এই লেখাটির বিষয়বস্তু হলো “কমোড” (commode)। ঠিকই পড়েছেন, যেটা ছাড়া আমাদের সভ্যতাই অসম্পূর্ণ থেকে যেত সেই কমোডকে নিয়ে কমেডি চলবে না। ঘরে বাইরে কমোডের ব্যবহার তো সবাই করেছেন। কখনো কি খেয়াল করেছেন ফ্লাশের পরেও কমোডের জলস্তর একই থাকছে ? আচ্ছা এমন কেন হয় বলুন তো? ভাবছেন এই সামান্য বিষয় নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার কী! কিন্তু বিজ্ঞানের কাছে আকাশের রং নীল কেন বা আয়নায় প্রতিবিম্ব পাশাপাশি ওলটাচ্ছে কেন ইত্যাদির মতই ‘ফ্লাশের পরেও কমোডের জলস্তর একই থাকে কীভাবে’ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আসলে বিজ্ঞানের কাছে সব প্রশ্নই সমান প্রাসঙ্গিক তাই আসুন খুঁজে দেখা যাক এর উত্তর।

আমরা দেখেছি কমোডের নিচের অংশে (bowl / বোল) একটি নির্দিষ্ট স্তর অবধি জল জমা থাকে। ফ্লাশ ভালভটি নিচে করলে বোল-এর ভিতর দ্রুত গতির জল প্রবাহ শুরু হয় যার ফলে মল বা কমোডের ময়লা পিছনের নালি পথে বাইরে বেরিয়ে যায়। কিন্ত এই দ্রুত গতির জলপ্রবাহ সত্বেও বোল-এর জলস্তর কিন্ত একটুও বাড়ে না। কোনো কারণে যদি আপনার টয়লেটের ফ্লাশ নাও কাজ করে , আগে থাকতে বালতিতে মজুত রাখা জল ঢেলেও পরিষ্কার করা যাবে। বালতিতে করে যতই জল ঢালা হোক কমোডের জলস্তর কখনোই বাড়বে না। ফলে উপচে পড়া বা জমা জলের দুর্গন্ধ জনিত অসুবিধায় আপনাকে পড়তে হবে না।

জল নীচের যেটুকু অংশে জমা থাকে সেটিকে বলে ওয়াটার সিল। এর পরের নালি পথটি S অথবা P আকৃতির হয় এবং মূল ড্রেনেজ পাইপের সাথে যুক্ত থাকে(চিত্র ১ দ্রষ্টব্য) । আমাদের প্রশ্নের উত্তর এখানেই আছে । এই বিশেষ ধরনের টিউবকে বলা হয় ট্র্যাপ ওয়ে। খেয়াল করে দেখবেন ট্র্যাপ ওয়ের যেই অংশটি bowl এর সঙ্গে যুক্ত আছে, সেটি শেষের দিকের ড্রেনেজ পাইপের সাথে যুক্ত অংশের কিছুটা ওপরে থাকে। মানে, S আকারের ট্র্যাপ ওয়ের ওপরের দিকটা যদি bowl এর সঙ্গে লাগানো থাকে, নিচের দিকটা লাগানো থাকবে বাইরের পাইপের সঙ্গে(চিত্র ২ দ্রষ্টব্য)। উচ্চতার এই সামান্য পার্থক্যের কারণে নোংরা জল ফ্লাশের সঙ্গে পেছনের নালি পথ দিয়ে বেরিয়ে যায় এবং সেই জায়গা নেয় টয়লেট ট্যাংক থেকে বেরোনো পরিষ্কার জল। এই কারণে জলের স্তরও একই থাকে।
কিন্ত কী এমন হয় উচ্চতার পার্থক্য হলে? আসুন ব্যাপারটা একটা পরীক্ষার সাহায্যে বুঝিয়ে বলা যাক। দুটি গ্লাস নেওয়া হল – একটি জলপূর্ণ, অন্যটি খালি। দুটি গ্লাসকেই সমান উচ্চতায় রেখে, একটি নল নিয়ে তার একদিক জল ভর্তি গ্লাসে এবং অন্যদিক খালি গ্লাসে রাখা হল। কিছু কি হল? কিছুই না, জল আছে জলের জায়গায়, নল আছে নলের জায়গায়। এবার ভরা গ্লাসটি উপরে তোলা হল। নলটির প্রান্ত দিয়ে ভরা গ্লাস থেকে সামান্য জল টেনে খালি গ্লাসে ফেলা হল। এবার কিন্ত জল জলের জায়গায় থাকবে না। বেশি উঁচুতে থাকা ভরা গ্লাস থেকে নিচুতে থাকা খালি গ্লাসে জল আসতে শুরু করবে যতক্ষণ না ভরা গ্লাসের জলস্তর নলের প্রান্তের নিচে চলে যায়। এই বিশেষ পদ্ধতিটিকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে সাইফন (siphon)। বিজ্ঞানীদের মতে এই ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে তিনটি শর্ত – (১) বায়ুর চাপ বা atmospheric pressure, (২) পৃথিবীর অভিকর্ষ বল বা gravity এবং (৩) জলের অনুগুলির সমযংযোগ বল বা cohesive force( তরলের একই অনুগুলির মধ্যে কাজ করা আকর্ষণ বল)।

