ইতিহাস

লীলা মজুমদার

বাংলা সাহিত্যের এক অমর শিশু সাহিত্যিক হলেন লীলা মজুমদার । বাঙালির ছেলেবেলাকে তিনি তাঁর অসামান্য সব সৃষ্টি দিয়ে জীবনের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে গেঁথে দিয়ে গেছেন।

১৯০৮ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি রায় পরিবারের গড়পাড় রোডের বাড়িতে লীলা মজুমদার জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম প্রমদারঞ্জন রায় ও মায়ের নাম সুরমা দেবী। বাবা প্রমদারঞ্জন রায়ও শিশুদের জন্য গল্প লিখতেন। তাঁর লেখা ‘বনের কথা’ গল্পটি সন্দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিক রূপে প্রকাশিত হয়। জন্মসূত্রে লীলা’র রক্তেই ছিল লেখনী সত্তার সমস্ত গুণ। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরি জন্মসূত্রে তাঁর কাকা। সুকুমার রায়ের তুতো বোন ও সত্যজিৎ রায়ের তুতো পিসি ছিলেন লীলা মজুমদার।

লীলা’র ছোটবেলা কেটেছে শিলংয়ের পাহাড় ঘেরা শান্ত পরিবেশে। শিলংয়ে তাঁদের বাড়ির নাম ছিল ‘হাই উইন্ডস’। শিলংয়ের লরেটো কনভেন্টে তাঁর স্কুল জীবন শুরু হয়। বাবা প্রমদারঞ্জন রায় চাকরি সূত্রে কলকাতায় বদলি হলে ১২ বছর বয়সে লীলা সপরিবারে শিলং থেকে কোলকাতায় চলে আসেন এবং গড়পার রোডের উপেন্দ্রকিশোরের বাড়িতে থাকতে শুরু করেন তাঁরা। কোলকাতায় এসে লীলা ভর্তি হন সেন্ট জন ডায়োসেশন স্কুলে। ১৯২৪ সালে এই স্কুল থেকেই লীলা ম্যাট্রিকুলেশনে মেয়েদের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক এবং স্নাতকত্তরে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন তিনি।

নদী-নুড়িপাথর, পাহাড় ঘেরা পরিবেশে বেড়ে উঠার দরুন ছোট থেকেই নানা কল্পনা তাঁর মাথায় ঘুরপাক খেত। তিনি নিজেই লিখেছেন, ‘‘শিলং পাহাড়ে থাকতাম, সরল বনের মধ্যে হাওয়া দিলে সোঁ সোঁ শব্দ হত। ঠিক যেন লুকনো কথা বলে দিচ্ছে। দুটো পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে ঝোড়ো হাওয়া বইলে গোঁ গোঁ শব্দ হত। মনে হত ওইখানে কোনও গোপন জায়গায় শেকল দিয়ে দৈত্য বাঁধা আছে, ছাড়াবার চেষ্টা করছে। পাহাড়ি আয়ারাও গল্প বলত। সে সব দুঃখের গল্প, হারানোর গল্প, না পাওয়ার গল্প, কষ্টের গল্প। শুনে কান্না পেত।’’

কেবল শিলং এর দরাজ প্রকৃতি নয়, তাঁর বাড়ির সাহিত্য সমৃদ্ধ পরিবেশও তাঁকে লেখিকা হতে অনুপ্রাণিত করেছিল যথেষ্ট পরিমাণে। সুকুমার রায়ের অনুপ্রেরণায় লীলা’র লেখা প্রথম গল্প ‘লক্ষ্মী ছেলে’ ১৯২২ সালে সন্দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ছোট ও বড় গল্প রচনার পাশে লীলা শিক্ষকতাও করেছেন। প্রথম দিকে দার্জিলিংয়ের ‘মহারানী গার্লস স্কুল’-এ অধ্যাপনা করতেন। পরে রবীন্দ্রনাথের ইচ্ছায় শান্তিনিকেতনে পড়াতে আসেন ন’মাসের জন্য। এরপর কলকাতার আশুতোষ কলেজের মহিলা বিভাগেও অধ্যাপনা করেন কিছুকাল।

 ১৯৩২ সালে নিজের পছন্দ করা পাত্র দন্ত চিকিৎসক ডাঃ সুধীরকুমার মজুমদারকে তিনি বিবাহ করেন। তাঁর দাম্পত্যজীবন সুখে কাটলেও সাহিত্য রচনা কিছুটা অবহেলিত হতে থাকে সাংসারিক কাজে। পরবর্তী সময়ে স্বামীর অনুপ্রেরণায় আবার লেখা শুরু করেন তিনি। এই সময় তিনি ‘বৈশাখী’ পত্রিকায় বড়দের জন্য লেখা শুরু করেন এবং এখান থেকেই বলা যেতে পারে শুরু হয় সাহিত্যিক লীলা মজুমদারের দীর্ঘ পথ চলা। ‘মৌচাক’, ‘রামধনু’, ‘রংমশাল’, ‘পরিচয়’ ইত্যাদি নানা পত্রিকায় অনিয়মিত ভাবে লেখা পাঠাতে শুরু করেন তিনি। সাংসারিক কাজের পাশাপাশি মাথায় ভিড় করা নানা গল্প ও ভাবনাকে গল্পের রূপ দেওয়ার জন্য লীলা’র মন অস্থির হয়ে উঠত।

তাঁর রচিত শিশু সাহিত্যগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – ‘বদ্যি নাথের বড়ি’, ‘ছোটদের শ্ৰেষ্ঠ গল্প’, ‘লাল নীল দেশলাই’, ‘ভূতের গল্প’, ‘ছোটদের বেতাল বত্রিশ’, ‘চিচিং ফাঁক’, পদিপিসির বর্মিবাক্স, হলদে পাখির পালক, শ্রীমতী, গুপির গুপ্তকথা, বক ধার্মিক, মণিকাঞ্চন, টং লিং ইত্যাদি। সত্যজিৎ রায় ‘সন্দেশ’ পত্রিকাটি ১৯৬১ সালে আবার শুরু করলে লীলা মজুমদার এই পত্রিকার সহসম্পাদকের পদে নিযুক্ত হন এবং ১৯৯৪ সাল অবধি এই দায়িত্ব তিনি পালন করেন।

সারা জীবনে লীলা মজুমদার অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-
‘বক বধপালা’ নাটকটির জন্য ১৯৫৯ সালে ‘সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি’ পুরস্কার। ‘হলদে পাখির পালক’ উপন্যাস রচনার জন্য ১৯৫৭ সালে ‘স্টেট পুরস্কার’ ও ‘শিশু সাহিত্য পুরস্কার’। ‘আর কোনখানে’ আত্মজীবনীর জন্য ১৯৬৯ সালে ‘রবীন্দ্র পুরস্কার। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘দেশিকোত্তম’, কলকাতা এবং বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক ডি-লিট প্রদান করে।

দীর্ঘ রোগভোগের পর ২০০৭ সালের ৫ এপ্রিল এই অসামান্য সাহিত্য প্রতিভার মৃত্যু হয়।

স্বরচিত রচনা পাঠ প্রতিযোগিতা, আপনার রচনা পড়ুন আপনার মতো করে।

vdo contest

বিশদে জানতে ছবিতে ক্লিক করুন। আমাদের সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করুন। ইমেল – contact@sobbanglay.com

 


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।