খেলা

মাইকেল ফেল্পস

মাইকেল ফেল্পস (Michael Phelps) একজন কিংবদন্তিসম আমেরিকান সাঁতারু যিনি অলিম্পিক গেমসের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সাঁতারু হিসেবে বিখ্যাত হয়ে আছেন। আধুনিক অলিম্পিকের ইতিহাসে তাঁকে সর্বকালের সফলতম ক্রীড়াবিদ হিসেবে গণ্য করা হয়। ২০০৪-২০১৬ অবধি চারটি অলিম্পিক প্রতিযোগিতায় ফেল্পসের মোট প্রাপ্ত পদকের সংখ্যা আঠাশ। আধুনিক অলিম্পিকের ইতিহাসে তিনিই একমাত্র ক্রীড়াবিদ যিনি আরেক আমেরিকান সাঁতারু মার্ক স্পিতজের অলিম্পিকের ইতিহাসে কোন এক ব্যক্তি দ্বারা একটি ইভেন্টে সর্বাধিক সাতটি পদক জয়ের রেকর্ড ভেঙে আটটি পদক জেতেন। বিশ্বের একমাত্র ক্রীড়াবিদ হিসেবে তাঁর সংগ্রহে তেইশটি অলিম্পিক স্বর্ণপদক রয়েছে। এখনো পর্যন্ত একুশটি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের জনক মাইকেল ফেল্পস ক্রীড়াজগতে সত্যই এক বিস্ময়।

১৯৮৫ সালের ৩০ জুন আমেরিকার মেরিল্যাণ্ডের অন্তর্গত বাল্টিমোর শহরে মাইকেল ফেল্পসের জন্ম হয়। তাঁর প্রকৃত নাম মাইকেল ফ্রেড ফেল্পস দ্বিতীয়। তাঁর বাবা মাইকেল ফ্রেড ফেল্পস একজন অবসরপ্রাপ্ত মেরিল্যাণ্ড স্টেট ট্রুপার ছিলেন। উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াকালীন তাঁর বাবা মাইকেল ফ্রেড ফুটবল খেলতেন এবং ১৯৭০ সাল নাগাদ ওয়াশিংটন ফুটবল দলের সদস্য হয়েছিলেন। তাঁর মা ডেবোরা শ্যু ফেল্পস ওরফে ডেব্বি ফেল্পস মিড্‌ল স্কুলের অধ্যক্ষা ছিলেন। ফেল্পস ছিলেন তাঁর বাবা-মায়ের তিন সন্তানের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। বাল্টিমোরে জন্মালেও নিকটবর্তী রজার্স ফোর্জে ফেল্পস বড় হয়ে ওঠেন। ১৯৯৪ সালে তাঁর বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ ঘটে এবং ২০০০ সালে ফেল্পসের বাবা পুনর্বিবাহ করেন। সাত বছর বয়স থেকেই মাইকেল ফেল্পস মা এবং তাঁর বোনেদের উৎসাহে লয়োলা হাই স্কুলের সুইমিং পুলে সাঁতার শিখতে শুরু করেন কোচ বব বাওম্যানের কাছে। এরপরে তিনি ভর্তি হন নর্থ বাল্টিমোর অ্যাকোয়াটিক ক্লাবে। দশ বছর বয়সেই তাঁর বয়সী সাঁতারুদের মধ্যে তিনি জাতীয় রেকর্ড তৈরি করে সাড়া ফেলে দেন।

স্থানীয় স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় মাইকেল ফেল্পসের এবং ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়েই তাঁর মধ্যে এডিএইচডি (ADHD) অর্থাৎ অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপার অ্যাক্টিভিটি ডিসঅর্ডার (Attention Deficit Hyperactivity Disorder) ধরা পড়ে। প্রথাগত পড়াশোনা তাঁর বেশিদূর এগোয়নি। ২০০৩ সালে টাওসন হাই স্কুল থেকে তিনি স্নাতক উত্তীর্ণ হন।

অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে আয়োজিত ২০০০ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক্সে মাত্র পনেরো বছর বয়সে তিনি সাঁতারু হিসেবে নির্বাচিত হয়ে অলিম্পিকের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ আমেরিকান হিসেবে রেকর্ড করেন। ২০০১ সালের ৩০ মার্চ ‘ওয়ার্ল্ড অ্যাকোয়াটিক চ্যাম্পিয়নশিপ’-এর ট্রায়ালে ২০০ মিটার বাটারফ্লাই সাঁতারে সর্বকনিষ্ঠ পুরুষ হিসেবে মাত্র ১৫ বছর ৯ মাস বয়সে বিশ্বরেকর্ড গড়েন মাইকেল ফেল্পস। ২০০২ সালে জাপানের ইয়োকোহামাতে আয়োজিত ‘প্যান প্যাসিফিক সুইমিং চ্যাম্পিয়নশিপ’-এ দুটি স্বর্ণপদক এবং তিনটি রৌপ্য পদক জেতেন ফেল্পস। এটা ছিল তাঁর প্রথম আন্তর্জাতিক পদকজয়। ঠিক এর পরের বছর ২০০৩ সালের ‘ওয়ার্ল্ড অ্যাকোয়াটিক চ্যাম্পিয়নশিপ’-এ মাইকেল ফেল্পস চারটি স্বর্ণপদক এবং দুটি রৌপ্য পদক অর্জন করেন এবং একইসঙ্গে পাঁচটি নতুন বিশ্বরেকর্ড গড়েন। এথেন্সে আয়োজিত ২০০৪ সালের অলিম্পিক গেমসে মাইকেল ফেল্পস ৬টি স্বর্ণপদক এবং ২টি ব্রোঞ্জের পদক জিতে এক ক্রীড়া-তারকায় পরিণত হন। ৪০০ মিটার মেডলে, ২০০ মিটার বাটারফ্লাই, ১০০ মিটার বাটারফ্লাই, ৪x২০০ মিটার ফ্রি-স্টাইল রিলে এবং ৪x১০০ মিটার মেডলে রিলে সবকটি ক্ষেত্রেই জয়লাভ না করলেও নিজের পূর্বতন রেকর্ড ভাঙেন তিনি।

বেজিং-এ অনুষ্ঠিত ২০০৮ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক্সে ফেল্পস তাঁর সাঁতার জীবনের চোদ্দতম স্বর্ণপদক লাভ করেন। এর আগে ১৯৭২ সালে মার্ক স্পিতজের সাতটি স্বর্ণপদক অর্জনের রেকর্ড ভেঙে একটি অলিম্পিকে আটটি স্বর্ণপদক জিতে তিনি নতুন এক বিশ্ব-রেকর্ড গড়েন। ২০১২ সালে লণ্ডনের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে ফেল্পস আরো চারটি স্বর্ণপদক জয় করে মোট ২২টি অলিম্পিক পদকের অধিকারী হন যা জিমন্যাস্ট ল্যারিসা ল্যাটিনিয়া’র ১৮টি পদকজয়ের রেকর্ড ভেঙে দেয়। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য প্রতিটি অলিম্পিকের ট্রায়ালেও তাঁর প্রদর্শিত দক্ষতা ছিল স্মরণীয়। এরপর কার্যত সাঁতারজীবন থেকে প্রাথমিকভাবে অবসর নেন মাইকেল ফেল্পস। কিন্তু অবসর ভেঙে পুনরায় ২০১৪ সালে উত্তর ক্যারোলিনার এরিনা গ্র্যাণ্ড প্রিক্স-এ ১০০ মিটার বাটার ফ্লাই প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করে জয়লাভ করেন। ড্রাগ সেবন করে সাঁতার কাটার কারণে ২০১৫ সালের ‘ওয়ার্ল্ড অ্যাকোয়াটিক চ্যাম্পিয়নশিপ’ থেকে তাঁর নাম বাদ পড়ে। ২০১৬ সালের ৭ আগস্ট রিও-ডি-জেনিরোতে অনুষ্ঠিত অলিম্পিকে উনিশতম অলিম্পিক স্বর্ণপদক জিতে নতুন রেকর্ড গড়েন ফেল্পস। ৪০০ মিটার ফ্রি-স্টাইল রিলে’র পাশাপাশি ২০০ মিটার বাটারফ্লাই এবং ৪x২০০ মিটার ফ্রি-স্টাইল রিলে প্রতিযোগিতাতেও তিনি স্বর্ণপদক পান। ৪x১০০ মিটার মেডলে সাঁতার প্রতিযোগিতায় আমেরিকার পক্ষ থেকে স্বর্ণপদক জয়ের পর উপস্থিত সমস্ত দর্শক তাঁকে ইতিহাসের সেরা অলিম্পিয়ান হিসেবে উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করেছিল।

মাইকেল ফেল্পস তাঁর প্রশিক্ষক বব বাওম্যানের সঙ্গে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বেচ্ছাসেবী সহকারী প্রশিক্ষক হিসেবে বহুদিন যুক্ত ছিলেন। বাওম্যানের কাছে প্রশিক্ষণ নেবার জন্যে বাওম্যান যেখানে যেখানে কর্মসূত্রে গিয়েছেন, সেখানেই ছুটে গিয়েছেন ফেল্পস। এমনকি বাল্টিমোরের নর্থ বাল্টিমোর অ্যাকোয়াটিক ক্লাবের সিইও হিসেবে যখন বব বোম্যান ডাক পান, ফেল্পসও তাঁর সঙ্গেই প্রশিক্ষণ নিতে বাল্টিমোর ক্লাবে ভর্তি হন। সাঁতারের প্রতি এতটাই ছিল তাঁর একাগ্রতা।

২০০৮ অলিম্পিকে ফেল্পসের এই অতিমানবিক সাফল্যের পেছনে কোন নিষিদ্ধ ড্রাগ দায়ী। পরবর্তী সময়ে এই গুজব সম্পূর্ণ মিথ্যে বলে প্রমাণিত হয় যখন অলিম্পিক কমিটি কর্তৃক নয়টি পরীক্ষাতে কোনো ডোপিংয়ের প্রমাণ মেলেনি ফেল্পসের দেহে। ২০১৭ সালে হাঙর-সপ্তাহ উপলক্ষে বিশেষ পদ্ধতিতে মাইকেল ফেল্পস হ্যামারহেড হাঙর, শ্বেত হাঙর প্রভৃতি সামুদ্রিক জলচর প্রাণীদের সাথে সাঁতার প্রতিযোগিতা করেন এবং দেখা যায় যে সবথেকে কমগতিসম্পন্ন রিফ্‌ হাঙরকে ০.২ সেকেণ্ডে হারিয়েছেন মাইকেল ফেল্পস। সেই সময় তাঁর সাঁতারের গতিবেগ ছিল প্রতি ঘন্টায় প্রায় ৬ মাইল।

২০১০ সালে তাঁরই উদ্যোগে গড়ে ওঠে মাইকেল ফেল্পস ফাউণ্ডেশন এবং মাইকেল ফেল্পস সুইম স্কুল। আগ্রহী ছেলে-মেয়েদের সাঁতারের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন মাইকেল ফেল্পস। শুধুই সাঁতারের দক্ষতা নয়, বরং নিজের সাঁতারজীবনের শিক্ষা আর অভিজ্ঞতা জানাতে মাইকেল ফেল্পস ২০০৮ সালে প্রথম বই লেখেন ‘বিনিথ দ্য সার্ফেস : মাই স্টোরি’ (Beneath The Surface : My Story) নামে। এর ঠিক পরের বছরই ‘নো লিমিটস : দ্য উইল টু সাক্সিড’ (No Limits : The Will to Succeed) নামে তাঁর আরেকটি বই প্রকাশ পায়।

অলিম্পিকের স্বর্ণপদক ছাড়াও ‘স্পোর্টস ইলাস্ট্রেটেড’ পত্রিকা ২০০৮ সালে মাইকেল ফেল্পসকে বছরের সেরা ক্রীড়াব্যক্তিত্ব হিসেবে সম্মানিত করে। তাছাড়া ২০০৪, ২০০৫, ২০০৮, ২০০৯ এবং ২০১৩ সালে তিনি পেয়েছেন লরিয়াস স্পোর্টসম্যান অফ দ্য ইয়ার অ্যাওয়ার্ড। ২০১৬ সালে সেই বছরের পুরুষ সাঁতারু হিসেবে মাইকেল ফেল্পস পেয়েছিলেন সুইমসোয়াম সোয়্যামি অ্যাওয়ার্ড। বহুবার গোল্ডেন গগ্‌ল পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। ফিনা (FINA)-র পরিসংখ্যান অনুযায়ী মোট ৩৯টি বিশ্ব-রেকর্ড এবং ২১টি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের অধিকারী মাইকেল ফেল্পস।

ক্রীড়াজীবন থেকে সম্পূর্ণ অবসর নিয়ে ৩৬ বছর বয়সী মাইকেল ফেল্পস এখন পুরোপুরি প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজে নিয়োজিত।

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

শুধুমাত্র খাঁটি মধুই উপকারী, তাই বাংলার খাঁটি মধু খান


ফুড হাউস মধু

হোয়াটস্যাপের অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন