সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ জুড়েই নানান ঐতিহাসিক স্থাপত্যের ছড়াছড়ি। প্রাচীন মন্দিরের পাশাপাশি মসজিদের সংখ্যাও নেহাত কম নয়, কারণ সুদীর্ঘকাল সুলতানি শাসনের অধীন ছিল এই দেশ। সেইসব প্রাচীন মসজিদগুলির অধিকাংশই এখন ভগ্নদশায় রয়েছে, তবুও অবশিষ্ট অংশটুকুই ইতিহাসকে বহন করে চলেছে। কাটরা মসজিদ (Katra Masjid) পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক মসজিদ। এই মসজিদের সাথে জড়িয়ে আছে বাংলার নবাবী ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্ন। একদিকে এটি যেমন মুর্শিদাবাদের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক নিদর্শন, অন্যদিকে মুর্শিদাবাদের পর্যটন স্থানের মধ্যে অন্যতম আকর্ষণ।
মুর্শিদাবাদের পূর্বনাম ছিল মখসুদাবাদ। ১৭০৪ সালে বাংলার প্রথম স্বাধীন নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁ তাঁর রাজধানী, ঢাকা থেকে সরিয়ে মখসুদাবাদে নিয়ে আসেন। তাঁর নামানুসারে মখসুদাবাদের নতুন নাম হয় মুর্শিদাবাদ। এই মুর্শিদাবাদে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অনেক ঐতিহাসিক স্থান, যার মধ্যে মাত্র দুটো স্থানই তাদের আদিরূপে রয়েছে। একটি হল মুর্শিদ কুলি খাঁর প্রতিষ্ঠিত কাটরা মসজিদ, অন্যটি তাঁর নাতির তৈরি অসম্পূর্ণ ফৌতি মসজিদ।
১৭২৩ সালে মুর্শিদ কুলি খাঁ কাটরা মসজিদের নির্মাণ করেন। একসাথে ২০০০ মানুষ এখানে নামাজ পাঠ করতেন। নামাজের পাশাপাশি এই মসজিদে মাদ্রাসাও চালু ছিল। ছাত্রদের সেখানে আরবী ভাষায় কোরান পাঠ শেখানো হত এবং ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া হত। মুর্শিদ কুলি খাঁ এই মসজিদের নিচের অংশে নিজের সমাধি তৈরির ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং তাঁর মৃত্যুর পর এখানেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। সাধারণত শাসকদের সমাধি আলাদা স্থানে নির্মিত হলেও মুর্শিদ কুলি খাঁর সমাধি ছিল ব্যতিক্রম। কারণ তিনি চেয়েছিলেন যেন মানুষের পদধূলি তাঁর কবরের উপর পড়ে, যাতে তাঁর পাপ ক্ষমা হয় এবং তিনি বেহেস্তে যেতে পারেন।
১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পরে কাটরা মসজিদ তার গুরুত্ব হারাতে থাকে। ব্রিটিশ শাসনের সময় এটি সংরক্ষণের অভাবে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আজও বাংলার নবাবী আমলের ইতিহাসের অন্যতম সাক্ষী হয়ে আদিরূপে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে কাটরা মসজিদ। ইংরেজ শিল্পী উইলিয়াম হজেস ১৭৮১ সালে তাঁর মুর্শিদাবাদ ভ্রমণকালে তিনি কাটরা মসজিদের ছবি আঁকেন এবং এই মসজিদ নিয়ে লেখালিখি করেন। সেগুলো তাঁর বই ‘সিলেক্ট ভিউজ অফ ইন্ডিয়া’-তে প্রকাশিত হয়।
মসজিদ চত্বরে একটি শিব মন্দির রয়েছে। জনশ্রুতি অনুসারে নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁ সেই মন্দিরের নির্মাণ করিয়েছিলেন। তবে অনেকের দাবি মন্দিরটি একেবারেই নতুন, তার সঙ্গে মুর্শিদ কুলি খাঁ’র সম্পর্ক নেই। গাইডরা মসজিদের তিনটি যায়গায় মন্দিরের পোড়ামাটির ফলকের টুকরো দেখিয়ে এও দাবি করেন যে কাটরা মসজিদ নাকি মন্দি ধ্বংস করে তৈরি করা। অনেকে এই দাবিও ভিত্তিহীন বলে অনে করেন। তাঁদের কথা অনুযায়ী মন্দির ধ্বংস করে মসজিদ তৈরি করলে, মন্দিরের আরও অনেক ধ্বংসাবশেষ মসজিদে দেখা যেত।
কাটরা মসজিদ তৈরি হয়েছে একটি বিশাল, উঁচু চাতালের ওপর এবং তাকে ঘিরে রয়েছে একাধিক ছোট ছোট ঘর। আসল মসজিদ এর ভেতরে। কাটরা মসজিদের চারদিকে দোতলা ঘরগুলির যে ঘের রয়েছে, তার মাপ পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে ৭৪ মিটার, এবং উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে ৬০ মিটার। এই ঘেরের ভিতরের এক একটি কক্ষের মাপ আন্দাজ ২০ বর্গফুট।
এই ঘেরের চার কোনে রয়েছে চারটি উঁচু মিনার। এক একটি মিনারের উচ্চতা ৭০ মিটার, এবং ব্যাসে ২৫ মিটার। পূর্বদিকের দুটি মিনারই সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। বর্তমানে কেবল কেবল পশ্চিমের দুটি মিনার অবশিষ্ট রয়েছে । পূর্ব থেকে পশ্চিমে আন্দাজ ৫৫ মিটার লম্বা এবং উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে ৬০ মিটার চওড়া চাতালটি রয়েছে ঘেরের ভিতরে। চাতালের পশ্চিম দিকে রয়েছে আয়তক্ষেত্রাকার মসজিদটি।
চাতালে ওঠার জন্যে মসজিদের পিছনদিকে সিঁড়ি আছে, যদিও প্রধান প্রবেশদ্বার, আর পাঁচটি মসজিদের মতই, পূর্ব দিকে। কিন্তু বর্তমানে মসজিদের পিছনের অংশ দিয়েই প্রবেশ করানো হয়। ১৪ ধাপ সিঁড়ি ওঠার পর সামনে রয়েছে চাতাল। বাকি চাতাল পোড়ামাটির হলেও, মাঝখানের একটি অংশ কালো পাথর দিয়ে বাঁধানো, যেন সিঁড়ি থেকে মসজিদের দরজা পর্যন্ত সোজা কালো একটা ফুটপাথ চলে গেছে। পোড়ামাটির মধ্যে চৌকো চৌকো খোপ করা রয়েছে। এক একটি খোপ একজন করে মানুষের বসার পক্ষে যথেষ্ট। নামাজিদের জন্যে এইভাবে চাতালে জায়গা নির্ধারণ করে দেওয়া আছে।
এক সময়ে সাড়ে চার মিটার লম্বা, এবং আন্দাজ সাড়ে সাত মিটার চওড়া মসজিদের পাঁচটি গম্বুজ ছিল । ১৮৯৭ সালে ভূমিকম্পে, মাঝখানের গম্বুজ এবং পূর্ব দিকের দুটি মিনার ভেঙ্গে পড়ে।
মসজিদের পূর্বদিকের দেওয়ালের বিশাল লোহার আংটা দেওয়াল থেকে বেরিয়ে রয়েছে। একই সঙ্গে, এর থেকে ছোট বেশ কয়েকটা আংটা রয়েছে চাতালের পোড়ামাটির ওপরে। কোনো বিশেষ অনুষ্ঠানের জন্যে শামিয়ানা টাঙানোর জন্যই এই আংটার ব্যবস্থা। পূর্বদিকের দেওয়ালে পাঁচটি দরজা রয়েছে। খিলানের ভতরে দরজাগুলির ‘ফ্রেম’ কালো পাথরের। মাঝখানের দরজার ওপরে রয়েছে একটি পাথরের ফলক। ফলকে ফারসি ভাষায় লেখা রয়েছে, “আরবের মহম্মদ, যিনি দুই জগতের গৌরব, তাঁর পায়ের ধুলো যেন তাঁদের মাথাতেও পড়ে, যাঁরা তাঁর দরজার ধুলো হতে পারলেন না”। দরজার ওপরের ফলকে মসজিদে নির্মানের তারিখ লেখা রয়েছে হিজরি মতে – ১১৩৭, অর্থাৎ ১৭২৪ সাল।
বর্তমানে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া কাটরা মসজিদের দেখাশোনা করে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- নিজস্ব প্রতিনিধি
- “মুর্শিদাবাদ ভ্রমণগাইড”, লেখিকা – কাকলি মজুমদার
- “নবাবী অন্দরমহল”, লেখিকা – কল্পনা ভৌমিক
- https://en.wikipedia.org/
- https://www.banglarmasjid.com/


আপনার মতামত জানান