ইতিহাস

বাঙালি পোশাকে মুসলিম প্রভাব

বাংলায় মুসলিম আগমন এ অঞ্চলের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক — সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছিল। পনেরো শতকে উপমহাদেশের পোশাক ও সংস্কৃতিতে মুসলিম সংস্কৃতির প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে – বাঙালির পোশাকও এর প্রভাব থেকে বাদ পড়েনি। বাঙালি পোশাকে মুসলিম প্রভাব নিয়ে আমরা এখানে আলোচনা করব।

প্রাক-মোঘল যুগে সুলতান ও খানেরা আঁটসাট পাতলুন, কোমরের দিকে সরু ও নিচের দিকে ক্রমশ প্রসারিত পূর্ণ ঘাগরা-সদৃশ আঁটো আস্তিনের একটি লম্বা কোট পরত। মাথায় থাকত পাগড়ি। মেয়েরা ছেলেদের মতো একই পোশাক পরত। মাথায় প্রায় একই রকম টুপি পরত। মুঘল সম্রাট মুহম্মদ জালালউদ্দিন আকবর দিল্লির ক্ষমতা গ্রহণের পর পোশাকে, বিশেষ করে মেয়েদের পোশাকের পরিবর্তন হয়। মঙ্গোলীয় নারীদের মতো মাথায় পাখার মতো মুকুটের বদলে রাজপুত মহিলাদের নেকাব বা দোপাট্টা স্থান করে নিতে থাকে। ঘাগরা এবং কাঁচুলি বা চোলির ব্যবহার শুরু হয়। পুরুষদের পশ্চিমী প্রভাবজাত মুসলিম পোশাকের একটি উদাহরণ হলো আচকান বা শেরওয়ানি। এটি ওভারকোটের মতো হাঁটুর নিচে নামানো এবং সম্মুখভাগ নিচ পর্যন্ত বন্ধ একটি লম্বা পোশাক।

চীনা কূটনীতিক ও ইউরোপীয় বণিকদের বিবরণে মুসলিম শাসনামলে বাংলার পোশাক সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। মহুয়ান বাঙালিদের পোশাক সম্পর্কে লিখেছেন, ‘পুরুষরা তাদের মস্তক মুণ্ডন করেন এবং গোল গলাবন্ধবিশিষ্ট লম্বা ও ঢিলা পোশাক পরিধান করেন; মাথায় তারা সাদা পাগড়ি ব্যবহার করেন এবং কোমরে চওড়া রঙিন রুমাল বাঁধেন। তাঁরা সুচালো চামড়ার জুতা পরেন।’ এই পোশাক রীতি ছিল মুসলিম সমাজের উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর, যাদের মধ্যে ছিলেন সরকারি কর্মচারী ও শিক্ষিতরা। আর বাংলার সাধারণ মুসলমানের পোশাকের বর্ণনা পাওয়া যায় পর্তুগিজ বণিক বারবোসার বর্ণনায়। তিনি লিখেছেন, ‘সাধারণ অধিবাসীরা খাটো সাদা শার্ট পরিধান করে, এটি উরু পর্যন্ত প্রলম্বিত থাকে। তারা তিন কিংবা চার প্যাঁচবিশিষ্ট শিরস্ত্রাণ ব্যবহার করে। তারা সবাই চামড়ার জুতা পরে এবং কেউ কেউ পরে রেশমি অথবা সোনালি সুতায় কাজ করা পাদুকা।’ মধ্যযুগে বাংলা মুসলমানদের পোশাকে গভীর ধর্মীয় প্রভাব দেখা যায়। কবি মুকুন্দরাম এ সম্পর্কে লিখেছেন, ‘তারা (মুসলমানগণ) মাথায় কোন কেশ রাখে না, কিন্তু বুক পর্যন্ত দাড়ি রাখে। তারা সর্বদা তাদের নিজস্ব পথ অনুসরণ করে। মুসলমানরা মাথায় টুপি পরে। তাদের টুপির দশটি রেখা থাকে। তারা ইজার (পায়জামা) পরিধান করে এবং তাদের কোমরের সাথে শক্ত করে বাঁধা থাকে। কাউকে (মুসলিম) খালি মাথায় দেখলে তারা তার সঙ্গে কোন কথা বলে না; কিন্তু যাবার সময় তারা তার দিকে মাটির ঢেলা নিক্ষেপ করে।’ কবি দ্বিজ বংশীবদন লিখেছেন, ‘হাসানের সাতপুত্র পায়জামা, নিমা (শার্ট), টুপি ও কটিবন্ধে সজ্জিত হয়।’ ষষ্ঠীবর বলেন, ‘কাজী ইজার (পায়জামা), লম্বা কোর্তা ও টুপি পরেন।’ এই বাঙালি কবিদের বর্ণনার সঙ্গে পঞ্চদশ শতকের চৈনিক রাষ্ট্রদূত মহুয়ানের বর্ণনা মিলে যায়। মহুয়ান লিখেছেন, ‘লোকেরা (মুসলমান) তাদের মাথা মুণ্ডন করে এবং মাথায় সাদা সুতি পাগড়ি ব্যবহার করে। তারা বন্ধনীযুক্ত লম্বা ও ঢিলা পোশাক পরিধান করে এবং মাথায় শিরাবরণ ব্যবহার করে।’ ডক্টর এমএ রহিম লিখেছেন, ‘কবি বর্ণিত চিত্রে দেখা যায় যে, মুসলমানরা পয়গম্বর ও প্রথম যুগের মুসলমানদের অনুসরণ করে মাথা মুণ্ডন করত ও লম্বা দাড়ি রাখত এবং পায়জামা, টুপি ও লম্বা কোর্তা পরিধান করত।’ উল্লেখ্য, মাথার সাদা সুতি পাগড়ি দৈর্ঘ্যে ৪০ ফুট এবং প্রস্থে ৬ ইঞ্চি ছিল। মুসলমানরা হাতের আঙুলে মুক্তা বসানো আংটি ব্যবহার করতেন। টুপি না পরলে সেই মুসলমান সমাজে অপ্রিয় হতেন, এটা বিভিন্ন বর্ণনায় উঠে এসেছে।

মধ্যযুগীয় শাসকেরা যেসব রুক্ষ অঞ্চলের পোশাক নিয়ে এসেছিলেন, এদেশে এসে তা আর পরিবর্তন করেননি। প্রথমদিকে বঙ্গে এসব পোশাক গ্রহণ করা না হলেও চতুর্দশ-পঞ্চদশ শতাব্দীতে এসে আস্তে আস্তে এ অঞ্চলের মানুষেরা এসব পোশাক পরতে শুরু করেন। প্রথমে বাদশাহের দরবারে, তারপর অভিজাতদের মধ্যে এবং পরে গ্রামের ধনীদের মধ্যে এসব পোশাক পরার প্রচলন শুরু হয়। প্রাচীন যুগে নারী-পুরুষ উভয়েই একপ্রস্থ কাপড় পরলেও মধ্যযুগে এসে উর্ধ্বাঙ্গে, নিম্নাঙ্গে ও মাথায়- মোট তিনটি বস্ত্র পরতে দেখা যায়। মুকুন্দরাম তাঁর ‘কবিকঙ্কণ চণ্ডী’তে পাগড়ি পরার কথা উল্লেখ করেছেন। সেসময় এরকম মুসলমানী পোশাক দরবার ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষ এমনকি অন্য ধর্মের মানুষের মাঝেও ছড়িয়ে পড়ে। শেখ জৈনুদ্দিনের আঁকা লেডি ইম্পের ছবিতে দেখা যায়- অভিজাতরা তো বটেই, চাকর-বাকররাও মাথায় পাগড়ি পরে আছে। যাদের এত পোশাক কেনার সামর্থ্য ছিল না তারা অবশ্য আগের মতো শুধু ধুতিই পরতেন।

মুকুন্দরামের লেখা থেকে জানা যায়, ষোল শতকের শেষ দিকের সচ্ছল মুসলমানেরা ইজার অথবা পাজামা পরতেন। মুসলমানদের প্রভাবে পরে হিন্দুদের মধ্যেও ইজার পরার প্রচলন শুরু হয়। ধর্মমঙ্গলে মুসলমানদের লম্বা জামা ও পাগড়ি পরার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এ পোশাক সাধারণ মুসলমানদের জন্য প্রযোজ্য নয়। তাদের সাথে হিন্দুদের পোশাকের খুব একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়  না। মুসলমানদের অনেকে ধুতির চেয়ে ছোট একখণ্ড কাপড় পরতো, যাকে এখন বলা হয় ‘লুঙ্গি’।

সেকালের অভিজাত মুসলিম নারীরা কামিজ ও সালোয়ার ব্যবহার করতেন। মুসলিম নারীদের পোশাকের বর্ণনায় চৈনিক দূতরা বলেছেন, ‘মেয়ে লোকরা খাটো জামা পরিধান করত, এসবের চারদিকে ভাঁজ করা এক খণ্ড সুতি কাপড়, সিল্ক কিংবা বুটিতোলা রেশমি বস্ত্র থাকত। তাদের গলায় চতুষ্পার্শ্বে তারা ঝুলানো কাপড় রাখত এবং পেছনে খোঁপা বেঁধে তারা তাদের কেশবিন্যাস করত। তাদের হাতে, কব্জিতে ও পায়ের গোড়ালিতে সোনার বলয় থাকত এবং হাত-পায়ের আঙুলে আংটি ব্যবহার করত।’ ডক্টর এমএ রহিম লিখেছেন, ‘বাংলা সাহিত্যে দেখা যায় যে, স্ত্রীলোকেরা সুন্দর পোশাক-পরিচ্ছদ ও মূল্যবান অলঙ্কারাদি খুব ভালোবাসত। তারা নানা প্রকার শাড়ি কিংবা ঘাঘরা এবং রেশমি জামা বা সুতি কাপড় পরিধান করত। সম্পদশালী ধনী পরিবারের মেয়েরা গলার হার, মুক্তা ও হীরার কর্ণকুণ্ডল ও অনন্ত, বালা বলয় ও মূল্যবান পাথর-বসানো সোনার আংটি ইত্যাদিতে সজ্জিত হতো। তারা কোমরে কিঙ্কিনী নামক আরো একটি অলঙ্কার পরত এবং পায়ে নূপুর বা পাঁইজর পরত।’

বাংলার মুসলিম পুরুষদের একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ পোশাকের নাম লুঙ্গি। লুঙ্গির প্রতিশব্দ ‘তহমত’ বা ‘তহমান’, শব্দ দুটির মূল ফারসি থেকে আগত। ভারতে প্রাথমিককালে আসা আরব অধিবাসীরা কুর্তা, চোগা আর তহমত ব্যবহার করতেন। সে সময় লুঙ্গি ছিল সেলাইহীন। পরবর্তীকালে আব্বাসীয় দরবারের নীতি অনুসরণে ভারতীয় মুসলিমদের লুঙ্গিতে সেলাই পড়ে। আরো একটি অনুমান প্রচলিত আছে যে, মগ বা বর্মীদের অনুকরণে পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের মধ্যে লুঙ্গির প্রচলন হয়।

বাংলার মুসলিমদের ঊর্ধ্বাঙ্গের সবচেয়ে জনপ্রিয় পোশাকটি ছিল সম্ভবত কুর্তা। এটি মূলত কোমর পর্যন্ত দীর্ঘ একটি আঁটসাঁট জামা। কুর্তা একই সঙ্গে কোর্তা, কুর্তি নামে পরিচিত ছিল। কুর্তার হাতা লম্বা আর গলা গোলাকার। পলাশীর যুদ্ধকেন্দ্রিক রচিত ছড়ায় আছে ‘ছোট ছোট তেলেঙ্গাগুলি কালো কুর্ত্তি গায়।’ আবার তিতুমীরের বিদ্রোহ নিয়ে লেখা হয়েছে, ‘রাঙ্গা কুর্ত্তি গায়, বেতের টোপ মাথায়, এসেছে রাঙ্গা গোড়া পালাব কোথায়।’ চোগা হচ্ছে বুক কাটা ঢিলেঢালা লম্বা জামা। মুসলমানদের মধ্যে পায়জামার চলও আরব থেকে আগত অধিবাসীদের হাতে শুরু হয়। হালিম শররের ‘পুরনো লখনোও’ গ্রন্থে আছে, ‘হজরত মহম্মদ সাহেবের সময়েই অন্য দেশ থেকে পায়জামা আরবে পৌঁছে যায় এবং পরবর্তীকালে বাগদাদি দরবারের ও প্রবাসী আরবদের জাতীয় পরিচ্ছদ হয়ে যায়। মুসলমান আসার আগে ভারতে ধুতি ছিল, পায়জামা ছিল না। দিল্লির শেষদিন পর্যন্ত এবং সারা ভারতে মুসলমানদের এই পায়জামাই ছিল। হিন্দুদের সঙ্গে মেলামেশার ফলে নিম্নবর্গের মসুলমানরা ধুতি পরত এবং প্রতিষ্ঠাবান হিন্দুরা ইচ্ছে করলে ঘরে ধুতি পরত। কিন্তু শিষ্টমণ্ডলীতে আসার সময় পায়জামা পরেই আসত।’ পায়জামা আসার পর উত্তর ভারতের মুসলমানদের মধ্যে লুঙ্গির ব্যবহার কমে যায় কিন্তু বাংলায় তা অব্যাহত ছিল। মলয় রায় বাঙালির বেশবাস: বিবর্তনের রূপরেখা  গ্রন্থে লিখেছেন, ‘বঙ্গদেশের ক্রমবর্ধমান মুসলিম জনগণ কেন লুঙ্গি বা তহমানকেই আদর্শ বেশ হিসেবে গ্রহণ করেছিল, তার কোনো ঐতিহাসিক বা সমাজতাত্ত্বিক কারণ আমার জানা নেই। তবে অনুমান করা যায়, আরব দেশ থেকে আমদানি করা মুসলিম তমদ্দুনের প্রতি আনুগত্য এর অন্যতম একটা কারণ হতে পারে। কালক্রমে ধুতি আর লুঙ্গি বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানের বেশ প্রতীকে পরিণত হয়।’

 

তথ্যসূত্র


  1. বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, ডক্টর এমএ রহিম, বাংলা একাডেমি।
  2. প্রাচীন বাংলা সামাজিক ইতিহাস: সেন যুগ, এসএম রফিকুল ইসলাম, বাংলা একাডেমি।
  3. সাজমহল: ঔপনিবেশিক বাংলায় মেয়েদের সাজগোজ, জয়িতা দাস, গাঙচিল।
  4. বাঙালির বেশবাস: বিবর্তনের রূপরেখা, মলয় রায়, মনফকিরা।
  5. মধ্যযুগের বাঙ্গালা, কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায়, দে’জ পাবলিশিং।
  6. বাঙালির ইতিহাস: আদি পর্ব, নীহাররঞ্জন রায়।
  7. বঙ্গবাসীর অঙ্গবাস। পূর্ণেন্দু পত্রী। প্রতিক্ষণ পাবলিকেশনস লিমিটেড। বইমেলা জানুয়ারি ১৯৯৪।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top
error: Content is protected !!