নলের মধ্যে দিয়ে জল টানার সময় গ্লাসের জলের পৃষ্ঠতলের ওপর বায়ুর চাপ বেড়ে যায় ফলে নলের মধ্যে দিয়ে জল ওপরে উঠতে থাকে। চিত্র ৩ এ দেখা যাচ্ছে B বিন্দুতে চাপ অপেক্ষাকৃত বেশি এবং C বিন্দুতে চাপ কম হওয়ায় জলের প্রবাহ উচ্চচাপ থেকে নিম্ন চাপের দিকে হয়। অর্থাৎ B থেকে C এর দিকে। জলের অনুগুলির পারস্পরিক কোহেসিভ ফোর্সের জন্যে জলের প্রবাহ ক্রমাগত চলতে থাকে এবং খালি গ্লাসটি অপেক্ষাকৃত নিচে থাকায় বা উচ্চতা কম হওয়ার কারণে মাধ্যাকর্ষণ বা গ্রাভিটির প্রভাবে জল নিচে পড়ে। খুবই সাধারণ কিন্ত কার্যকরী পদ্ধতি।
কমোডের ট্র্যাপ ওয়েতেও ব্যাপারটা একই রকম । ফ্লাশের সময় জলের পৃষ্ঠতলের চাপ বেড়ে যায় যার ফলে পেছনের নালি পথ বা S আকৃতির ট্র্যাপ ওয়ে জল পূর্ণ হয়। এখানে S এর অপেক্ষাকৃত বেশি উঁচু দিক অর্থাৎ বোল এর সঙ্গে যুক্ত দিকে উচ্চচাপ তৈরি হয় এবং নিচু দিক অর্থাৎ ড্রেনেজ পাইপের দিকটিতে তৈরি হয় নিম্ন চাপ। ফলে জল উচ্চচাপ থেকে নিম্নচাপের দিকে প্রবাহিত হয় এবং নোংরা জল ট্র্যাপ ওয়ে দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যায়। আগের নোংরা জলের জায়গা নেয় ফ্লাশের সময় বেরোনো পরিষ্কার জল। এখন প্রশ্ন হতে পারে এই জলটুকুও কেন ট্র্যাপ দিয়ে বেরিয়ে যায় না আগের মতো? কেন আবার ফ্লাশ করার দরকার পড়ে? সেটা জানানোর আগে একটু এর উপকারিতা জেনে নেওয়া যাক। ওইটুকু জল ওখানে থেকে যাওয়ার জন্য সেটা একটি সিলের মতো কাজ করে এবং ড্রেনেজ পাইপ থেকে দুর্গন্ধ ভেতরে আসতে দেয় না। এই জন্যে কমোডের ওই অংশটিকে ওয়াটার সিল বলে। এবার প্রশ্নের উত্তরে আসা যাক। নোংরা জল নিচের দিকে বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে ট্রাপের শেষের অংশ বায়ুপূর্ণ হয়ে যায় যা জলের প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে ট্রাপের সামনের অংশে জল রয়ে যায় এবং ওয়াটার সিল জলপূর্ণ থাকে।
লেখাটি পড়ে আশা করি সহজেই বোঝা গেল কমোডের জলস্তর একই থাকে কীভাবে, পাশাপাশি ট্র্যাপ ওয়েতে এই জল থাকার প্রয়োজনীয়তার কথাও জানা গেল।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান