ধর্ম

বড়দিনে কেক খাওয়ার রীতি এল কিভাবে

বড়দিন বলতেই আমরা যেটা বুঝি সান্টাক্লজ, ক্রিসমাস ট্রি এবং অতি অবশ্যই প্লাম কেক বা ফ্রুট কেক। সত্যি কথা বলতে কি আলোর বাজী ছাড়া দীপাবলি,ইফতার ছাড়া ঈদ যেমন অসম্পূর্ণ তেমনি ফ্রুট কেক ছাড়া ক্রিসমাস সম্পূর্ণ হয় না যেন। কিন্তু কবে থেকেই বা চালু হোক বড়দিনে কেক খাওয়ার এই রীতি?

ফ্রুট কেকের আবিষ্কারক হিসেবে পৃথিবীতে বিখ্যাত হয়ে আছে রোমানরা।প্রাচীন রোমানরা একধরণের মিষ্টি জাতীয় খাবার খেত যেটি তৈরি হত- যবের গুঁড়ো,শুকনো আঙ্গুর, কিসমিস,পাইন বীজ, ডুমুর বীজ, মধু ও ওয়াইন দিয়ে। এটিকে তারা বলত- 'সাতুরা'(Satura)। এই সাতুরা ছিল স্বাদে হালকা টক হালকা মিষ্টি। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে ইংরেজী শব্দ Satire কিন্তু এই সাতুরা থেকেই এসেছে।পরবর্তীকালে বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশগুলি যে যার নিজের মত করে সাতুরা বানাতে থাকল। রানী ভিক্টোরিয়ার রাজত্বকালে ইংল্যান্ডে প্লাম কেকের জনপ্রিয়তা বেশ বাড়ল।এই প্লাম কেক কিন্তু তখন কেবল ক্রিসমাসেই খাওয়া হতনা,বিভিন্ন ছুটির উৎসব সহ বিয়ে উদযাপনের সময়ও প্লাম কেক খাওয়ার চল ছিল।

প্লাম কেকের উৎপত্তি বিষয়ে একটি গল্প প্রচলিত আছে যেটির ঘটনাস্থল মধ্যযুগীয় ইংল্যান্ড। মধ্যযুগীয় ইংল্যান্ডে ক্রিসমাসের আগের কয়েক সপ্তাহ জুড়ে উপবাস, কৃচ্ছ সাধন এবং সবরকম ভোগ বিলাস থেকে আত্ম সংযমের একটা রীতি প্রচলিত ছিল। মনে করা হত এই কঠোর আত্ম সংযম ক্রিসমাস উদযাপনের ভোগ বিলাসিতাকে কাউন্টার ব্যালান্স করে।এই সময়ে রীতি অনুসারে ক্রিসমাসের দিন 'পরিজ'(Porridge) বানানো হত। পরিজ হল যবের মন্ড।এই পরিজ তৈরি হত যব, শুকনো ফল, মশলা, মধু এবং কখনো সখনো মাংস দিয়ে।পরিজ হল আধুনিক কেকের আদি বংশধর।একথা মনে করা হয় যে পরিজে প্রধান উপাদান যেটা থাকত সেটা হল কিসমিস।এই কিসমিসের পরিজ-ই আধুনিককালে প্লাম কেকে পরিবর্তিত হয়েছে বলে মনে করা হয় যদিও এই বিষয়ে প্রামাণ্য কোন নথি পাওয়া যায়নি।১৬শো শতকে যবের বদলে ময়দা, ডিম এবং মাখন দিয়ে পরিজ বানানো হত।এই ডিম ও মাখন মিশ্রিত ময়দার মন্ড(batter)টিকে ভালো করে মসলিন কাপড়ে মুড়ে গরম জলে সেদ্ধ করা হত বেশ কয়েকঘন্টা ধরে। এর ফলস্বরূপ যেটা তৈরি হত ভীষণ ঘন ভারী ফেনার মত একটি পদার্থ যেটিকে বলা হত 'ক্যানন বল'।যাদের বাড়িতে উনুনের ব্যবস্থা ছিল তারা সেদ্ধ'র বদলে সেঁকে খেত।এই কেক ক্রিসমাস সপ্তাহের শুরু থেকে সপ্তাহের শেষ দিন অর্থাৎ দ্বাদশ দিন অবধি একটু একটু করে খাওয়া হত।

প্লাম কেক ছাড়াও আরো এক ধরণের কেক খাওয়ার চল আছে ক্রিসমাসে। সেটি ফ্রুট কেক বা ফলের কেক।ফ্রুট কেক খাওয়ার এই রীতি শুরু হয়েছিল মধ্যযুগে যখন থেকে পশ্চিম ইউরোপীয় খাদ্যাভ্যাসের প্রভাব থেকে মানুষ ফল কে অনেকদিন টাটকা রাখার পদ্ধতি শিখল।শুরু হল এক দেশের ফল অন্যদেশে রপ্তানী এখানে একটা সমস্যা দেখা দিল এবার। ফল কে বেশি দিন সংরক্ষণ করতে তাকে গাঢ় চিনির দ্রবণে ডুবিয়ে রাখা হত।এই অত্যধিক চিনি মিশ্রিত ফল অনেকেই খেতে পছন্দ করত না। তখন সেই ফলগুলোকে থেঁতো করে কেক আকারে তৈরি করে রপ্তানী শুরু হল আর সেই সঙ্গে জন্ম নিক কেকের নতুন একটি পদ-ফ্রুট কেক।

উনিশ শতকের শেষের দিকে হল কি রানী ভিক্টোরিয়া ক্রিসমাসে সপ্তাহের শেষ দিন অর্থাৎ 'দ্বাদশ দিন'-টি উদযাপনের রীতিটি নিষিদ্ধ করে দিলেন।ফল স্বরূপ কেক প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলি পড়ল মহা সমস্যায়। তাদের তৈরি সমস্ত কেক যেগুলি তৈরি হয়েছিল দ্বাদশ দিনের উদযাপনের অঙ্গ হিসেবে সেগুলি যাতে পড়ে থেকে নষ্ট না হয়ে যায় সেই জন্য কেক প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলি একযোগে ঠিক করল তারা ক্রিসমাসের দিনই সেগুলি বিক্রি করবে। বানিজ্যিক ভাবে ফ্রুট কেক এভাবেই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে গেল ক্রিসমাসের।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!