মহারাজা নন্দকুমার (Maharaja Nandakumar) বাংলার একজন বিখ্যাত দেওয়ান, শাক্তসাধক ও কবি। নবাবি আমলে এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকালে তিনি বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের প্রশাসনিক কাজকর্মের সাথে যুক্ত ছিলেন। নবাব আলীবর্দী খাঁর সময়ে তিনি প্রথম প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসাবে কাজ শুরু করেন। তারপর নিজের কর্মদক্ষতায় তিনি বর্ধমান, হুগলি ও নদীয়ার দেওয়ান পদে অধিষ্ঠিত হন। মহারাজা নন্দকুমার নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে ব্রিটিশদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সাহায্য করেন। পরবর্তীকালে ওয়ারেন হেস্টিংসের সঙ্গে তীব্র বিরোধের পর নন্দকুমারের বিরুদ্ধে জালিয়াতির মামলা হয় এবং সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে তাঁকেই সর্বপ্রথম মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। অনেকে তাঁর মৃত্যুকে একটি ‘আইনি হত্যা’ বলে বর্ণনা করেন। প্রশাসনিক কাজকর্ম ছাড়াও বাংলার শাক্তধর্মের ইতিহাসে মহারাজা নন্দকুমারের নাম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়। তিনি বীরভূম জেলার নলহাটির কাছে আকালীপুর গ্রামে তন্ত্রসম্মত উপায়ে গুহ্যকালী মন্দির নির্মাণের কাজ শুরু করেন।
আনুমানিক ১৭০৫ সালে তৎকালীন মুর্শিদাবাদ জেলার (বর্তমানে বীরভূম জেলা) ভদ্রপুর গ্রামের এক বাঙালি ব্রাহ্মণ পরিবারে মহারাজা নন্দকুমারের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম পদ্মনাভ রায়। তিনি নবাবি আমলে রাজস্ব আদায়কারী হিসাবে কাজ করতেন। নবকৃষ্ণ নামে নন্দকুমারের একটি ভাই ছিল। এছাড়া তাঁর একটি বোনও ছিল। নন্দকুমারের স্ত্রীর নাম রানি ক্ষেমঙ্করী। তাঁর ছেলের নাম গুরুদাস রায়। এছাড়া তাঁর দুটি মেয়েও ছিল। নন্দকুমার ছোটবেলা থেকেই বুদ্ধিমান, সাহসী, পরিশ্রমী এবং উদ্যমী ছিলেন। পারিবারিকভাবে শাক্তপরম্পরার সঙ্গে যুক্ত হলেও তিনি বৈষ্ণব পণ্ডিত রাধামোহন ঠাকুরের কাছেও শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন।
মহারাজা নন্দকুমার গ্রামের টোলে পড়াশোনা করেন। তিনি সংস্কৃত, আরবি ও ফারসি ভাষা জানতেন। নন্দকুমার তাঁর বাবার কাছে জমিদারি হিসাব-নিকাশ, রাজস্ব আদায় ও প্রশাসনিক কূটকৌশলের প্রাথমিক পাঠ নেন।
এক নজরে মহারাজা নন্দকুমারের জীবনী:
- জন্ম: ১৭০৫
- মৃত্যু: ৫ আগস্ট, ১৭৭৫
- কেন বিখ্যাত: মুর্শিদাবাদের প্রখ্যাত দেওয়ান ও কূটনীতিবিদ। ওয়ারেন হেস্টিংসের দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদকারী এবং সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক বিতর্কিত রায়ে ফাঁসি হওয়া প্রথম ভারতীয়। এর পাশাপাশি শাক্ত পদাবলীর বিশিষ্ট রচয়িতা এবং বীরভূমের আকালীপুরের ঐতিহাসিক গুহ্যকালী মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা।
- স্বীকৃতি: পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় মহারাজা নন্দকুমারের স্মৃতিবিজড়িত এলাকার নাম হয়েছে নন্দকুমার। তাঁর স্মরণে বাসুদেবপুর মহারাজা নন্দকুমার উচ্চ বিদ্যালয় ও নন্দকুমার কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
মহারাজা নন্দকুমারের অসাধারণ প্রতিভার কথা জানতে পেরে মুর্শিদাবাদের তৎকালীন নবাব আলীবর্দী খাঁ তাঁকে হিজলি ও মহিষাদলের রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দেন। নন্দকুমার সিরাজউদ্দৌলার রাজত্বকালে হুগলির ফৌজদারির দায়িত্ব পান। ১৭৫৭ সালে রবার্ট ক্লাইভ ফরাসিদের ঘাঁটি চন্দননগর আক্রমণ করলে সিরাজউদ্দৌলা নন্দকুমারের নেতৃত্বে একটি বিশাল সেনাদল পাঠান। কিন্তু নন্দকুমার নবাবের বাহিনীকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় রেখে ইংরেজদের চন্দননগর দখল করতে সাহায্য করেন। অনেকের মতে, এই কাজের জন্য উমিচাঁদের মাধ্যমে ইংরেজদের থেকে তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ পান। চন্দননগর হাতছাড়া হওয়ার পর নবাব সিরাজউদ্দৌলা নন্দকুমারের উপর ক্ষুব্ধ হন।
পলাশির যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর রবার্ট ক্লাইভের সাথে নন্দকুমারের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হয়। তিনি মীরজাফরের অন্যতম প্রধান দেওয়ান হিসাবে কাজ শুরু করেন। ১৭৬০ সালে মীরজাফর সিংহাসনচ্যুত হওয়ার পর মহারাজা নন্দকুমার তাঁকে পুনরায় নবাব পদে ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগী হন। ১৭৬৩ সালে মীরজাফর পুনরায় ক্ষমতায় ফিরলে নন্দকুমার মুর্শিদাবাদে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পান এবং জায়গির ও রাজকোষের তত্ত্বাবধান করেন। সেই সময় তিনি মীরজাফরের অত্যন্ত বিশ্বস্ত সহযোগী ও প্রধান পরামর্শদাতা হিসাবে কাজ করতেন। মীরজাফরের অনুরোধে ১৭৬৪ সালে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম তাঁকে ‘মহারাজা’ উপাধি দেন।
১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করে। এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় তমলুকের রানি সন্তোষপ্রিয়া ও রানি কৃষ্ণপ্রিয়া তাঁদের জমিদারি হারান। পুনরায় জমিদারি ফিরে পাওয়ার জন্য তাঁরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে আবেদন করেন। এই সময় মহারাজা নন্দকুমার ও গঙ্গাগোবিন্দ সিংহের যৌথ প্রচেষ্টায় তাঁরা আবার নিজেদের অধিকার ফিরে পান। এই উপকারের পুরস্কারস্বরূপ তমলুকের রানিরা মহারাজা নন্দকুমারকে ছয়টি ও গঙ্গাগোবিন্দ সিংহকে আটটি গ্রাম উপহার দেন।
১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার দেওয়ানি লাভ করার সময় মহারাজা নন্দকুমার কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন। এই সময় লর্ড ক্লাইভ বাংলার রাজস্ব ও প্রশাসনিক কাজের জন্য মহারাজা নন্দকুমারের পরিবর্তে মোহাম্মদ রেজা খানকে প্রধান দেওয়ান হিসাবে নিযুক্ত করেন। আসলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তাদের মনে হয়েছিল যে, উচ্চাভিলাষী নন্দকুমার দেওয়ানির মত গুরুত্বপূর্ণ পদ পেলে নিজের দেশীয় স্বার্থ রক্ষায় তৎপর হবে। রেজা খানের উত্থান এবং নিজের প্রভাব কমে যাওয়ায় নন্দকুমারের সঙ্গে কোম্পানির সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
১৭৭২ সালে হেস্টিংস রেজা খানকে অপসারণের তদন্তে নন্দকুমারের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন; কোম্পানির নির্দেশেও নন্দকুমারের তথ্য ব্যবহারের কথা ছিল। তবে হেস্টিংস ও নন্দকুমারের মধ্যে এই সহযোগিতা ছিল স্বল্পস্থায়ী। রেজা খানের পতনের পর নন্দকুমার আশা করেছিলেন যে, ব্রিটিশ প্রশাসন তাঁকে কোনও গুরুত্বপূর্ণ পদে নিযুক্ত করবে। কিন্তু হেস্টিংস তাঁকে সেই মর্যাদা দেননি। আসলে হেস্টিংস তাঁকে কেবলমাত্র রেজা খানের বিরুদ্ধে তথ্য সংগ্রহের একটি মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করেন। এই অবিচারে ক্ষুব্ধ হয়ে নন্দকুমার ব্রিটিশ সুপ্রিম কাউন্সিলের তিন বিরোধী সদস্য — ফিলিপ ফ্রান্সিস, জন ক্লেভারিং এবং জর্জ মনসনের সাথে যোগাযোগ গড়ে তোলেন। ১৭৭৫ সালের মার্চ মাসে মহারাজা নন্দকুমার সুপ্রিম কাউন্সিলে ওয়ারেন হেস্টিংসের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে তিনি প্রমাণ সহ উল্লেখ করেন যে, মীরজাফরের নাবালক পুত্রের অভিভাবকত্ব প্রদানের বিনিময়ে হেস্টিংস মীরজাফরের বিধবা স্ত্রী মুন্নী বেগমের কাছ থেকে সাড়ে তিন লক্ষ টাকা উৎকোচ নিয়েছেন। সুপ্রিম কাউন্সিল নন্দকুমারের অভিযোগ গ্রহণ করে এবং হেস্টিংসকে দোষী সাব্যস্ত করে সেই অর্থ রাজকোষে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
এই ঘটনায় হেস্টিংস চরম অপমানিত বোধ করেন এবং নন্দকুমারকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য ভয়াবহ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। হেস্টিংসের প্ররোচনায় মোহন প্রসাদ নামক এক ব্যবসায়ী কলকাতার সুপ্রিম কোর্টে নন্দকুমারের বিরুদ্ধে পাঁচ বছর আগের (১৭৭০ সালের) একটি দলিল জালিয়াতির মামলা দায়ের করেন, যা ছিল মৃত বোলাকী দাসের উইল সম্পর্কিত।
এই অভিযোগের ভিত্তিতে মহারাজা নন্দকুমারকে গ্রেফতার করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি স্যার এলিজা ইম্পে ছিলেন হেস্টিংসের বাল্যবন্ধু। তিনি এই মামলায় চরম পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ করেন। যে ব্রিটিশ জালিয়াতি আইনের (Forgery Act of 1728) অধীনে নন্দকুমারের বিচার হয়, সেই আইন কোনভাবেই ভারতীয় প্রজাদের উপর প্রযোজ্য ছিল না এবং সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠার আগের ঘটনার উপর তা বলবৎ করার কোনও আইনি যুক্তি ছিল না। জুরিদের উপর অন্যায় চাপ সৃষ্টি করে নন্দকুমারকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। চরম অবিচার সত্ত্বেও নন্দকুমার আদালত কক্ষে শান্ত ও অবিচল ছিলেন। এই ঘটনাটিকে ভারতের ইতিহাসের প্রথম ‘আইনি হত্যা’ (Judicial Murder) হিসাবে গণ্য করা হয়। পরবর্তীতে এই অন্যায় বিচার ও হত্যার জন্য ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এডমন্ড বার্ক ও লর্ড মেকলে হেস্টিংস ও ইম্পের তীব্র সমালোচনা করেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক ইমপিচমেন্ট আনা হয়।
একজন সুদক্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তার পাশাপাশি মহারাজা নন্দকুমার ছিলেন একজন একনিষ্ঠ ধার্মিক মানুষ। তিনি তাঁর জন্মস্থান ভদ্রপুর গ্রামে বিভিন্ন দেব-দেবীর মন্দির স্থাপন করেন। ১৭৭৫ সালের প্রথম দিকে ব্রাহ্মণী নদীর তীরে বীরভূম জেলার নলহাটির কাছে আকালীপুর গ্রামে বিখ্যাত গুহ্যকালীর মূর্তি স্থাপন ও মন্দির নির্মাণের কাজ শুরু করেন। তবে তাঁর জীবদ্দশায় মন্দিরের কাজ শেষ হয়নি। পরবর্তীকালে তাঁর পুত্র ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা এই মন্দিরের কাজ সম্পূর্ণ করেন। তন্ত্রসম্মত উপায়ে প্রতিষ্ঠিত আকালীপুরের এই ঐতিহাসিক ও জাগ্রত কালী মন্দিরে প্রতি বছর ধুমধাম করে পুজো করা হয়। এই সময় হাজার হাজার ভক্ত এখানে আসে।
মহারাজা নন্দকুমার মা কালী ও দেবী দুর্গাকে উৎসর্গ করে বেশ কিছু ভক্তিগীতি রচনা করেন। ‘বিহরে রণে কে রে বামা মৃগেন্দ্রবাহনে!’, ‘অকারণে বৃথা ভ্রমে ভ্রমি কাল যায়’, ‘আপন তনয়ে দয়া না করিলে ত্রিজগত-অম্বে’ ইত্যাদি তাঁর রচিত বিখ্যাত শাক্তপদ।
মহারাজা নন্দকুমারের স্মৃতিবিজড়িত বাসুদেবপুর এলাকার প্রাচীন নন্দকুমারের হাট ও দেওয়ান পুকুরকে কেন্দ্র করেই সম্পূর্ণ এলাকার নাম হয়েছে নন্দকুমার। বর্তমানে এটি পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুর জেলার একটি বিখ্যাত অঞ্চল। এছাড়া নন্দকুমারের স্মরণে বাসুদেবপুর মহারাজা নন্দকুমার উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ২০০৩ সালে তমলুক-দিঘা রেলপথ চালু করার সময় নন্দকুমার রেল স্টেশনটি তৈরি হয়। ২০০৭ সালে পূর্ব মেদিনীপুরে মহারাজা নন্দকুমার কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়। বর্তমানে এই কলেজটি বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত। কলকাতার বরানগরের একটি রাস্তার নাম মহারাজা নন্দকুমার রোড।
১৯৮৮ সালে শ্যাম বেনেগাল প্রযোজিত ও পরিচালিত দূরদর্শনের বিখ্যাত ধারাবাহিক ‘ভারত এক খোঁজ’ -এ মহারাজা নন্দকুমারের নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন প্রখ্যাত টেলিভিশন অভিনেতা রাজেন্দ্র গুপ্ত। মহারাজা নন্দকুমারের ফাঁসি এবং ব্রিটিশদের আইনি চক্রান্তের অধ্যায়টি তিনি চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হন।
১৭৭৫ সালের ৫ আগস্ট কলকাতার কুলি বাজারে (বর্তমান হেস্টিংস অঞ্চলের কাছে বিদ্যাসাগর সেতুর সন্নিকটে) গঙ্গাতীরে মহারাজ নন্দকুমারকে প্রকাশ্যে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। সেদিন এক সম্ভ্রান্ত ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্রাহ্মণের ফাঁসি দেখে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ হাহাকার করে গঙ্গায় ডুব দিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করেছিল।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান