বিজ্ঞান

দিনের বেলা আকাশ নীল কেন

দিনের বেলা, বিশেষতঃ রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনে আকাশের রঙ হয় নীল। কখনো কী ভেবে দেখেছেন, দিনের বেলা আকাশ নীল কেন? না জেনে থাকলে জেনে নিন আকাশ নীল  হওয়ার বৈজ্ঞানিক ব্যখ্যা।

খুব সহজ ভাষায় বললে সূর্য থেকে পৃথিবীতে আসার সময় বায়ুমন্ডলের গ্যাস ও ভাসমান ধুলিকণায় আলো বিচ্ছুরিত হয়ে যায় এবং নীল রঙের আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য কম বলে রেইলি বিচ্ছুরণ (Rayleigh scattering) এর সূত্র অনুযায়ী তা সব চেয়ে বেশি বিচ্ছুরিত হয়। ফলে দিনের বেলায় আকাশকে নীল দেখায়।

আকাশ নীল কেন

চিত্র – ১

ব্যাপারটা একটু বিশদে বুঝিয়ে বলা যাক। আমরা সবাই জানি, সূর্যের সাদা আলো আসলে সাতটি আলাদা রঙের আলোর সমন্বয়, সংক্ষেপে আমরা এই সাতটি রঙকে বেনীআসহকলা (VIBGYOR) বলি। প্রতিটি রঙের আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের মান আলাদা – বেগুনী রঙের আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে কম আর লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে বেশি ।

১৮৫৯ খ্রিষ্টাব্দে জন টিন্ড্যাল একটি পরীক্ষা করেন। একটি পাত্রে জলের মধ্যে দুধ এবং সাবান মিশিয়ে দেন। এবার পাত্রের একপাশে আলো ফেললে দেখা যায় অপর পাশ থেকে আলোর নীলাভ আলোক রশ্মিগুলি বেশি বিচ্ছুরিত হচ্ছে যা টিন্ড্যাল এফেক্ট (Tyndall Effect) নামে পরিচিত।

পরবর্তী কালে বিজ্ঞানী রেইলি আলোর বিচ্ছুরণের একটি তত্ত্ব আবিস্কার করেন। সেই অনুযায়ী যে আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য কম তা বেশি বিচ্ছুরিত হবে। তাঁর হিসেব অনুযায়ী – একটি আলোক তরঙ্গের বিচ্ছুরণের পরিমাণ হয় সেই আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের চতুর্ঘাত এর ব্যাস্তনুপাতিক।  নীল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য লাল আলোর থেকে অনেক কম (চিত্র – ১)। অর্থাৎ, অঙ্কের ভাষায় –

I α 1/λ4 (I = বিচ্ছুরণের পরিমাণ, λ = তরঙ্গদৈর্ঘ্য )

আগে মনে করা হত বাস্প, ধূলিকণা সব কিছুই আকাশের নীল রঙ এর জন্যে দায়ী। কিন্তু পরবর্তীকালে বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেন যে, যদি বাস্পকণাও বিচ্ছুরণের কারন হত, তাহলে স্থানভেদে আদ্রতা, কুয়াশা ইত্যাদির ভিন্নতার কারণে এক এক স্থানে আকাশের রঙ এক এক রকম দেখাতো! তাই তাঁরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, আকাশের বিভিন্ন স্তরে অবস্থিত অক্সিজেন আর নাইট্রোজেনের অনুগুলোই এই বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে আকাশকে নীল দেখানোর পক্ষে যথেষ্ট। ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে আইনস্টাইনের অনু থেকে আলোর বিচ্ছুরণের তত্ত্ব প্রকাশ করলে এই ধারণা আরও জোরদার হয়।

তবে একটা প্রশ্ন উঠতে পারে, বেগুনী রঙের আলোকরশ্মির তরঙ্গদৈর্ঘ্য তো নীল আলোর থেকেও কম তাহলে আকাশ কেন বেগুনী দেখায় না?

প্রথমত, বায়ুমন্ডলে বিচ্ছুরিত আলোকরশ্মির বিচ্ছুরণ সব তরঙ্গদৈর্ঘ্যের জন্য সমান নয়। একই সাথে বায়ুমন্ডল পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে এত উঁচুতে অবস্থিত যে সেখান থেকে বিচ্ছুরিত আলো পৌঁছাতে পৌঁছাতে বায়ুমণ্ডলে ঐ বেগুনী আলোর অনেকটা শোষিত হয়ে যায়।

দ্বিতীয়ত, মানুষের রেটিনায় তিন ধরনের কোণ কোষ (cone cells) থাকে। অন্যান্য রঙের চেয়ে এরা লাল, নীল এবং সবুজ আলোতে সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীলতা দেখায়। এই কোণগুলোর বিভিন্ন অনুপাতের সংবেদনশীলতার সমন্বয়েই আমরা বিভিন্ন রঙ দেখে থাকি। আমাদের চোখের কোষগুলি ‘অতিবেগুনী’ আলোক-সংবেদনশীল না। এ জন্য মানুষের কাছে আকাশকে গাঢ় বেগুনী বলে মনে হয় না।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য,  ভূপৃষ্ঠের নীচের দিকে নীল আলো আরও বিচ্ছুরিত হতে থাকার ফলে দিগন্তের কাছাকাছি আকাশের রঙ ক্রমশই ফ্যাকাশে হতে থাকে (চিত্র – ১)। আর সূর্যোদয় বা সূর্যাস্তের সময় আকাশ লাল হয় কেন জানতে হলে এখানে ক্লিক করুন।

3 Comments

3 Comments

  1. Pingback: ২৮ ফেব্রুয়ারি ।। জাতীয় বিজ্ঞান দিবস (ভারত) | সববাংলায়

  2. Pingback: বিপদ সংকেতে লাল রঙ ব্যবহার করা হয় কেন | সববাংলায়

  3. Pingback: সূর্যোদয় বা সূর্যাস্তের সময় আকাশ লাল হয় কেন | সববাংলায়

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে শিক্ষিত ব্যক্তি


শ্রীকান্ত জিচকর
শ্রীকান্ত জিচকর

এনার সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন