ইতিহাস

যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর

যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর(Jatindramohan Tagore) ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের পাথুরিয়াঘাটার বিখ্যাত জমিদার বংশের এক থিয়েটার অনুরাগী, বিদ্যানুরাগী ব্যক্তিত্ব৷ তিনি দাতা হিসেবেও যথেষ্ট বিখ্যাত হয়ে আছেন ইতিহাসে।

১৮৩১ সালের ১৬ মে পশ্চিমবঙ্গের পাথুরিয়াঘাটায় যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের জন্ম হয়৷ তাঁর বাবার নাম হরকুমার ঠাকুর। যতীন্দ্রমোহন হিন্দু কলেজ থেকে তাঁর প্রথাগত পড়াশোনা শেষ করেন৷ তারপর বাড়িতে থেকেই তিনি সংস্কৃত এবং ইংরাজি শিক্ষা নেন৷ 

যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর ১৮৭০ সালে বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। তারপর ১৮৭২ সালে তিনি পুনরায় নির্বাচিত হন৷ ১৮৭১ সালে তিনি ‘ রাজা বাহাদুর ‘ উপাধি পেয়েছিলেন৷ ১৮৭৭ সালে ভারতের সম্রাজ্ঞী ভিক্টোরিয়ার কাছ থেকে মহারাজা উপাধি লাভ করেন। যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর বেশ কিছু বছর ব্রিটিশ ইন্ডিয়া অ্যাসোসিয়েশনের ( British Indian Association) সচিব ছিলেন। ১৮৭৯ এবং ১৮৮১ সালে তিনি এখানকার সভাপতি নির্বাচিত হন ৷ ১৮৯০ সালে কিং কমান্ডার অফ দ্য স্টার অফ ইন্ডিয়া (Knight Commander of the Star of India)অর্থাৎ ‘মহারাজা বাহাদুর’ উপাধি লাভ করেন এবং পরের বছর থেকে এই উপাধি তাঁদের পরিবারের বংশগত হয়৷ 

যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর বাংলা, ইংরেজি ও সংস্কৃতে তিনি বহু প্রবন্ধ লিখেছেন। এছাড়া সংগীত ও নাটক রচনায় তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঙ্গীতে তাঁর বিপুল আগ্রহ ছিল। তাঁর রচিত নাটক ‘বিদ্যাসুন্দর’, ‘চক্ষুদান’, ‘বুঝলে কি না’; স্তব ও সংগীতের সংকলন ‘গীতিমালা’ এবং কাব্য ও গল্প সংকলন ‘ফ্লাইটস অব ফ্যান্সি’ ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকীর্তি। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় ক্ষেত্রমোহন গোস্বামী  ভারতে প্রথম অর্কেস্ট্রা নিয়ে গবেষণা করেছিলেন৷ যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এবং ক্ষেত্রমোহন গোস্বামীর সহযোগিতায় ১৮৫৮ সালে নাট্যালয়ে প্রথম অর্কেস্ট্রা বাজানোর পদ্ধতির সৃষ্টি হয়। ১৮৫৭ সালের ৩ জুলাই যতীন্দ্রমোহনের বেলগাছিয়ার বাড়িতে ‘ রত্নাবলি ‘ নামে একটি নাটক মঞ্চস্থ করা হয়৷ এই নাটকের জন্য তিনি ক্ষেত্রমোহন গোস্বামী এবং যদুনাথ পালকে ইউরোপীয় প্রেক্ষাগৃহের অনুকরণ একটি অর্কেস্ট্রা গঠনের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। ভারতীয় সংগীতের সঙ্গে পাশ্চাত্য সঙ্গীতের মিশেল ঘটানো হয়েছিল এই নাটকে। ভারতের প্রথম ‘সুরবাহার’ কনসার্টটি তাঁর দরবারে প্রদর্শিত হয়েছিল। যতীন্দ্রমোহনই অবিভক্ত বাংলায় প্রথম ‘বঙ্গনাট্যালয়’ স্থাপন করেন পাথুরিয়াঘাটায়।যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর  ছিলেন মধুসূদন দত্তের ঘনিষ্ট বন্ধু। তাঁকে  ‘তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য’ লিখতে উৎসাহিত করা থেকে শুরু করে সেটি প্রকাশের ব্যয়ভার পর্যন্ত  যতীন্দ্রমোহন বহন করেছিলেন৷ 

যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের অন্যতম কীর্তি হল ‘টেগোর ক্যাসল’ নির্মান৷ পাথুরিয়াঘাটা ছাড়িয়ে জোড়াবাগান অঞ্চলে অবস্থিত বিখ্যাত ‘টেগোর ক্যাসল ’। ২৬, প্রসন্নকুমার ঠাকুর স্ট্রিটে প্রথমে যে বাড়িটি ছিল সেটি কালী কুমার ঠাকুর তৈরি করেন৷ সহজ সরল সাধারণ পরিকাঠামোয় তৈরী এই বাড়িটি তিনি তাঁর ভাই প্রসন্ন কুমারকে দিয়ে দেন। উত্তরাধিকার সূত্রে এই বাড়ি যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের কাছে আসে। ১৮৯৫ সালে বাড়িটিকে তিনি নতুন পরিকাঠামোতে তৈরী করা শুরু করেন৷ এই বাড়ির পরিকাঠামোর পরিকল্পনা তৈরী করানো হয়েছিল ইংল্যান্ডের ম্যাকিন্টোশ বার্ন এন্ড কোম্পানির (Macintosh Burn and Company) দ্বারা । ইংল্যান্ডের উইন্ডসোর ক্যাসেলের (Windsor Castle) অনুকরণে এখানেও ১০০ ফুট উঁচু টাওয়ার তৈরী হয়েছিল। একটি পতাকা এবং ঘড়ি ইংল্যান্ড থেকে আনানো হয়েছিল এই বাড়ির উদ্দেশ্যে৷ এই ক্যাসেলের তিন তলায় একটি প্রেক্ষাগৃহ তৈরী করা হয়েছিল৷ 

যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের বিশেষ অবদান ছিল মায়ো হাসপাতাল (Mayo Hospital) প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ৷ তাই এই হাসপাতালের একটা ওয়ার্ডের নামকরণ তাঁর নামে করা হয়৷ এছাড়া তাঁর বাবা এবং কাকা প্রসন্ন কুমার ঠাকুরের নামে তিনি সাহিত্য, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের শিক্ষার্থীদের জন্য বেশ কয়েকটি বৃত্তি শুরু করেন৷ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এর সংস্কৃত বিভাগ থেকে বাৎসরিক পরীক্ষায় পাশ করা সেরা শিক্ষার্থীর জন্য সোনার আর্মলেটের ব্যবস্থা করেন এবং সোনার মেডেলেরও ব্যবস্থা করেন তিনি টেগোর ল’ লেকচারস্ (Tagore Law Lectures) এবং ভৌতবিজ্ঞান নিয়ে পাশ করা সেরা পড়ুয়ার জন্য৷ 
যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সম্প্রতি সেন্ট্রাল এভিনিউ এর উত্তর দিকের রাস্তাটার নাম যতীন্দ্রমোহন অ্যাভিনিউ করা হয়েছে৷ 

১৯০৮ সালের ১০ জানুয়ারি যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের মৃত্যু হয় । 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।