সববাংলায়

ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারা ও তার অবলুপ্তি

২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারতীয় দণ্ডবিধির ‘৪৯৭ ধারা’-র উপর এক যুগান্তকারী রায় দিয়ে ৪৯৭ ধারা টিকে রদ করেছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারাটি ব্যভিচার বিষয়ক।

এই ধারা অনুযায়ী, কোনও পুরুষ যদি পরস্ত্রীর সাথে তার  স্বামীর অনুমতি ছাড়া যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হয়, তাহলে সেই পুুরুষটির শাস্তি হিসেবে পাঁচ বছর অবধি জেল বা জরিমানা অথবা দুটোই হতে পারে।

৪৯৭ ধারায় যা লেখা আছে তা হল-

কোনো পুরুষ যদি কোনো নারীর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে, এবং সেই নারীকে ঐ পুরুষটি অন্য ব্যক্তির স্ত্রী হিসাবে জানে বা জানবার যথেষ্ঠ কারণ তার কাছে আছে, এবং যদি ঐ পুরুষটি ঐ নারীর স্বামীর বিনা অনুমতিতে ঐ নারীর সাথে যৌন মিলন স্থাপন করে এবং এই যৌন  মিলন যদি ধর্ষণের অপরাধে জড়িত না হয়, সেক্ষেত্রে ঐ পুরুষটিকে  ব্যভিচারের অপরাধে অপরাধী মানা  হবে এবং তার পাঁচ বছরের জন্য জেল , বা জরিমানা অথবা উভয়ই  হতে পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রে ঐ নারীকে একই অপরাধের সহকারী  হিসাবে শাস্তি পেতে  হবে না।

এই ধারা অনুযায়ী একমাত্র বিবাহিতা মহিলা যে কিনা স্বামীর বিনা অনুমতিতে অন্য পুরুষের সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছে, তার স্বামীর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার ছিল। কিন্তু যদি কোনো বিবাহিত পুরুষ অন্য কোনো নারীর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে, তাহলে এই আইন সেই বিবাহিত পুরুষটির স্ত্রীকে এই অধিকার দেয়না যে সেও একইরকম পরিস্থিতিতে তার স্বামীকে অপরাধী প্রমাণ করতে পারে। অর্থাৎ এই আইনে নারীর অধিকার নেই তার স্বামীর ব্যাভিচারকে অপরাধ হিসেবে প্রমাণ করা। অর্থাৎ এই ধারা নারীকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করছিল।

আবার যে বিবাহিতা নারীর সঙ্গে কোনো পুরুষের সম্পর্ক তৈরি হয়, আইনে সেই নারীরও শাস্তির বিধান ছিল না, শাস্তি শুধুমাত্র সেই পরপুরুষটিই পেত। এখানে একটা লিঙ্গবৈষম্যের ব্যাপার ছিল।

তাছাড়া এই ধারা অনুযায়ী বিবাহিত নারীর স্বামীর অনুমতিতে যদি সেই নারী পরপুরুষের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে তাহলে তা অপরাধ নয়। অর্থাৎ এই ধারা অনুযায়ী নারীকে তার স্বামীর সম্পত্তি বলে ধরে নেওয়া হচ্ছিল।

২০১৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্ট এই ধারাটিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে। ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে একটি আবেদনের ওপর সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় যে ৪৯৭ ধারা অসাংবিধানিক এবং ব্যভিচার আইনত শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়। এই মামলায় রায়দানে ছিলেন পাঁচ বিচারপতির একটি বেঞ্চ। এর নেতৃত্বে ছিলেন প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র, সঙ্গে বিচারপতি আর এফ নরিমান, এ এম খানউইলকর, ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়, এবং ইন্দু মালহোত্রা।

প্রধান বিচারপতি মিশ্র বলেন যে, ব্যভিচারকে কখনই শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলা যায় না। দেড়শো বছরেরও বেশি পুরোনো আইনের এই ধারাটি সংবিধানের ১৪, ১৫ এবং ২১ নম্বর ধারার পরিপন্থী। কিন্তু ব্যাভিচার কিছু সামাজিক পরিস্থিতি যেমন বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে অবশ্যই ধরা যেতে পারে।

এই ধারাটি অসাংবিধানিক ঘোষণা করার পর বহু মহলে বহু প্রতিক্রিয়া হয়েছে।  এটিকে বহু জায়গায় বলা হয়েছে সুপ্রিম কোর্ট নাকি পরকীয়ার বৈধতা দিয়েছে। তথ্যটি সম্পূর্ণভাবে ভুল। এই ধারাটিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করার সাথে পরকীয়ার বৈধতার কোনো সম্পর্কই নেই। ধারাটি নারীকে বস্তু হিসাবে দেখছিল, শাস্তির ক্ষেত্রে লিঙ্গবৈষম্য করছিল। তাই ধারাটিকে তুলে দেওয়ার ফলে মানুষকে তার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হল, কখনই কাউকে পরকীয়ার অধিকার দেওয়া হল না।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading