ইতিহাস

জানকী অম্মল

জানকী অম্মল (Janki Ammal) একজন বিখ্যাত ভারতীয় উদ্ভিদ বিজ্ঞানী ছিলেন। তিনি সাইটোজেনেটিক্স (cytogenetics) এবং ফাইটোজিওগ্রাফি (phytogeography) নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিলেন। তিনি আখ এবং বেগুন নিয়ে তাঁর গবেষণার জন্য মূলত বিখ্যাত হয়ে আছেন। তিনি ও প্রখ্যাত উদ্ভিদ বিজ্ঞানী সি ডি ডার্লিংটন একসাথে মিলে একটি বইও লিখেছিলেন।

১৮৯৭ সালে ৪ নভেম্বর তেল্লিচেরির থিয়া পরিবারে জানকী অম্মলের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম ছিল কাক্কাট কৃষ্ণান এবং তাঁর মায়ের নাম দেবী কুরুভই। তাঁর বাবা একজন অধস্তন বিচারক (sub judge) ছিলেন। তাঁর ঠাকুরদার নাম ছিল জন চাইল্ড হ্যান্নিংটন, তিনি ত্রিবাংকুরের প্রশাসক ছিলেন।

জানকীর প্রাথমিক পড়াশুনা শুরু হয় থালাসেরির সেক্রেড হার্ট কনভেন্ট স্কুলে। এরপর তিনি মাদ্রাজের কুইন মেরিজ কলেজে  ভর্তি হন। তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে উদ্ভিদবিদ্যায় অনার্স ডিগ্রী লাভ করে ১৯২৪ সালে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভিদবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করতে চলে যান। সেখান থেকে ১৯২৬ সালে তিনি উদ্ভিদবিদ্যায় বৃত্তি সহকারে মাস্টারস ডিগ্রী  লাভ করেন। এরপর ভারতে ফিরে মাদ্রাজের উইমেন্স খ্রিষ্টান কলেজে শিক্ষিকা হিসেবে যোগ দেন। সেখানেই কিছু বছর শিক্ষকতার কাজ করার পর তিনি আবার মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে ওরিয়েন্টাল বারবার ফেলো (Oriental Barbour Fellow) হিসেবে ফিরে যান এবং ১৯৩১ সালে সেখান থেকে পিএইচডি করেন। তাঁর গবেষণার পদ্ধতির নাম ছিল ‘ক্রোমোজোম স্টাডিজ ইন নিক্যান্ড্রা ফিসালইডস’ (Chromosome Studies in Nicandra Physaloides)। পরে ১৯৫৬ সালে সেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তিনি সম্মানীয় এল এল ডি (LLD) উপাধি লাভ করেন।

ভারতবর্ষে ফিরে আসেন এবং ত্রিবান্দ্রামে মহারাজাস কলেজ অফ সায়েন্সে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে যোগ দেন। সেখানে তিনি ১৯৩২ সাল থেকে ১৯৩৪ সাল অব্দি কাজ করেন। এরপর তিনি লন্ডনে যান এবং সেখানে জন ইন্স ইনস্টিটিউটে (John Innes Institute) কাজ শুরু করেন। সেখানেই তিনি সি ডি ডার্লিংটনের সাথে কাজ করেন। পরে ১৯৪৫ সালে তাঁর সাথে যুগ্মভাবে তিনি  ‘ক্রোমোজোম অ্যাটলাস অফ কালটিভেটেড প্লান্টস’ (Chromosome Atlas of Cultivated Plants) বইটি লেখেন। জানকী এরপর আবার ভারতবর্ষে চলে আসেন এবং কোয়েম্বাটুর সুগারকেন ব্রীডিং ইনস্টিটিউটে  কাজ শুরু করেন।  এখানে তাঁর কাজের সঙ্গী ছিলে সি এ বারবার।

১৯৩৯ সালে তিনি এডিনবার্গে ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেস অফ জেনেটিক্সের  সপ্তম অধিবেশনে যোগদান করেন। কিন্তু সেই সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার কারণে তাঁকে বাধ্য হয়ে সেখানেই থেকে যেতে হয়। এর পরের ছয় বছর তিনি সি ডি ডার্লিংটনের সরকারি সাইটোলজিস্ট (cytologist) হিসাবে জন ইন্স ইনস্টিটিউটে কাজ করেন। ১৯৪৫ সাল থেকে ১৯৫১ সাল অব্দি তিনি উইসলির রয়্যাল হর্টিকালচার সোসাইটিতে সাইটোলজিস্ট হিসেবে কাজ করেন। এই সময়ের মধ্যে তিনি ম্যাগনোলিয়াস (magnolias) সম্পর্কে বিস্তর গবেষণা এবং পরীক্ষা নিরীক্ষা করেন। এরপর ভারত সরকারের আমন্ত্রণে তিনি এলাহাবাদে প্রতিষ্ঠিত সেন্ট্রাল বোটানিকাল ল্যাবরেটরির) অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬২ সালে তিনি জম্মু চলে যান এবং সেখানে রিজিওনাল রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে  বিশেষ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি কিছুদিন ত্রম্বেতে ভাবা অ্যাটমিক রিসার্চ সেন্টারের কাজ করেছিলেন। তারপর ১৯৭০ সালে সালে তিনি মাদ্রাজে থিতু হন। সেখানে তিনি মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডি ইন বটানিতে বিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করেন।

