সববাংলায়

কেতুগ্রামের দুর্গাপূজা | কাটা মুণ্ডর পুজো

বিভিন্ন দুর্গাপূজার মধ্যে কেতুগ্রামের দুর্গাপূজা সকলের থেকে ভিন্ন। দেবী এখানে ত্রিশূল হাতে অসূরদলনী নন, দশভুজাও নন। এখানে নেই মহিষাসুর, নেই দেবীর বাহন সিংহ, নেই দেবীর চার পুত্র কন্যা। এমনকি দেবীর সমগ্র মূর্তিও এখানে অনুপস্থিত। দুর্গা বলতে শুধু একটা মুখ। লোকমুখে এই পুজোর নাম কাটা মুণ্ডর পুজো । যদিও দুর্গার এই ব্যতিক্রমী রূপটি সম্পর্কে কোন শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা নেই। তবে এই পূজার উৎস নিয়ে বিভিন্ন জনশ্রুতি রয়েছে।

প্রথম জনশ্রুতি অনুযায়ী গ্রামের কোঁয়ার সদগোপরা ছিলেন প্রাচীন গোপভূমির অমরাগড় দিগনগর প্রভৃতি অঞ্চলের ডাকসাইটে ভূস্বামী। তাঁদের পূর্বপুরুষ হরগোবিন্দ রায় অমরাগড় থেকে গোমাই এ চলে আসেন জমিদারি প্রাপ্তির সূত্র। জনশ্রুতি অনুসারে একদিন তিনি শরতের দুপুরে কেতুগ্রাম থেকে ফিরছিলেন গোমাই। নির্জন মাঠে ঠাকুরপুকুরের ক্লান্তি মেটাবার জন্য বটতলায় বসলেন। তৃষ্ণা মেটাবার জন্য পুকুরের জল আঁচলা  ভরে পান করতেই এক অলৌকিক দৃশ্যে তিনি চমকে উঠলেন। পদ্মফুলের মাঝে এক দেবীর মুখমন্ডল সরোবরে ভাসছে। কাছে যেতেই সেই মুখ জলের তলায় অদৃশ্য হয়ে যায়। অন্য মতে বলা হয় তিনি গ্রামের পুকুরঘাটে গিয়ে দেখেন, স্নান করছেন এক নারী। তাঁর মাথা আর গলাটুকু ছিল জলের ওপরে। নজর পড়তেই নিমেষে অদৃশ্য হয়ে যান ওই নারী।

সেদিন রাতে তিনি স্বপ্নাদেশ পেলেন যে নারীর মুখ তিনি দেখেছেন তিনি দেবী দুর্গা এবং দেবীর যেটুকু দেখতে পাওয়া গিয়েছে সেটুকু অংশের মূর্তি বানিয়ে পুজো করতে হবে। অনুরূপ স্বপ্ন দেখলেন পার্শবর্তী শিবলুন গ্রামের মৃৎশিল্পী গোপাল সূত্রধরের পূর্বপুরুষ। সেই অনুযায়ী দেবীর মুখমণ্ডলের মূর্তি বানিয়ে একচালা মাটির ঘরে পুজো শুরু হয়। উভয় বংশ পরম্পরার সহযোগিতায় আজও অনুষ্ঠিত হয়ে চলেছে কাটা মুণ্ডর পুজো ।

দ্বিতীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী বহুকাল আগে এই রায় পরিবারের পূর্বপুরুষ থাকতেন বুদবুদের কাছে দিকনগর লাগোয়া অমরাগড়ের জঙ্গলের কাছে। পরে এই পরিবারের এক শরিক চলে আসেন কেতুগ্রামের গোমাই গ্রামে। সেখানে তারা পারিবারিক দুর্গাপুজো চালু করেন। একবার পুজোর মধ্যে ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়। তখন দুর্গামূর্তি মাটিতে তলিয়ে গেলেও গলা থেকে মুখমণ্ডলটি মাটির উপরে ছিল। দিনটা ছিল দশমী তিথি। পরিবারের যে কজন বেঁচে ছিলেন তাঁরা দেবীর মুখমণ্ডলটি পূজা করে ভরদুপুরেই গ্রামের ঠাকুরপুকুরে বিসর্জন দিয়ে চলে যান। পরের বছর থেকে শুধু দেবীর মুখমণ্ডলই পুজো হয়।

সাবেকি আদলে গঙ্গামাটি দিয়ে মাতৃমুখ তৈরি হয় শিল্পীর বাড়িতে। ষষ্ঠীর দিন প্রবীণ সেবাইতের সামনে দেবীর চক্ষুদা্নে পর একটি পুরানো তামার টাটে বসিয়ে দেবীমুন্ড নিয়ে আসা হয় দেবীমন্ডপে। মাথায় ধরা হয় ঐতিয্যবাহী ছাতা। রাস্তায় ছিটানো হয় গঙ্গার জল। এরপর গর্ভমন্দিরে চালি সদৃশ এক কাঠের সিংহাসনে মুন্ড বসিয়ে বেনারসী শাড়ি আর শোলার কলকা দিয়ে সাজানো হয়। সপ্তমীর দিন কলা বৌ আনার আগে সেবাইতরা গহনা দিয়ে দেবীকে সজ্জিত করেন। দেবী পুজোর দিনে আরতি হয় না ,অন্নভোগও নেই। প্রসাদ শুধুমাত্র নৈবেদ্যে। সপ্তমীতে আখ চাল-কুমড়ো অষ্টমীর সন্ধিপুজোয় বলি হয় নধর কালো পাঁঠা। নবমীতে হয় বিশেষ বলিদানপর্ব। রাতের দিকে তাৎপর্যপূর্ণ পূর্বপুরুষ পুজো। দশমীর পুজোর বিশেষ আকর্ষণ আবার কুমারীপুজো। দশমীর দুপুরে দেবীর নিরঞ্জন হয় দেবীপুকুরে। বিসর্জন শেষ হতেই সবার চোখ থাকে আকাশে। পুকুর পাড় দিয়ে শঙ্খচিল ওড়া দেখেই তবে বাড়ি ফেরেন রায় বাড়ির সদস্যেরা। তবে রায় পরিবারের সেই পুরনো দাপট আর নেই। তবে পুরনো নিয়মের সাথে তারা পুজোটি চালিয়ে যাচ্ছেন।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading