ইতিহাস

বাঙালির পোশাকের বিবর্তন

পোশাক দেখে কোন মানুষের বৈশিষ্টের অনেকটাই জানা যায়। বিভিন্ন সমাজ ও স্থানে আবার বিভিন্ন রকম পোশাক বা তার আদব কায়দা আছে। আবার পোশাকের উপর পরিবেশের একটা প্রভাব ছিল এবং আছেও। সেই সব মিলিয়ে পোশাকের একটা সংস্কৃতিও গড়ে উঠেছে। সময়ের সাথে সাথে সেই পোশাকের সংস্কৃতিও বদলেছে – এখানে আমরা বাঙালির পোশাকের বিবর্তন নিয়ে আলোচনা করব।

নৃতত্ত্ববিদরা মনে করেন, আদিম মানুষ নগ্ন অবস্থায় থাকত। এখন থেকে প্রায় ৭২০০০ বছর আগে মানুষ নগ্নতা ঢাকতে পোশাকের ব্যবহার শুরু করে। মানব সভ্যতার ইতিহাসে পোশাকের আবিষ্কার নিঃসন্দেহে এক অনন্য কৃতিত্ব। আমাদের পাঁচটি মৌলিক চাহিদার দ্বিতীয় চাহিদাই বস্ত্র বা পোশাক। প্রাচীন সভ্যতার পরিচয় আমরা পাই বিভিন্ন গুহাচিত্র, ছবি বা টেরাকোটায়।

সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় কারণে বিভিন্ন সময়ে বাঙালির পোশাকের বিবর্তন ঘটেছে – গত কয়ক শতাব্দীর সেই বিবর্তনের সুস্পষ্ট তথ্য থাকলেও প্রাচীনকালের প্রমাণ খুব বেশি কিছু নেই। বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে পুরনো নমুনা ‘চর্যাপদ’। কিন্তু চর্যাপদ থেকে সেকালের নারী ও পুরুষেরা কী ধরনের পোশাক-পরিচ্ছদ ব্যবহার করতেন সে সম্বন্ধে আমরা কোনো ধারণা পাই না। তবে প্রাচীন ও মধ্যযুগের যেসব ভাস্কর্য, পোড়ামাটির ফলক ও পাণ্ডুলিপির চিত্র পাওয়া যায় তা থেকে আমরা তাদের পোশাক সম্বন্ধে কিছুটা জানতে পারি। তাঁদের বেশিরভাগ পোশাকই ছিল লজ্জা নিবারণ ও শীত-গ্রীষ্মসহ বিভিন্ন আবহাওয়ার রুক্ষতা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দরকারী ন্যূনতম পোশাক। সেজন্যই সে সময়ে নারী-পুরুষের পোশাকে খুব একটা পার্থক্য ছিল না এবং এ যুগের মানুষের মতো রকমারি পোশাকও ছিল না।

ঐতিহাসিক শ্রী নীহাররঞ্জন রায় তার ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস: আদি পর্ব’ গ্রন্থে বলেছেন, প্রাচীনকালে পূর্ব-দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতে সেলাই করা কাপড় পরার চল ছিল না। অখণ্ড বস্ত্রটি পুরুষ পরলে হতো ধুতি, আর মেয়েরা পরলে শাড়ি। আর্য যুগে পুরো ভারতে গাছের বাকল থেকে তৈরি করা কাপড় ব্যবহারের প্রচলন ছিল। এই বঙ্গদেশে এক সময় কাপড় তৈরি হতো গাছের বাকল থেকে। গাছের বাকলকে কাপড়ের মতো পাতলা করে ব্যবহার করত। বাকল থেকে তৈরি কাপড়কে বলা হত ‘ক্ষৌম’।

বঙ্গদেশে পুরুষরা সে সময়ে দুকুল পরত নিম্নাঙ্গে, সেরা জাতের ক্ষৌমকে বলা হত ‘দুকুল’। বাংলার নারীরা সম্ভবত এর সঙ্গে আলাদা করে পাতলা দুকুল পরত কাঁচুলির (এটা অনেকটা এখনকার ব্রেসিয়ারের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে) মতো করে। সরাসরি বাকল থেকে কাপড় তৈরির পরিবর্তে, বঙ্গদেশে এক সময় সুতিবস্ত্রের প্রচলন শুরু হয়েছিল। এক্ষেত্রে শণ, পাট, অতসি ইত্যাদি গাছের বাকল ব্যবহার করে সুতা তৈরি করা হত।

চাণক্যের অর্থশাস্ত্র থেকে জানা যায় খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ থেকে ৪০০ অব্দের দিকে বঙ্গ এবং মগধে রেশমের চাষ হত। এর অর্থ হচ্ছে চীনদেশ থেকে রেশম তৈরির কৌশল ভারতে এসেছিল কিম্বা ভারতবাসী নিজেরাই রেশম তৈরির কৌশল উদ্ভাবন করেছিল। সে সময়ে রেশম ছিল অতি মূল্যবান সুতা। রাজাদের কাছে উৎকৃষ্ট পাটের কাপড় এবং রেশমের কাপড় ছিল রত্ন স্বরূপ। গাছের বাকল থেকে উৎপন্ন কাপড়ের পাশাপাশি ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে কার্পাস তুলা থেকে সুতা তৈরির কৌশল আবিষ্কৃত হয়েছিল। চাণক্যের মতে-‘বঙ্গ’, ‘মথুরা’, ‘কলিঙ্গ’, ‘কাশি’, ‘বৎসদেশ’, ‘মহিষদেশ’-এ কার্পাস সুতার কাপড় তৈরি হত। এর ভিতরে বঙ্গদেশের কার্পাস সুতার কাপড় ছিল উৎকৃষ্ট।

বঙ্গদেশে দুই চীনা পরিব্রাজকের বর্ণনাতেও এ অঞ্চলের মানুষের পোশাকের বিবরণ এসেছে। পঞ্চম শতকে ফা-হিউয়েন ও সপ্তম শতকে হিউয়েন-সাঙের ভ্রমণ বৃত্তান্তে ঐ সময়ের মানুষদের পরিধেয় পোশাকের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। এছাড়া অধুনা বাংলাদেশের দিনাজপুর ও ময়নামতিতে পাওয়া অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর পোড়ামাটির ফলকগুলোতেও ঐ  সময়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের পরিচয় মেলে। সপ্তম শতকে হিউয়েন-সাঙের বর্ণনাতে যে পোশাকগুলোর বিবরণ রয়েছে সেগুলি দরজি দিয়ে তৈরি নয় বা সেলাই করা নয়। সেসময় গ্রীষ্মকালের তাপ প্রতিরোধের জন্য অধিকাংশ মানুষ সাদা কাপড় পরত। নারী ও পুরুষ উভয়ই পরতেন একটিমাত্র বস্ত্র – শাড়ি অথবা ধুতি। অভিজাত পুরুষরা হাঁটুর নীচ অব্দি ধুতি পরলেও সাধারণ পুরুষেরা অত্যন্ত খাটো ধুতি পরতেন। নারীরা শাড়ি পরতেন পায়ের কব্জি পর্যন্ত ঝুলের। নারী ও পুরুষেরা উর্ধ্বাঙ্গে অলংকার ছাড়া আর কিছু পরতেন না। উৎসবে ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অভিজাত নারীরা কখনো কখনো ওড়না ব্যবহার করতেন। সেন আমলে ধনী মহিলারা বিভিন্ন প্রসাধনী ব্যবহার করতেন। নারীরা কানে কচি তালপাতার মাকড়ি এবং কোমরে সোনার তাগা পরতেন।

সেন যুগে পুরুষের প্রধান পোশাক ছিল ধুতি আর নারীদের শাড়ি। পুরুষরা কোমরে কটিবন্ধ ব্যবহার করতেন এবং ঊর্ধ্বাঙ্গে থাকত উত্তরীয়। নারীদের ঊর্ধ্বাঙ্গের জন্য তখনো সেভাবে কোনো পোশাকের ব্যবহার শুরু হয়নি। শাড়ি কোমর থেকে কাঁধে ঝুলত, যা হয়তো আজকের দিনের আঁচল। তবে অনেক নারী ঊর্ধ্বাঙ্গে উত্তরীয়, ওড়না, চোলি বা স্তনপট্ট ব্যবহার করতেন। নারী ও পুরুষ নির্বিশেষে উত্তরীয় ব্যবহারের বিষয়টি সে আমলের সাহিত্যে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। আর বিভিন্ন উপলক্ষে পোশাকের বৈচিত্র্য পরিলক্ষিত হত। যেমন— বিয়ের সময় নারীরা চোলি পরতেন। সেনা ও কুস্তিগীররা উরু পর্যন্ত দীর্ঘ আঁটসাঁট পায়জামা ব্যবহার করতেন। শ্রমিক তথা নিম্নবিত্ত শ্রেণীর পুরুষরা ল্যাঙ্গোটি পরতেন। শিশুদের পরিধেয় ছিল ধুতি বা পাজামা।

সেন যুগে নারীদের মধ্যে রঙিন ও নকশি শাড়ি ব্যবহারের প্রচলন ছিল। বাংলায় কার্পাস উৎপাদন এবং মিহি বস্ত্র তৈরির ইতিহাস বহু পুরনো। সেন যুগে চিনামশুক, কৌশ, পট্ট এবং দুকুল নামে সূক্ষ্ম কাপড়ের ব্যবহার ছিল। এসএম রফিকুল ইসলাম তার প্রাচীন বাংলার সামাজিক ইতিহাস: সেন যুগ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘চিনামশুকের মতো সূক্ষ্ম সুন্দর শাড়ি নিঃসন্দেহে রাজপরিবার ও ধনী পরিবারের নারীদের বসন ছিল। কিন্তু মোটা কাপড়েই সাধারণ পরিবারের মহিলাদের সন্তুষ্ট থাকিতে হইত এবং আর্থিক দৈন্যতা হেতু ইহাও পরিধান অনেক সময় তাহাদের নিকট অসাধ্য ছিল। সুভাষিতরত্নকোষে উদ্ধৃত একটি শ্লোকে আছে: প্রতিবেশিনীর নিকট দরিদ্র গৃহিণীর প্রতিদিনই তাহার ছিন্ন কাপড় সেলাইয়ের জন্য সুচ ধার করিতে হয়। আবার শীতের সময় ধনী ব্যক্তিরা তাহাদের চাহিদা মতোই বস্ত্র পরিধান করিত, কিন্তু রোদ পোহানো এবং অগ্নিই ছিল শীতবস্ত্রহীন দরিদ্র মানুষের শীত নিবারণের একমাত্র অবলম্বন’।

বাংলায় মুসলমানদের আগমন এ অঞ্চলের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক — সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছিল। পনেরো শতকে উপমহাদেশের পোশাক ও সংস্কৃতিতে মুসলিম সংস্কৃতির প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। বাঙালি পোশাকে মুসলিম প্রভাব সম্বন্ধে বিশদে এখানে জানা যাবে।

এরপর বাঙালি পোশাকরীতিতে বৈপ্লবিক একটি পরিবর্তন সূচিত হয় ঔপনিবেশিক আমলে, তবে সাধারণ বাঙালি যেমন মুসলিম পোশাক সঙ্গে সঙ্গে গ্রহণ করেনি, ঠিক তেমনই পাশ্চাত্যের পোশাকও সঙ্গে সঙ্গে গ্রহণ করেনি। বাঙালি পোশাকে ঔপনিবেশিক প্রভাব নিয়ে জানতে এখানে দেখুন।

হিন্দু-মুসলমান সবাই ধুতি পরতেন। কবি কাজী নজরুল ইসলাম থেকে শুরু করে কাজী মোতাহার হোসেন, প্রায় সকলেই ধুতি পরতেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। ধুতিকে ‘হিন্দুয়ানী পোশাক’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়াস দেখা যায় কিছু কট্টরপন্থীর মাঝে। তবে গ্রামের অনেক সাধারণ মানুষ বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে ধুতির বদলে লুঙ্গি পরতে শুরু করে। দেশভাগের পর পূর্ববাংলা থেকে খুব দ্রুত ধুতি লোপ পেতে শুরু করে। হিন্দু-মুসলমান সবার মধ্যেই ব্যাপকভাবে লুঙ্গি পরার রীতি শুরু হয়।

প্রাচীন বাংলায় সেলাই করা কাপড় পরাকে অপবিত্র মনে করা হতো। সেজন্যই নারী-পুরুষেরা শাড়ি ও ধুতি পরতেন। মুসলমানরা এদেশে আসার আগে সেলাই করা কাপড় পরা হতো না। মুসলমানরা ধীরে ধীরে এ রীতি চালু করে এবং সমাজে ‘দর্জি’ নামক এক নতুন পেশার উদ্ভব হয়। ধর্মবিশ্বাসে বৈচিত্র‍্য থাকলেও বাংলার হিন্দু-মুসলমানদের পোশাকে খুব একটা পার্থক্য লক্ষ্য করা যায় না, নারীদের পোশাকে প্রায় কোনো পার্থক্য লক্ষ্য করা যায় না।

বাংলায় হিন্দু-মুসলমান দুই ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেই কঠোর পর্দাপ্রথা মেনে চলা হত। সেজন্য বিভিন্ন তথ্যসূত্র থেকে পুরুষদের পোশাকের যতটা বর্ণনা পাওয়া যায়, নারীদের পোশাকের ততটা বর্ণনা পাওয়া যায় না। নারীদের ব্যাপারে রক্ষণশীলতা এতটাই প্রকট ছিল যে বিভিন্ন সময়ে পুরুষদের পোশাক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেলেও নারীরা সবসময় প্রায় একই পোশাক পরেছে- শাড়ি। একশো বছরেরও কম সময় আগে বাঙালি সাধারণ নারীরা শাড়ির সাথে ব্লাউজ বা পেটিকোট পরতো না। অভিজাত নারীদের ক্ষেত্রে অবশ্য সে কথা চলে না। ব্রিটিশ শাসনের মাঝামাঝি বা শেষের দিকে এসে অভিজাত নারীদের ফুল-হাতা গলাবন্ধ ব্লাউজ পরতে দেখা যায়। অনেক পুরুষ তাদের স্ত্রীদেরকে ব্রিটিশ সমাজে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য আলাদা করে পোশাক তৈরি করিয়ে নিতেন।

অভিজাত মুসলমানদের মধ্যে উর্দুভাষী নারীদের অনেকে সালোয়ার কামিজ পরলেও বাঙালি মুসলিম নারীরা তা পরতেন না। পরবর্তীতে মুসলিম নারীরা তো বটেই বাঙালি হিন্দু নারীরাও সালোয়ার কামিজ পরতে শুরু করেন। এ সময়ে এসে তো কিশোরী থেকে শুরু করে বৃদ্ধা পর্যন্ত সব বয়সের মাঝেই জনপ্রিয় পোশাক হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে সালোয়ার কামিজ।

উনিশ শতকের শেষে এবং বিশ শতকের শুরুতে নারী ও পুরুষ উভয়ের পোশাকশৈলীতে পরিবর্তন ঘটে। বিশেষ করে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরে পুরুষরা পশ্চিমা রীতির শার্ট, প্যান্ট, স্যুট ও টাই পরতে শিখেছে। মুসলমানদের পায়জামা এবং হিন্দুদের ধুতির সঙ্গে পশ্চিমা রীতির কলার ও আস্তিন বিশিষ্ট শার্ট পরা শুরু হয়। কুর্তা বা পাঞ্জাবি অর্থাৎ ঢিলে পোশাকের উপরে কটি এবং বাম কাঁধে চাদর বা শাল ছিল অনুষ্ঠানের পোশাক। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাশ্চাত্য পোশাক দ্রুত স্থান করে নিতে থাকে। দেশীয় ঐতিহ্যের পোশাকে যেমন পশ্চিমা ডিজাইনের ছোঁয়া লাগে, একইসঙ্গে পশ্চিমা পোশাক উঠে আসে পুরুষের শরীরে। এরপর ১৯৪৫ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত সময়কালে পোশাকের ডিজাইনের ক্ষেত্রে খুব বেশি ফারাক চোখে পড়ে না। অবশ্য ছেলেদের ব্যাগি প্যান্ট বা বেলবটম প্যান্ট এ সময়ের মাঝে এসে আবার চলেও গেছে।

১৮৭৪ সালে রাজনারায়ণ বসু তাঁর ‘সেকাল আর একাল’ গ্রন্থে মন্তব্য করেছিলেন, “প্রত্যেক জাতিরই একটি নির্দিষ্ট পরিচ্ছদ আছে। সেইরূপ পরিচ্ছদ সেই জাতির সকল ব্যক্তিই পরিধান করিয়া থাকেন। কিন্তু আমাদিগের বাঙ্গালী জাতির একটি নির্দিষ্ট পরিচ্ছদ নাই। কোন মজলিসে যাউন, একশত প্রকার পরিচ্ছদ দেখিবেন, পরিচ্ছদের কিছুমাত্র সমানতা নাই। ইহাতে একবার বোধ হয়, আমাদের কিছুমাত্র জাতিত্ব নাই।”

বাঙালির পোশাক নিয়ে একই রকম কথা কয়েক বছর পরে বিলেত থেকে ফিরে লিখলেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। ১৮৮৫ সালে তিনি লিখলেন, “বাঙ্গালির পোশাক অতি আদিম ও আদমিক। বাঙ্গালীর কোন পোশাক নাই বলিলেও চলে। যদি জাতি, গুটিকতক সভ্য শিক্ষিত যুবকে না হয়, যদি জাতির আচার ব্যবহার ভদ্রতা শিক্ষা কেবল জগতের পঞ্চমাংশের স্বীকৃত না হয়, যদি অশিক্ষিত লক্ষ লক্ষ কৃষক ও ব্যবসায়ী জাতির মূল হয়; তাহা হইলে দুঃখের সহিত বলিতে হইবে, বাঙ্গালীর কোনই পোশাক নাই।”

কথাগুলো শুনতে খারাপ লাগলেও খুব যে মিথ্যা নয়, সেটা অস্বীকারের উপায় নেই। বাঙালির পোশাকের এই দৈন্য প্রধানত পুরুষের পোশাকের ক্ষেত্রে। নারীর ক্ষেত্রে পোশাক হিসেবে ইতিহাসে শাড়ির ধারাবাহিকতা দেখা যায় এবং শাড়ি আজো জৌলুস নিয়েই দুনিয়াতে টিকে আছে। শাড়িই বোধহয় বাঙালির একমাত্র পোশাক যা ভারত এবং দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে নারীরা বেশ আগ্রহ নিয়ে পরে।১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা প্রবন্ধ ‘কোট বা চাপকান’-এ শাড়ির মাহাত্ম্য টের পাওয়া যায়, “আমাদের মধ্যে যাহারা বিলাতি পোশাক পরেন, স্ত্রীগণকে তাঁহারা শাড়ি পরাইয়া বাহির করিতে কুণ্ঠিত হন না। একাসনে গাড়ির দক্ষিণভাগে হ্যাট কোট, বামভাগে বোম্বাই শাড়ি।” তাই শাড়ির বিবর্তন একটা আলাদা নিবন্ধের দাবী রাখে যা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

বাংলার নারীদের মধ্যে অলঙ্কারের ব্যবহার ছিল। মধ্যযুগের সাহিত্যে এসব অলঙ্কারের বিবরণ পাওয়া যায়। অলঙ্কারসমূহের নামে ছিল বৈচিত্র্য। কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘অলঙ্কারের কথায় পরবর্তী নানা কাব্যে মস্তকে রত্ন মুকুট, চূড়ামণি, কপালে ঝুরি, মুক্তাবলী ও সিঁথি, পশ্চাদ্ভাগে পুরট ঝাঁপা, থোপনা, কর্ণে কর্ণপুর, কুণ্ডল, কর্ণফুলী, চক্রাবলী বা চাকা, নিম্ন কর্ণে বালি, নাসায় নাকচনা বেসর ও মুকুতাবলী, গলায় ধনাঢ্যের গজমুক্তার হইতে আরম্ভ করিয়া সরস্বতীহার, চন্দ্রহার, কলধৌত কণ্ঠমালা প্রভৃতি আছে। শিশুর গলায় সেকালেও বাঘনখ দৃষ্ট হয়। বাহু ও মণিবন্ধে টাড়বালা, বাউটি বা বাজুবন্ধ; কেয়ূর, অঙ্গদ বলয়, সোনার চুড়ি, খাড়ুু, রাঙ্গা রুলী; কটিতে কঙ্কিণী ও শিকলী, আঙ্গুলে আঙ্গুরী, পদে পাশুলী, নূপুর (ঘুংঘুর দেওয়া) এবং গোটামল প্রভৃতি নানা জাতীয় মল পাওয়া যায়। ক্রমশ কিরূপে একালের রুচির সঙ্গে সঙ্গে অলঙ্কারগুলো নব কলেবর ধারণ করিয়াছে, তাহা সাধারণ পাঠকের অজ্ঞাত নহে। একালের এক সুদীর্ঘ যাত্রার গানে শোনা গিয়েছে—

“রমণী যতনে পরে নানা অলঙ্কার; নানা প্রকার, /গুজরি মাকড়ি সোনার চুড়ি আর চিকহার, /মাছ মাদুলি, পাশা পাশুলী, কণ্ঠী পাঁইজোড় আর চন্দ্রহার।” … ইত্যাদি।

পাশা পাশুলী ও বহুদিন পলায়ন দিয়াছে; গুজরী চিকও তথৈবচ, এখন নূতন ফ্যাসানের হার, ফারফোর বালা অনন্তের অন্ত নেইই। সোনার কানবালা ইংরেজি নামের অন্য ভূষণের অনুকূলে স্বত্ব ত্যাগে বাধ্য হয়েছে।

সেন যুগে বাংলার নারীদের ব্যবহৃত অলঙ্কারের মধ্যে ছিল কুণ্ডল, হার, বলয়, মেখলা, নূপুর প্রভৃতি। আরো আছে মুক্তাহার, মরকতময়ী হার, মণিহার, চন্দ্রহার, কুণ্ডল, নাকবালা, কঙ্কণ। তৎকালে মেয়েদের পায়ে নূপুর ব্যবহারের চল ছিল।

প্রাচীন বাঙালি সমাজে জুতা পরার কোনো রীতি ছিল না। পনাই ও পাদুকার উল্লেখ থাকলেও মধ্যযুগের বাংলায় চামড়ার জুতা পরার কথা সে যুগের কোনো সাহিত্যে উল্লেখ করা হয়নি। সেকালে পাদুকা হিসেবে ব্যবহৃত হতো কাঠের খড়ম। ১৮২০ সালের দিকে আঁকা মহরমের মিছিল ও ঈদের ছবিতে সবাইকে ভালো পোশাক পরিহিত অবস্থায় দেখা গেলেও তাঁদের পায়ে কোনো জুতা বা পাদুকা ছিল না। এ থেকে ধারণা করা যায়, সে যুগে জুতা পরার কোনো প্রচলন ছিল না।

বাংলার নারী-পুরুষের পায়ে জুতা উঠেছে ঔপনিবেশিক আমলে। এর আগে বিশেষত নারীরা খালি পায়েই চলতেন। ব্রিটিশ সাহেবদের অনুকরণে সম্ভ্রান্ত বাঙালির মধ্যে জুতা পরার চল শুরু হলো। পুরুষরা শুরুর দিকে পা কেটে, খুঁড়িয়ে হলেও জুতা পরে সাহেবদের সামনে হাজির হতে লাগলেন। তবে জুতা পরার এই চল সমাজ সহজে গ্রহণ করেনি। মেয়েদের জুতা পরাকে খ্রিস্টান হয়ে যাওয়া বলেও অনেক সময় কথা উঠেছিল। প্রবাদ তৈরি হয়েছিল,

“মেয়েরা দেয় জুতো পায় /ভাত ব্যঞ্জন পুড়ে যায়।”

পুরুষদের মাঝে বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় পোশাক শার্ট-প্যান্ট, টিশার্ট ও গেঞ্জি। বিভিন্ন উৎসবে বা অনুষ্ঠানে পাঞ্জাবী-পায়াজামা থেকে শুরু করে কোট-স্যুট-ব্লেজার পরার রীতিও চালু আছে বাঙালি পুরুষদের মাঝে। বাঙালি নারীরা বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠানে শাড়ি পরলেও আগের চেয়ে শাড়ির প্রচলন কমে এসেছে অনেক। বর্তমানে নারীরা সবচেয়ে বেশি পরেন সালোয়ার কামিজ। এর বাইরে টপ, ফ্রক ইত্যাদি পোশাকও পরছেন। বিশ্বায়নের যুগে এসে নারী পুরুষ উভয়ের পোশাকেই এখন প্রবলভাবে প্রভাব ফেলছে পশ্চিমা পোশাক।

বাঙালি হয়ত বছরের পর বছর এসব পোশাক পরতে পরতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে, কিন্তু উষ্ণ বা শীতপ্রধান অঞ্চলের এসব পোশাক বঙ্গদেশের মতো নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে পরা কতটুকু আরামদায়ক? আদৌ কি আরামদায়ক? তার উপর শত শত বছরের ঐতিহ্যবাহী আরামদায়ক পোশাক ধুতি বা লুঙ্গি পরতে বাঙালির হীনম্মন্যতার শেষ নেই। কিন্তু এখনো গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এবং নিম্নশ্রেণীর শ্রমজীবী মানুষের প্রধান পোশাক লুঙ্গি। অর্থাৎ প্রাচীন বাংলা থেকে আজকের বাঙালির পোশাকে পার্থক্য থাকলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির পোশাক প্রায় একই রয়ে গেছে, বদলেছে খুব সামান্যই।

তথ্যসূত্র


  1. বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, ডক্টর এমএ রহিম, বাংলা একাডেমি।
  2. প্রাচীন বাংলা সামাজিক ইতিহাস: সেন যুগ, এসএম রফিকুল ইসলাম, বাংলা একাডেমি।
  3. সাজমহল: ঔপনিবেশিক বাংলায় মেয়েদের সাজগোজ, জয়িতা দাস, গাঙচিল।
  4. বাঙালির বেশবাস: বিবর্তনের রূপরেখা, মলয় রায়, মনফকিরা।
  5. মধ্যযুগের বাঙ্গালা, কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায়, দে’জ পাবলিশিং।
  6. বাঙালির ইতিহাস: আদি পর্ব, নীহাররঞ্জন রায়।
  7. বঙ্গবাসীর অঙ্গবাস। পূর্ণেন্দু পত্রী। প্রতিক্ষণ পাবলিকেশনস লিমিটেড। বইমেলা জানুয়ারি ১৯৯৪।

১ Comment

1 Comment

  1. Pingback: বাঙালি পোশাকে ঔপনিবেশিক প্রভাব | সববাংলায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top
error: Content is protected !!