সববাংলায়

জ্যোতির্লিঙ্গ বৈদ্যনাথ

জ্যোতির্লিঙ্গ বৈদ্যনাথ মন্দিরটি (Baidyanath) ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যের সাঁওতাল পরগনার অন্তর্গত দেওঘরে অবস্থিত। এই মন্দিরেই অবস্থান করছে বৈদ্যনাথ সতীপীঠ। একই সঙ্গে সতীপীঠ এবং জ্যোতির্লিঙ্গ হওয়ার ফলে হিন্দুদের কাছে এই মন্দিরের গুরুত্ব অপরিসীম। তবে জ্যোতির্লিঙ্গ বৈদ্যনাথের অবস্থান নিয়ে একাধিক মতভেদ রয়েছে। বৈদ্যনাথ জ্যোতির্লিঙ্গের অবস্থান প্রসঙ্গে তিনটি মন্দিরের নাম উঠে আসে। একটি হল মহারাষ্ট্রের পারলিতে অবস্থিত শ্রী বৈজনাথ মন্দির, দেওঘরের এই বৈদ্যনাথ মন্দির এবং হিমাচল প্রদেশের বৈজনাথ মন্দির৷ অবশ্য ভারত সরকার কোনোটিকেই আসল বৈদ্যনাথ জ্যোতির্লিঙ্গ বলে নিশ্চিত করেনি। কিন্তু অধিকাংশ মানুষের বিশ্বাস অনুযায়ী দেওঘরেই বৈদ্যনাথ জ্যোতির্লিঙ্গের অবস্থান। তাই এখানেও জ্যোতির্লিঙ্গ বৈদ্যনাথ বলতে দেওঘরের মন্দিরের ব্যাপারেই বিস্তারিত উল্লেখ করা হল।

শিবপুরাণ অনুযায়ী একদা ব্রহ্মা এবং বিষ্ণুর মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ তা নিয়ে দুজনের তুমুল বিবাদ উপস্থিত হয়। সেই বিবাদ সন্তোষজনক পরিণতিতে না পৌঁছে চলতেই থাকলে মহাদেব তখন একটি আলোকরশ্মির স্তম্ভ রূপে তাঁদের দুজনের মাঝখানে প্রকট হন। ব্রহ্মা এবং বিষ্ণু কেউই সেই আলোকস্তম্ভের আদি ও অন্ত খুঁজে পাননি। শেষমেশ তাঁরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, এই দিব্য জ্যোতিই শ্রেষ্ঠতম। এভাবেই জ্যোতির্লিঙ্গের ধারণাটির উদ্ভব হয়।

বারোটি জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে অন্যতম হল বৈদ্যনাথ জ্যোতির্লিঙ্গ। এই জ্যোতির্লিঙ্গকে ঘিরে বহু চমকপ্রদ কিংবদন্তী প্রচলিত রয়েছে। প্রথম কিংবদন্তী অনুসারে ত্রেতাযুগে লঙ্কার রাজা রাবণ মহাদেবকে সন্তুষ্ট করবার জন্য হিমালয় অঞ্চলে অবিরাম প্রার্থনা করছিলেন। এমনকি এক এক করে নিজের নয়টি মস্তক তিনি শিবকে উৎসর্গ করেছিলেন। যখন দশম মস্তকটি রাবণ উৎসর্গ করতে যাচ্ছিলেন তখন রাবণের নৈবেদ্যে সন্তুষ্ট হয়ে শিব আবির্ভূত হন এবং একজন বৈদ্য অর্থাৎ ডাক্তারের মতোই রাবণের নয়টি কাটা মাথা পুনরায় তাঁকে ফিরিয়ে দিয়ে রাবণকে সুস্থ করে তোলেন। সেই কারণেই এই জ্যোতির্লিঙ্গের নাম বৈদ্যনাথ। তারপর শিব রাবণকে বর প্রার্থনা করতে বললে রাবণ মহাদেবকে লঙ্কায় নিয়ে যাওয়ার এবং সেখানে বসবাস করবার আবেদন জানিয়েছিলেন। শিব তখন নিজের ‘আত্মলিঙ্গম’ রাবণকে লঙ্কায় নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেন কিন্তু সেইসঙ্গে একটি শর্তও দিয়েছিলেন। শিব বলেছিলেন লিঙ্গ বহন করে নিয়ে যাওয়ার সময় তা পথে কোথাও নামিয়ে রাখলে সেখান থেকে আর সেটিকে স্থানান্তরিত করা যাবে না। রাবণ তাতে রাজি হন এবং লিঙ্গ নিয়ে লঙ্কার উদ্দেশ্যে পাড়ি দেন। অন্যদিকে দেবতারা চিন্তিত হয়ে পড়েন লঙ্কায় শিবলিঙ্গের পরিণতির কথা ভেবে। দেবতারা বিষ্ণুর কাছে পরামর্শের জন্য গিয়েছিলেন। বিষ্ণু তখন জলের দেবতা বরুণকে রাবণের পেটে প্রবেশ করতে বলেন। বরুণের প্রবেশের ফলে রাবণের প্রস্রাব করবার প্রয়োজন হয়ে পড়ে পথে, অথচ লিঙ্গ তিনি মাটিতে নামিয়ে রাখতেও পারবেন না। সেইসময় ভগবান বিষ্ণু বৈজু নামক এক ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে সেখানে উপস্থিত হন। রাবণ সেই ছদ্মবেশী বিষ্ণুকে লিঙ্গটি ধরতে বলে প্রস্রাবের জন্য গেলে বিষ্ণু লিঙ্গটিকে মাটিতে নামিয়ে রেখে প্রস্থান করেন। কথিত আছে এই দেওঘরেই নাকি সেই লিঙ্গ নামিয়ে রেখেছিলেন ভগবান বিষ্ণু। রাবণ ফিরে এসে শত চেষ্টাতেও সেখান থেকে আর শিবলিঙ্গটিকে সরাতে পারেননি।

শিবপুরাণ, মৎসপুরাণ, রামায়ণ-সহ আরও কিছু হিন্দুধর্মের বিভিন্ন গ্রন্থে জ্যোতির্লিঙ্গ বৈদ্যনাথ মন্দিরটির উল্লেখ পাওয়া যায়। জ্যোতির্লিঙ্গ বৈদ্যনাথ মন্দিরের ইতিহাসের দিকে লক্ষ্য করলে দেখতে পাওয়া যায় খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দীতে শেষ গুপ্ত সম্রাট আদিত্যসেন গুপ্তের শাসনকাল থেকেই এই বৈদ্যনাথ মন্দিরটি খুবই জনপ্রিয়। মুঘল সম্রাট আকবরের শ্যালক এই দেওঘরেই একটি পুকুর নির্মাণ করেছিলেন যা মান সসরোবর নামে পরিচিত। ভারতে যখন ইসলামী শাসনের যুগ শুরু হয় তখনও কিন্তু এই মন্দির স্বমহিমায় বিরাজ করেছে, তার গুরুত্ব মানুষের কাছে তখনও এতটুকুও কমেনি। ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অফিসাররা এই মন্দিরটির প্রতি মনোযোগ দেন। কিটিং নামে একজন ইংরেজকে মন্দিরের প্রশাসনিক ব্যবস্থা দেখতে পাঠানো হয়েছিল। মিঃ কিটিং মন্দিরের প্রশাসনিক কাজের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং তাঁরই নির্দেশে ১৭৮৮ সালে তাঁর সহকারী মিস্টার হেসিলরিগ এই পবিত্র শহর পরিদর্শন করেন এবং তীর্থযাত্রীদের থেকে বকেয়া সংগ্রহ তত্ত্বাবধান করেন। পরে অবশ্য কিটিং নিজে এই মন্দির পরিদর্শন করেন এবং তাঁর প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের নীতি পরিত্যাগ করেন। কিটিং এই মন্দিরের দায়িত্ব মন্দিরের সবচেয়ে উচ্চপদস্থ ব্রাহ্মণের হাতে তুলে দিয়েছিলেন।

বৈদ্যনাথ জ্যোতির্লিঙ্গের স্থাপত্যকর্ম অসাধারণ। মূল বৈদ্যনাথ জ্যোতির্লিঙ্গের মন্দির লাগোয়া আরও ২১টি ছোট বড় মন্দির চারিদিকে ছড়িয়ে রয়েছে। সেই মন্দিরগুলি মূলত পার্বতী, গণেশ, ব্রহ্মা, কালভৈরব, হনুমান, সরস্বতী, সূর্য, রাম-লক্ষ্মণ-জানকী, গঙ্গা, কালী, অন্নপূর্ণা লক্ষ্মী-নারায়ণ প্রমুখ দেবদেবীর মন্দির। মা পার্বতীর মন্দিরের সঙ্গে মহাদেবের মন্দিরটি মোটা একগোছা লাল সুতো দিয়ে বাঁধা দেখতে পাওয়া যায়। ভক্তদের বিশ্বাস অনুযায়ী ভগবান শিব ও পার্বতী এই মন্দিরকে লাল সুতো দিয়ে বেঁধে রেখেছেন। বহু হিন্দু দম্পতি তাই তাদের নিজেদের বন্ধন অটুট থাকবে আজীবন, এই বিশ্বাস নিয়ে এই মন্দির দর্শনের জন্য আসেন। ৭২ ফুট উঁচু মূল মন্দিরটি সাদা পাপড়িযুক্ত পদ্মের আকৃতির এবং শীর্ষে তিনটি সোনার পাত্র একটি আরেকটির উপর বসানো যা গিদ্দৌরের মহারাজা পুরণ সিং উপহার দিয়েছিলেন। এই পাত্রগুলি ছাড়াও আটটি পাপড়ি বিশিষ্ট একটি পদ্মের রত্ন রয়েছে যা চন্দ্রকান্ত মণি নামে পরিচিত। মন্দিরের শীর্ষে পাঁচটি মুখ বিশিষ্ট পঞ্চশূল লক্ষ করা যায়, যা সাধারণত অন্যান্য মন্দিরে খুব একটা দেখা যায় না। কথিত আছে দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা এই সুন্দর মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। বৈদ্যনাথ মন্দিরের আরেকটি অন্যতম বৈশিষ্ট হল এই গোটা মন্দিরটি একটিমাত্র শিলা দিয়েই নাকি নির্মিত হয়েছিল।

মূল মন্দিরটি মোট তিনটি ভাগে বিভক্ত, প্রবেশদ্বার, মাঝের অংশ এবং মূল ভবন। ভগবান শিবের সম্মুখে রয়েছে নন্দীর এক বিশাল মূর্তি। অভ্যন্তরের পবিত্র জ্যোতির্লিঙ্গটির ব্যাস প্রায় ৫ ইঞ্চি এবং এটি একটি ৪ ইঞ্চি পাথরের স্ল্যাবের ওপর স্থাপিত। এই লিঙ্গের চূড়াটি সামান্য ভাঙা। বিশ্বাস করা হয়, মাটিতে রাখার পর লিঙ্গকে স্থানচ্যুত করবার জন্য রাবণের প্রচন্ড টানাটানিতেই এমন ঘটেছে।

বছরের বিভিন্ন সময়ে বৈদ্যনাথ মন্দিরে বিশেষ কিছু উৎসব ধুমধাম করে উদযাপিত হয়ে থাকে। প্রথমেই বলতে হয় মহাশিবরাত্রির কথা। এইসময় যে উৎসব হয় এখানে তা বৈদ্যনাথ মহোৎসব নামেও খ্যাত। সাংস্কৃতিক নৃত্য ও সঙ্গীতের অনুষ্ঠান তো হয়ই, তাছাড়াও বিরাট মেলার আয়োজিত হয় এই সময়ে। নানারকম আচারঅনুষ্ঠান সহযোগে বাবা বৈদ্যনাথের বিশেষ পূজা করা হয়ে থাকে। লক্ষ লক্ষ ভক্তেরা শিবরাত্রির সময় ভিড় করেন এখানে। দ্বিতীয়ত, বলতে হয় শ্রাবণ মেলার কথা। শ্রাবণ মাসটিকেই মহাদেবের মাস বলে গণ্য করা হয়। মূলত জুলাই-আগস্ট মাসে এই শ্রাবণ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এই সময় বৈদ্যনাথ মন্দির থেকে প্রায় ১০৮ কিলোমিটার দূরে সুলতানগঞ্জ থেকে পবিত্র গঙ্গাজল কানওয়ার নামক একটি সুন্দর সজ্জিত বাঁশের লাঠির প্রান্তে বাঁধা দুটি পাত্রে সংগ্রহ করে তা বয়ে নিয়ে এসে মহাদেবের মাথায় ঢালেন ভক্তের দল। এই মন্দিরে দীপাবলিও খুব জাঁকজমকপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। মন্দিরের চতুর্দিকে আলোর রোশনাই দেখা যায়। সেই সময়ে অদ্ভুত সুন্দর দেখতে লাগে মন্দিরটিকে। এছাড়াও মহাকাল ভৈরব পুজো, মা মনসার পুজো, জন্মাষ্টমী, অনন্ত চতুর্দশী, গণেশ পুজো ইত্যাদি উৎসবও নানা আচার-অনুষ্ঠান সহযোগে উদযাপিত হয় এই মন্দিরে।

সতীপীঠ এবং একই সঙ্গে জ্যোতির্লিঙ্গের অবস্থান, এমন মন্দির খুব কম রয়েছে ভারতে। সেই কারণে এই মন্দিরকে খুবই পবিত্র জ্ঞান করেন ভক্তেরা এবং তাই বৈদ্যনাথ মন্দিরে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ নিজেদের প্রার্থনা নিয়ে এখানে আসেন।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading