মোষের চামড়ার নৌকা

মোষের চামড়ার নৌকা

জলপথে  যাতায়াতের জন্য বিভিন্ন ধরণের জলযান মানুষ তৈরী করেছে তার নিজের সুবিধার্থে।  এর মধ্যে যেমন কাঠের ভেলা রয়েছে তেমনি বিলাস বহুল প্রমোদতরীও রয়েছে।  এরকমই একটি অদ্ভুত জলযান হল দ্রিয়া। এটি এমন একটি জলযান  যেখানে মোষের চামড়ার ভেতর হাওয়া পুরে সেটিকে নৌকা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে আমেরিকান স্কুল শিক্ষক তথা ফটোগ্রাফার জেমস রিকাল্টন তাঁর বই ‘ইন্ডিয়া থ্রু স্টিরিওস্কোপ – আ জার্নি থ্রু হিন্দুস্থান’ -এ এই দ্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে গেছেন।  

নিম্ন হিমালয়ের অন্তর্গত পাঞ্জাবের নালদেরা থেকে কুড়ি মাইল দূরবর্তী একটি পাহাড়ি এলাকায় কিছু প্রত্যন্ত গ্রামে ভ্রমণ করবার সময়ে রিকাল্টন প্রথম দেখতে পান এই জলযান।  মৃত মোষের দেহ থেকে নাড়ি ভুঁড়ি ও কঙ্কাল বের করে নেওয়া হয় প্রথমে।  এরপর দেহটিকে খুব ভালোভাবে সেলাই করা হয়। এরপর মোষের একটি পায়ের খুরের ভেতর গর্ত করে তার ভেতর দিয়ে একজন ব্যক্তি মুখ দিয়ে ফুঁ দিয়ে মোষের দেহটির ভেতর হাওয়া ভর্তি করে।  মোষের দেহটি হাওয়া দ্বারা পূর্ণ ভর্তি হয়ে গেলে এরপর মোষের পায়ের খুরের ভেতর থাকা গর্তটিকে সেলাই করে দেহটিকে জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।  এই ভাসমান মোষের চামড়ার নৌকাটির ওপর দুইজন মানুষ কিংবা অল্প ওজনের সামগ্রী পারাপার করা হত শতদ্রু নদী বরাবর। তবে এই জলযান অত্যন্ত হাল্কা হওয়ায় সঠিক ভারসাম্য অনুযায়ী বসতে হত।  নাহলে খরস্রোতা শতদ্রু নদীতে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকত।  তবে এই ধরণের জলযান যে কেবল ভারতেই একমাত্র দেখা যেত তা কিন্তু নয়।  পশুর চামড়াকে জলযান হিসেবে ব্যবহার করার প্রাচীনতম নিদর্শন পাওয়া যায় ৮৮৩ খ্রি: পূ: মেসোপটেমিয়ার শাসক দ্বিতীয় আশুরনাসিরপালের আমলে। মেসোপটেমিয়ার নিমরুদ থেকে প্রাপ্ত একটি প্রস্তর খন্ডে যেটি বর্তমানে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত সেখানে খোদাইকরা চিত্রে দেখা যায় প্রাচীন আসিরীয় সৈন্যরা ছাগলের চামড়ায় তৈরী একটি জলযানে চেপে ভেসে চলেছে। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক জেনোফোনের বর্ণনাতে জানা যায় সাইরাস এই ধরণের জলযানে চেপে ব্যাবিলনের নদী পারাপার করতেন। দারিয়ুস থেকে চেঙ্গিস খাঁ, কুবলাই খাঁ সকলেরই এই ধরণের জলযান ব্যবহারের নিদর্শন পাওয়া যায় ইতিহাসে। 

সভ্যতার সেই শুরু থেকেই মানুষের অনন্ত প্রচেষ্টা ছিল কীভাবে খরস্রোতা নদীকে বশ করে তাকে পারাপারের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে রূপান্তর করা যায়।  মোষের চামড়ার এই নৌকা তার অন্যতম নিদর্শন হয়ে রয়ে গেছে। 

তথ্যসূত্র


  1. https://www.amusingplanet.com/
  2. https://monk.radford.edu/
  3. https://www.bl.uk/
  4. India through the stereoscope - James Ricalton - Page - 124 - 125 

আপনার মতামত জানান