আগে ভারতকে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া থেকে মিষ্টি আখ আমদানি করতে হত। তাই ভারতের আখ উৎপাদন আরো বাড়ানোর জন্য কোয়েম্বাটুরে সুগারকেন ব্রিডিং স্টেশন তৈরি হয়। তিনি সেখানেই বেশ কিছুদিন কাজ করেন। তিনি অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করে এমন ধরনের আখ চাষের ব্যবস্থা করেন যা ভারতীয় আবহাওয়ায় খুব ফলপ্রসূ হবে। এছাড়াও সারা ভারত জুড়ে আখ চাষের সুবিধার্থে তিনি বেশ কিছু গবেষণামূলক কাজ করেন। সেই প্রতিষ্ঠানে তাঁর অন্যান্য সহকর্মীদের মধ্যে তিনি একমাত্র নারী ছিলেন। তাই তাঁকে সুষ্ঠুভাবে কাজ করে যাওয়ার জন্য বেশ বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। তাঁকে অনেক লিঙ্গ বৈষম্য এবং জাতিগত বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছিল। ইংল্যান্ডে থাকাকালীন তিনি বাগানে হওয়া বিভিন্ন গাছ নিয়ে বিস্তর পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছিলেন। তাঁর সেই সব গবেষণা গাছের ক্রোমোজোমের সংখ্যা এবং তাদের বিবর্তনের বিষয়ে একটি নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। তিনি এরপর ম্যাগনোলিয়া গাছ নিয়ে বেশ কিছু গবেষণামূলক কাজ করেন। ঔষধি গাছ ছাড়াও তিনি সোলানাম (Solanum), ধুতুরা (Datura), সিমবোপোগন (Cymbopogon), ডায়োস্কোরিয়া (Dioscorea) ইত্যাদি গাছ নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিলেন।

তিনি প্রথম ভারতীয় নারী ছিলেন যিনি উদ্ভিদবিদ্যা নিয়ে আমেরিকা থেকে পিএইচডি করেছিলেন। ১৯৩৫ সালে তাঁকে ইন্ডিয়ান অ্যাক্যাডেমি অফ সায়েন্সের  সদস্য হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।  ১৯৫৭ সালে তাঁকে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যাকাডেমির সদস্য হিসাবে মনোনীত করা হয়। ১৯৭৭ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মান প্রদান করে। ২০০০ সালে ভারত সরকারের পরিবেশ ও বন্য বনদপ্তর তাঁকে জাতীয় পুরস্কারে পুরস্কৃত করে। ১৯৯৯ সাল থেকে তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে ই কে জানকী অম্মল জাতীয় পুরস্কার পশুদের ট্যাক্সোনমির (animal taxonomy) জন্য এবং ইকে জানকী অম্মল জাতীয় পুরস্কার গাছের ট্যাক্সোনমির (plant taxonomy) জন্য দেওয়া হয়। জন ইন্স ইনস্টিটিউট তাঁর নামে পিএইচডি প্রদান করে। উইসলির রয়্যাল হটিকালচার সোসাইটিতে তিনি নতুন প্রজাতির যে ম্যাগনোলিয়া  গাছটি সৃষ্টি  করেছিলেন  তার নাম তাঁকে  শ্রদ্ধা জানিয়ে ম্যাগনোলিয়া কোবাস জানকী  অম্মল (Magnolia Kobus Janki Ammal) রাখা হয়েছে। 

কাজ থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি তাঁর সব গবেষণামূলক কাজ প্রকাশ্যে আনতে থাকেন যার মধ্যে অন্যতম ছিল ঔষধি গাছ সম্পর্কে তাঁর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা এবং এথনোবটানি (ethnobotany)  বিষয়ে কিছু কাজ। অবসর নেওয়ার পর তিনি মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যেখানে থাকতেন সেখানে তাঁর কোয়ার্টারে বিভিন্ন ঔষধি গাছের বাগান করেছিলেন।

জানকী  অম্মলের ১৯৮৪ সালে ৭ ফেব্রুয়ারি ৮৬ বছর বয়সে মৃত্যু হয়।

তাঁর অবদান ভারতীয় উদ্ভিদবিদ্যা জগতে অনস্বীকার্য তাঁকে আগামী প্রজন্ম একজন বড় মাপের বিজ্ঞানী হিসেবে মনে রাখবে।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন