমিশন, যাতে ২৩৯৯টি জাতিকে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। ১৯৬১ সালে সরকার কমিশনের এই সুপারিশকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। ১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইয়ের অধীনে জনতা পার্টির নেতৃত্বে দ্বিতীয় অনগ্রসর শ্রেণী কমিশন গঠিত হয়েছিল, যেটি আবার মন্ডল কমিশন নামেও পরিচিত। স্যার বিপি মন্ডল এই কমিশনের সভাপতিত্ব করেন এই কমিশনকে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর শ্রেণির (SEBC) জন্য পাবলিক সেক্টরেরর চাকরিতে সংরক্ষণের মানদন্ড নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
১৯৮০ সালের ডিসেম্বর মাসে মন্ডল কমিশন ৩৭৪৬টি জাতিকে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পশ্চাদপদ জাতি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করে। এই কমিশন সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে তফশিলি জাতি/উপজাতিদের জন্য ২২.৫ শতাংশ এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি বা ওবিসিদের জন্য ২৭ শতাংশ সংরক্ষণের সুপারিশ করেছিল এবং ‘ক্রিমি লেয়ার’ বা অনগ্রসর জাতির মধ্যেও অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে থাকা অংশকেও সংরক্ষণের অন্তর্ভুক্ত করেছিল। মন্ডল কমিশনের রিপোর্ট কার্যকর হওয়ার আগেই জনতা দলের পতন হয় এবং কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় আসে। যতদিন কংগ্রেস ক্ষমতায় ছিল ওই রিপোর্ট বাস্তবায়িত হয়নি। পরে ১৯৮৯ সালে ভিপি সিং-এর নেতৃত্বাধীন জনতা দল ক্ষমতায় আসার পর মন্ডল কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নের জন্য একটি অফিস মেমোরেন্ডাম জারি করে। সেই সময় এই সংরক্ষণের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ওঠে। পরে ১৯৯১ সালে নরসিমা রাও-এর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকার মন্ডল কমিশনের রিপোর্টে কিছু সংশোধন করে তা বাস্তবায়নের জন্য আবার একটি অফিস মেমোরেন্ডাম জারি করেছিল। এই সংশোধনের মধ্যে অন্যতম ছিল, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল জনগোষ্ঠীর জন্য আরও ১০ শতাংশ সংরক্ষণ, যারা কোনরকম সংরক্ষণের সুবিধাই লাভ করতে পারছে না। এছাড়াও SEBC-দের মধ্যেও সবচেয়ে দরিদ্রতম অংশদের জন্য ২৭ শতাংশ সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও বলা হয় সংশোধনে। তবুও দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সহিংসতা অব্যহত ছিল।
মন্ডল কমিশনের বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে বেশ কিছু প্রতিবাদ সেসময় ওঠে। ইন্দ্র সাহনির নেতৃত্বে একদল মানুষ সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদের অধীনে সুপ্রিম কোর্টে সরকারের এই মন্ডল কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে পিটিশন জমা দিয়েছিল। এই মামলা তাই ইন্দ্র সাহনি বনাম ভারত মামলা বা মন্ডল কমিশন মামলা নামেও পরিচিত।
ইন্দ্র সাহনিদের জমা দেওয়া পিটিশনে মূলত যেসব প্রসঙ্গ তোলা হয়েছিল, সেগুলি হল:-
প্রথমত, সংরক্ষণের ক্রমাগত সম্প্রসারণের ফলে সব নাগরিকের সংবিধান স্বীকৃত যে সমান সুযোগের অধিকার তা লঙ্ঘন করা হয়।
দ্বিতীয়ত, জাতপাত কখনও অনগ্রসরতার নির্ভরযোগ্য সূচক হতে পারে না। তাঁদের মতে, বর্ণের ভিত্তিতে সংরক্ষণ সমতা এবং অবৈষম্যের যেসব সাংবিধানিক নীতি সেগুলির সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ। তাঁরা এই সংরক্ষণ অর্থনৈতিক মানদন্ডের ভিত্তিতে হওয়া উচিত বলে মনে করেছিলেন। তাঁদের মতে, বর্ণের ভিত্তিতে সংরক্ষণ চালু হলে তা পুনরায় বর্ণপ্রথাকে পুনরুজ্জীবিত করে জাতিতে জাতিতে বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে। পিটিশনে উত্থাপিত সংরক্ষণের মানদন্ড নির্ধারণের সূত্র ধরেই সংবিধানের ধারা ১৬(৪)-কে কেন্দ্র করে নানারকম প্রশ্ন উঠে এসেছিল। সেই ধারা অনুযায়ী কোন কিছুই রাষ্ট্রকে অনগ্রসর জাতিকে সরকারী চাকরিতে সংরক্ষণের অধিকার দেওয়ার জন্য বিধান তৈরিতে বাধা দেবে না। এই অনগ্রসর শ্রেণিকে অর্থনৈতিক বা অন্যান্য কোনকিছুর ভিত্তিতে শ্রেণিবিভক্ত করার অনুমতি সংবিধান দেয় কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এছাড়াও ১৬(৪)-এ উল্লিখিত অনগ্রসর শ্রেণির অর্থই বা কি হবে তা নিয়েও জল্পনার সূচনা হয়েছিল।
তৃতীয়ত, সেই পিটিশনে বলা হয় যে, এই মন্ডল কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে সরকারী প্রতিষ্ঠানের কাজ এবং দক্ষতা একটা ঝুঁকির মধ্যে থাকবে।
আবেদনকারীরা তাঁদের পিটিশনে ১৯৩১ সালের পুরনো আদমশুমারি ব্যবহার করে ওবিসিদের চিহ্নিতকরণের সমালোচনা করে এবং এই চিহ্নিতকরণ সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী হওয়া উচিত বলে জানায়।
আবেদনকারীদের এইসব যুক্তির বিপরীতে পাল্টা যুক্তি দিয়েছিলেন বিরোধী পক্ষের আইনজীবীরা। তাঁরা জানান যে, ইন্দ্র সাহনিদের দৃষ্টিভঙ্গি সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর শ্রেণিকে ১৬(৪) ধারা থেকে সুবিধা পাওয়ার তাদের যে বৈধ ও মৌলিক অধিকার তাকে অস্বীকার করে। দ্বিতীয়ত, তাঁরা বলেন, ১৯৩১ সালের আদমশুমারি অনুসৃত হয়েছে দাবিটি সঠিক নয়, কারণ, উপজাতি ও আদিবাসী গোষ্ঠীগুলিকে চিহ্নিত করার জন্য দেশব্যাপী সামাজিক-শিক্ষামূলক ক্ষেত্র জরিপ এবং ১৯৬১ সালের আদমশুমারির তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। স্পষ্ট করে জানানো হয় যে, ১৯৩১ সালের আদমশুমারি ওবিসি চিহ্নিতকরণের প্রাথমিক ভিত্তি ছিল না। এছাড়াও বিরোধীরা যুক্তি দেন যে, মন্ডল কমিশনের সুপারিশ আদালত-প্রতিষ্ঠিত মানদণ্ড অনুসারে সামাজিক, শিক্ষাগত এবং অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা বিবেচনা করে।তাঁরা জানান, কমিশন নিজেদের কর্তৃত্বের আওতায় থেকেই কাজ করেছে, সংবিধান পুনর্লিখনের কোন প্রচেষ্টা এতে নেই।
সুপ্রিম কোর্টের নয়জন বিচারপতির বেঞ্চের অধীনে এই জনস্বার্থ মামলাটি চলেছিল। সেই সময় প্রধান বিচারপতি ছিলেন বিবেক মন্ডল। এই মামলার সঙ্গে জড়িত বিচারপতিরা হলেন, এমএইচ কানিয়া, এমএন ভেঙ্কটাচালিয়া, এসআর পান্ডিয়ান, ডক্টর টি কে থমেন, এএম আহমাদি, কুলদীপ সিং, পিবি সাওয়ান্ত, আরএম সাহাই এবং বিপি জীবন রেড্ডি।
১৯৯২ সালের ১৬ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট এই ঐতিহাসিক মামলার রায় প্রদান করে।
সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দেয় যে, জাতপাত পশ্চাৎপদতার একটি গ্রহণযোগ্য সূচক এবং সরকার প্রবর্তিত ওবিসিদের জন্য ২৭ শতাংশ সংরক্ষণ সম্পূর্ণরূপে বৈধ। আদালত জানিয়েছিল, কেবল অর্থনৈতিক মানদন্ড নয়, পাশাপাশি সামাজিক ও শিক্ষাগত কারণগুলিকেও অনগ্রসরতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিবেচনা করতে হবে। সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টতই জানিয়ে দিয়েছিল ১৬(৪) ধারার অধীনে সংরক্ষণ ৫০ শতাংশের সীমা অতিক্রম করা উচিত নয়, নতুবা সমতা নষ্ট হতে পারে এবং যোগ্য প্রার্থীরা বঞ্চনার শিকার হতে পারেন।
আদালতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল ‘ক্রিমি লেয়ার’কে অর্থাৎ অনগ্রসর শ্রেণির মধ্যেও অর্থনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষাগত দিক থেকে তুলনামূলক এগিয়ে থাকা অংশকে সংরক্ষণের আওতা থেকে বাদ রাখতে হবে। সংরক্ষণের সুবিধা সত্যিকারের সুবিধা-বঞ্চিতরাই যাতে পায়, সেদিকে জোর দিয়েছিল আদালত।
ভারতবর্ষের প্রেক্ষাপটে দেখতে গেলে ইন্দ্র সাহনি বনাম ভারত মামলা এবং সুপ্রিম কোর্টের সংরক্ষণের পক্ষে দেওয়া রায় যে অবশ্যই ঐতিহাসিক, তা নিয়ে কোনরকম সংশয় নেই।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান