ভারতবর্ষের প্রথম দলিত সম্প্রদায়ভুক্ত মহিলা লেখক হিসেবে পরিচিত মুক্তা সালভে (Mukta Salve)। মহারাষ্ট্রের ‘মাং’ নামের এক নিম্নবর্ণের সমাজে জন্মেছিলেন মুক্তা। সমাজের অন্য স্তরের মানুষদের কাছে সেই মাং সম্প্রদায়ের মানুষেরা ছিল অস্পৃশ্য। সাবিত্রীবাঈ ও জ্যোতিবা ফুলের স্থাপিত স্কুলে অন্য সকল সম্প্রদায়ের মহিলাদের পাশাপাশি মুক্তা সালভে লিখতে ও পড়তে শিখেছিলেন। বলা হয়, মাং তথা মাতং সম্প্রদায়ের তিনিই প্রথম মহিলা যিনি স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। মাত্র ১৪ বছর বয়সেই তিনি লিখে ফেলেন তাঁর অন্যতম বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘অ্যাবাউট দ্য গ্রিফ অফ মাং’স অ্যাণ্ড মাহারস’ যেখানে হিন্দু সমাজের প্রবল বর্ণ-বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলেন মুক্তা সালভে। বইটির আসল নাম ছিল ‘মাং মাহারাঞ্ছা দুখাভিসাথা’। এই প্রবন্ধের মধ্য দিয়ে তাঁদের দুরবস্থা ও অমানুষিক জীবনযাপন পদ্ধতির কথা উঠে আসে। কোন দলিত মহিলার লেখা প্রথম রচনা হিসেবে মুক্তা সালভের এই প্রবন্ধ ইতিহাসখ্যাত হয়ে আছে। বহু অনুবাদ হয়েছে এই রচনাটির এবং উনিশ শতকের রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের লিঙ্গ বৈষম্য ও বর্ণ বৈষম্যের বিরুদ্ধে মুক্তা সালভের লেখা এই প্রবন্ধটি ছিল এক তীব্র জেহাদ।
মহারাষ্ট্রের মাং তথা মাতং নামের এক নিম্নবর্ণের সমাজে মুক্তা সালভের জন্ম হয়েছিল। বর্ণবিভাজনের নিরিখে এই সম্প্রদায় ছিল অচ্ছ্যুৎ ও অস্পৃশ্য। তাঁর ঠাকুরদাদার নাম ছিল লাহুজি সালভে।
১৮৫২ সালের আগে তিনি কোনো প্রকার শিক্ষাগ্রহণ করতে পারেননি। ঐ বছর জ্যোতিবা ফুলে এবং সাবিত্রীবাঈ ফুলে দলিত ও অস্পৃশ্য সম্প্রদায়ের নারীদের শিক্ষার উদ্দেশ্যে পুনের বেতাল পীঠে তৃতীয় একটি বিদ্যালয় চালু করেন। এই বিদ্যালয়েই অন্য সকল সম্প্রদায় ও বর্ণের মহিলাদের পাশাপাশি মুক্তা সালভেও শিক্ষাগ্রহণ করতে থাকেন। তিন বছর বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেই মাত্র ১৪ বছর বয়সে মুক্তা সালভে তাঁর সেই বিখ্যাত প্রবন্ধটি লিখে ফেলেন যার নাম ‘‘মাং মাহারাঞ্ছা দুখাভিসাথা’ অর্থাৎ ‘অ্যাবাউট দ্য গ্রিফ অফ মাং’স অ্যাণ্ড মাহারস’। মাহার ও মাতং সম্প্রদায়ের উপর সমাজের যে অত্যাচার তার ছবি উঠে এসেছে এই প্রবন্ধে। সামান্য এক ছাত্রী হিসেবে তাঁর এই প্রবন্ধ লেখার জন্য মেজর ক্যাণ্ডি তাঁকে সম্মানিত করেছিলেন। মেজর ক্যাণ্ডির সামনে এবং আরো হাজার তিনেক মানুষের উপস্থিতিতে মুক্তা সালভে তাঁর লেখা ‘ধর্ম’ প্রবন্ধটিও পড়ে শুনিয়েছিলেন। মাহার ও মাতংদের জমি কেড়ে নিয়ে উচ্চবর্ণের মানুষদের অট্টালিকা বানানো হত। পেশোয়া বাজীরাও-এর সময় এদের উপর অত্যাচারের মাত্রা আরও বেড়ে গিয়েছিল। সমাজে অচ্ছ্যুত ও অস্পৃশ্য ছিল তাঁরা। দলিত নারীদের পক্ষে এই সমস্যা ছিল আরও ভয়ানক। মাথার উপর ছাদ ছিল না তাঁদের, ছিল না সঙ্কটকালীন পরিস্থিতিতে ডাক্তারের সুব্যবস্থাও। অথচ এরই মধ্যে সন্তানের জন্ম দিতে হত সেইসব দলিত নারীদের। কিন্তু শুধুমাত্র দলিত নারীদের এই সমস্যার ছবি তুলে আনাই মুক্তার কাজ ছিল না। হিন্দুধর্মের বৈধতা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন তাঁর এই বইতে। হিন্দু সমাজের মধ্যে তাঁর কোন প্রবেশাধিকারই ছিল না, অথচ তা সত্ত্বেও এই ধর্ম পালন করতে হত তাঁকে। মাতংদের খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা এবং বাসস্থানের চাহিদা থেকে বঞ্চিত করে কীভাবে উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণরা ধর্মকে নিজের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করেছে সে কথাও মুক্তা তাঁর এই প্রবন্ধে তুলে ধরেছেন। সমাজে ক্ষমতা বজায় রাখার জন্য ধর্মকে হাতিয়ার করেছিল উচ্চবর্ণীয় ব্রাহ্মণরা। কোনো উচ্চবর্ণীয় ব্রাহ্মণের বাড়ির সামনে খেলতে পারতো না মাং সম্প্রদায়ের ছেলে-মেয়েরা। কোন দলিত মানুষ যদি একটু ভালো জামা-কাপড় পরতো, তাহলে বলা হত যে তারা সেটা চুরি করে এনেছে। উচ্চবর্ণীয়দের অট্টালিকা আর দূর্গের নীচে চাপা পড়াই তাঁদের নিয়তি ছিল। ব্রাহ্মণদের কাছে অত্যাচারের শিকার হলে মাং, মাতং বা মাহারদের ছেলে-মেয়েরা নালিশ জানাতে পারত না, কারণ দিনের শেষে সেই উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণদের দরজায় উচ্ছিষ্ট সংগ্রহের জন্য দাঁড়াতে হত তাদের। মুক্তা বুঝতে পেরেছিলেন যে জ্ঞানার্জনের মাধ্যমেই একমাত্র এই নিয়ন্ত্রণের বিরোধিতা করা যাবে এবং তার ফলে দলিত সম্প্রদায়ের উন্নতি হবে। মাত্র তিন বছর পড়াশোনা করেই দলিতদের ভবিষ্যৎ গঠনের স্বার্থে কাজ করতে শুরু করেন মুক্তা সালভে। ১৮৫৫ সালে একটি মারাঠি পত্রিকা ‘দ্যানোদয়া’তে প্রথম মুক্তার এই প্রবন্ধ ছাপা হয়েছিল। এই প্রবন্ধের একটি অংশ ১৮৬৮ সালে এন. ভি. যোশীর লেখা ‘ডেসক্রিপশন অফ পুনে সিটি’ বইতে স্থান পেয়েছিল। পরবর্তীকালে এই প্রবন্ধটি ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়ে ১৯৯১ সালে শশী থারুর ও কে. ললিতা সম্পাদিত ‘ওমেন রাইটিং ইন ইণ্ডিয়া : ৬০০ বিসি টু প্রেসেন্ট’ বইতে ছাপা হয়।
মুক্তা সালভের এই প্রবন্ধ লেখার প্রায় ১০০ বছর পরে ১৯৫০ সাল নাগাদ ভারতে দলিত সাহিত্য নামে পৃথক এক সাহিত্য ধারার জন্ম হয়েছে। ফলে এর আগে মুক্তা সালভের জীবনবৃত্তান্ত এবং সাহিত্যকর্ম বিষয়ে আর বিশেষ কিছু জানা যায় না। মুক্তা সালভে বিশ্বাস করতেন যে শুধুমাত্র সাক্ষরতার মধ্যেই শিক্ষা সীমাবদ্ধ নয়। বরং শিক্ষা হল জ্ঞানার্জনের এক উপায় যার দ্বারা সমাজে ঘটে চলা পক্ষপাত এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো সম্ভব।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান