সববাংলায়

কেতকী কুশারী ডাইসন

বিভাগঃ , ,

কেতকী কুশারী ডাইসন (Ketaki Kushari Dyson) একজন খ্যাতনামা প্রবাসী ভারতীয় সাহিত্যিক। নীরদ চন্দ্র চৌধুরী, ঝুম্পা লাহিড়ী, অমিতাভ ঘোষের মতো প্রবাসী ভারতীয় সাহিত্যিক যাঁরা নিজেদেরকে সৃজনশীলতার মাধ্যমে ভারতবর্ষকে বিশ্বের আঙিনায় পৌঁছে দিয়েছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন কেতকী কুশারী ডাইসন। ইংরেজী ও বাংলা উভয় ভাষাতেই তিনি অনায়াস দক্ষতায় তাঁর সৃষ্টিকে ফুটিয়ে তুলেছেন। একইসঙ্গে কবিতা, প্রবন্ধ, নাটক, উপন্যাস, গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ, সাহিত্য সমালোচনা এবং বিদেশি সাহিত্যের অনুবাদের মধ্য দিয়ে তাঁর সৃষ্টিপ্রবাহ চলেছে। কেতকী কুশারী অনুবাদ সাহিত্যের মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন বিশ্বের দরবারে। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তাঁর গবেষণামূলক প্রবন্ধ ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’ আনন্দ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে। সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেয়েছেন ‘ভুবনমোহিনী দাসী মেডেল।

১৯৪০ সালের ২৬ জুন কলকাতায় কেতকী কুশারী ডাইসনের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম অবনীমোহন কুশারী ও মায়ের নাম অমিতা কুশারী। অবনীমোহন কুশারী ছিলেন মালদা জেলার মহকুমা প্রসাশক। কেতকীর পিতামহ ছিলেন একজন শিক্ষক যাঁর পাণ্ডিত্যের কারণে তিনি ‘শেক্সপীয়ার কুশারী’ বলে পরিচিত ছিলেন। চার ভাইবোনের মধ্যে কেতকী ছিলেন সবচেয়ে বড়। ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন কেতকী। পরবর্তীকালে ১৯৬৪ সালে তিনি বিয়ে করেছিলেন রর্বাট ডাইসনকে। কেতকী ও রর্বাটের  দুই পুত্র সন্তান রয়েছে।

১৯৪৮ সালে সেন্ট জনস ডায়োসেসন গার্লস হাই স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৫৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রের্কড নম্বর পেয়ে ইংরেজি সাহিত্যে বি.এ পাস করেন। ১৯৬০ সালে স্কলারশিপ নিয়ে ইংল্যাণ্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৬৩ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে প্রথম ভারতীয় মহিলা হিসেবে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। এরপর এক বছরের জন্য দেশে ফিরে এলেও ১৯৬৯ সালে আবার অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা শুরু করে ১৯৭৫ সালে ‘ডক্টরেট’ উপাধি লাভ করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ‘এ ভেরিয়াস ইউনির্ভাস এ স্টাডি অফ দ্য জার্নাল অ্যাণ্ড মেমোরিস অফ ব্রিটিশ মেন অ্যাণ্ড উইমেন’। অক্সফোর্ড থেকে স্নাতক উত্তীর্ণ হওয়ার পরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতে শুরু করেন কেতকী কুশারী ডাইসন । এক বছর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার পরে তিনি আবার ফিরে যান অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করার জন্য।

কেতকী কুশারী ডাইসন এর কবিতা লেখার শুরু চার বছর বয়স থেকে। ছোট থেকেই সাহিত্য ও সংস্কৃতির পরিবেশ তাঁর শিল্পীসত্ত্বাকে বিকশিত করতে সাহায্য করছিল। অনেক কম বয়সে দেশভাগ প্রত্যক্ষ করেছেন তিনি, যে যন্ত্রণা পরবর্তীকালে কেতকী তাঁর লেখায় তুলে ধরেছেন। তিনি নিজে মনে করেন ‘তাঁর একমাত্র কাজ লেখা এবং লেখার জন্যই তাঁর জন্ম হয়েছে’।  তিনি সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় নিজের অসামান্য সৃষ্টির মাধ্যমে তাঁর নিজের প্রতি এই বিশ্বাসটিকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি সৃষ্টি করেছেন নানা উপন্যাস, কবিতা, গবেষণামূলক প্রবন্ধ এবং আজও সমানভাবে তিনি সৃষ্টির কাজে নিজেকে মগ্ন রেখেছেন। রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও বুদ্ধদেব বসুর রচনা তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে সেই ছোটবেলা থেকেই। রবীন্দ্রনাথের ‘কথা ও কাহিনী’ কেতকীর উপরে প্রভাব বিস্তার করেছিল গভীরভাবে। 

পরবর্তীকালে তাঁর অনুবাদ সাহিত্য ও গবেষণামূলক কাজগুলি বেশীরভাগই রবীন্দ্রনাথ ও বুদ্ধদেব বসুকে নিয়ে। একজন সংবেদনশীল নারী হিসেবে তাঁর অন্তরের আবেগ, সহানুভূতি দিয়ে পারিপার্শ্বিক ঘটনাবলী ও ছোট ছোট চরিত্রগুলিকে তিনি বাস্তব করে তুলেছেন। লেখার রসদ সংগ্রহ করার জন্য বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করেছেন কেতকী। কখনও ইরাকের ধ্বংসের প্রতিচ্ছবি, আবার কখনও লেবাননের বোমাবর্ষণের ফলে নিপীড়িত মানুষের বাস্তবতার কথা তাঁর লেখায় স্হান পেয়েছে। ভারতীয় নারী হিসেবে ব্রিটেনের অধিবাসীদের জীবনযাত্রা ও সংগ্রামের ছবি তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর ‘নোটন নোটন পায়রাগুলি’ নামক উপন্যাসটিতে। এই উপন্যাসটি ১৯৮৩ সালে ‘দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। ভাষাশৈলী ও উপস্থাপনার গুণে একটি আন্তর্জাতিক মানের উপন্যাস হয়ে উঠেছে এই রচনাটি। ‘জল ফুঁড়ে আগুন’ উপন্যাসটিতে তিনি ভারতীয়দের সঙ্গে ইংরেজদের অসবর্ণ বিবাহের বিষয়টিকে তুলে ধরেন। জীবনানন্দ দাশ তাঁর ‘সফলতা নিষ্ফলতা’ গল্পে বুদ্ধদেব বসুকে কোথাও হেয় করতে চেয়েছিলেন বলে মনে করা হয়। বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে কেতকীর পারিবারিক সম্পর্কের সুবাদে তিনি এই বিষয়টির প্রতিবাদ করে লেখেন ‘তিসিডোর’। এই গ্রন্থে তিনি বিভিন্ন জায়গায় বুদ্ধদেব বসুকে একজন গুণীজন ও অভিজাত লেখক হিসেবে বর্ণনা করেছেন ও একই সঙ্গে তিনি জীবনানন্দের জীবন-আলেখ্য ও সাহিত্য নিয়েও  একটি বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা করেছেন এই গ্রন্থে। ‘তিসিডোর’ কোন উপন্যাস, গল্প বা অনুবাদ সাহিত্য নয়, এটি একটি বিশ্লেষণধর্মী লেখা। এগুলি ছাড়াও তাঁর লেখা ১৯৮১ সালে ‘নারী নগরী’, ২০০৩ সালে ‘জল ফুঁড়ে আগুন’, ২০০৬ সালে ‘পৃথিবীর তিন কাহিনী’ প্রকাশিত হয়।

১৯৭৭ সালে কেতকীর প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘বল্কল’-এ তিনি আবেগের সঙ্গে পরিশীলিত রুচিবোধের মিলন ঘটিয়েছেন। ১৯৮০ সালে তাঁর লেখা ‘সবীজ পৃথিবী’ কাব্যগ্রন্থে বিদেশি পরিবেশের অপরূপ সৌন্দর্যের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত আবেগ মিলেমিশে এক অনবদ্য রচনাশৈলী সৃষ্টি হয়েছে। কেতকীর অবাধ কল্পনার বিচরণে বিদেশের মাটির সঙ্গে দেশীয় সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটেছে। ‘গল্প নয়’ কবিতায় তিনি মাতৃহারা এক কিশোরীর কথা বলেন যা পাঠকের হৃদয়স্পর্শ করে। ‘জলের করিডোর ধরে’ এই কাব্যগ্রন্থটি তাঁর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ যা ১৯৮১ সালে প্রকাশিত হয়। তাঁর অনান্য কাব্যগ্রন্থগুলি হল ‘নববর্ষ’, ‘হাসিনাকল’, ‘কথা বলতে দাও’, ‘দোলনচাঁপায় ফুল ফুটেছে’ ইত্যাদি। ইংরেজি ভাষার প্রতি সহজাত ভালোবাসা ও দক্ষতার কারণে তিনি রচনা করেছেন বহু ইংরেজি কবিতাও যার মধ্যে অন্যতম হল ‘স্যাসউড’, ‘হিবিকাস ইন দ্য নর্থ’, ‘স্পেস আই ইনহিবিট’, দ্যাট সেন্স ইয়ু টাচড ইট’-এর মতো কবিতাগুলি। তাঁর রচিত কবিতা বিদেশি পাঠকদের কাছে অত্যন্ত সমাদরে গৃহীত হয়েছে। বহুদিনের প্রবাসী হয়েও বাংলার সংস্কৃতি, গ্রামবাংলার সহজ সরল রূপ, পালাগান ও সুফি সঙ্গীতকে তিনি একসূত্রে গ্রথিত করেন তাঁর রচনার মাধ্যমে। কেতকী কুশারীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ রবীন্দ্রনাথ এবং ওকাম্পোকে নিয়ে তাঁর গবেষণামূলক রচনা ‘রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সন্ধানে’ এবং ‘ইন ইয়োর ব্লসমিং গার্ডেন রবীন্দ্রনাথ টেগোর অ্যাণ্ড ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো’। এই দুটি রচনার জন্য তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন এবং বিদ্ধগ্ধ সমাজে পরিচিত হয়েছেন।রবীন্দ্রনাথই ছিলেন কেতকীর সমস্ত সৃষ্টির উৎস। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে সুশোভন অধিকারী, অ্যাড্রিয়ান হিল ও রর্বাট ডাইসনের সঙ্গে গবেষণা করে কেতকী রচনা করেন ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’ নামে অসামান্য একটি বই। রবীন্দ্রনাথের আঁকা ছবির রঙ সংক্রান্ত গবেষণামূলক এই উপন্যাসটি একটি প্রবাদপ্রতিম রচনা। কাব্যগ্রন্থ ও উপন্যাস ছাড়াও তিনি ‘রাতের রোদ’ (১৯৯৪), ‘মোত্সার্ট চকলেট’ (১৯৯৮), ‘সুপর্ণরেখা’ (২০০২) নামে বেশ কিছু নাটক রচনা করেছেন। কেতকী কুশারীর অনুবাদকর্মগুলি এক অনন্য সৃষ্টি। ইংরেজি থেকে বাংলায় এবং বাংলা থেকে ইংরেজিতে বহু গ্রন্থ অনুবাদ করে তিনি দুটি ভাষার মানুষের কাছে এক সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁর ইংরেজি অনুবাদের দ্বারা যেমন তিনি বাংলা ভাষাকে এক অন্য উচ্চতা প্রদান করেছেন সমগ্র বিশ্বের কাছে, ঠিক তেমনভাবে বাংলা অনুবাদের সাহায্যে তিনি বিশ্বসাহিত্যকে সকলের কাছে সহজলভ্য করে দিয়েছেন। তিনি রবীন্দ্রনাথের ‘কর্ণকুন্তী সংবাদ’ ইংরেজিতে অনুবাদ করেন এবং একইসঙ্গে কবি নজরুল ইসলামের কবিতাগুলিও অনুবাদ করেছেন। বাংলা থেকে ইংরেজিতে তিনি অনুবাদ করেন ‘আংলো স্যাক্সন কবিতা’, ‘নাইট সানলাইট’, ‘দ্য সিলেক্টেড পোয়েমস অফ বুদ্ধদেব বসু’ ইত্যাদি।

কেতকী তাঁর সৃষ্টির জন্য দু’বার আনন্দ পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৮৬ সালে তিনি আনন্দ পুরস্কার পান ‘রবীন্দ্রনাথ ও ওকাম্পোর সন্ধানে’ রচনার জন্য এবং দ্বিতীয়বার ১৯৯১ সালে সুশোভন অধিকারীর সঙ্গে একত্রে ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’ গবেষণামূলক উপন্যাসটির জন্যও আনন্দ পুরস্কারে ভূষিত হন। ১৯৮৬ সালে বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ভুবনমোহিনী দাসী মেডেল’-এ ভূষিত হন কেতকী কুশারী ডাইসন।

বর্তমানে কেতকী কুশারী ডাইসন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।