ইতিহাস

সাবিত্রীবাঈ ফুলে

ভারতে নারী শিক্ষার প্রসার ও প্রচারে যে সব ব্যক্তিত্ব অগ্রগণ্য ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম অগ্রগণ্যা হলেন সাবিত্রীবাঈ ফুলে। ব্রিটিশ ভারতে নারীর অধিকার রক্ষায় তাঁর কর্মকাণ্ড ও ভূমিকা অপরিসীম।

১৮৩১ সালের ৩ জানুয়ারি পুণে থেকে প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে মহারাষ্ট্রের সাতারা জেলার নয়গাঁও গ্রামে সাবিত্রীবাঈ ফুলে’র জন্ম হয়। তাঁর মায়ের নাম লক্ষ্মী এবং বাবার নাম খান্দোজি নেভেশে পাটেল। তাঁরা জাতে ছিলেন মালি সম্প্রদায়ের বর্তমানে যেটি ও.বি.সি শ্রেণির মধ্যে অন্তর্ভূক্ত। বাবা-মায়ের  জ্যেষ্ঠ কন্যা সাবিত্রীবাঈ মাত্র নয় বছর বয়সে তেরো বছর বয়সী জ্যোতিরাও ফুলে-কে বিয়ে করেন। ফুলে দম্পতি নিঃসন্তান ছিলেন। নিজস্ব কোনও সন্তান না থাকায় পরবর্তীকালে ফুলে দম্পতি দত্তক নিয়েছিলেন এক ব্রাহ্মণ বিধবার পুত্রকে, যার নাম ছিল যশবন্ত রাও।

সাবিত্রীবাঈয়ের বিয়ের সময় প্রাথমিক শিক্ষাটুকুও ছিল না। উনিশ শতকের ব্রাহ্মণ্য প্রথার বাড় বাড়ন্তের সেই সময়ে, নিম্ন বর্গীয় আম জনতাদের পড়াশোনা করার অনুমতি ছিল না। কিন্তু সাবিত্রীবাঈ-এর স্বামী, জ্যোতিরাও ফুলে তাঁর স্ত্রী-কে শিক্ষিত করে তোলার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন। সেই কারণে বিয়ে পরবর্তী সময় থেকেই জ্যোতিরাও ফুলে বাড়িতেই স্ত্রী সাবিত্রীবাঈ-কে শিক্ষিত করে তোলবার সংকল্প নেন এবং নিজেই বাড়িতে নানান বিষয়ে পাঠ দিতে শুরু করেন। জ্যোতিরাও ফুলে বিশ্বাস করতেন যে, তাঁর স্ত্রী পারিপার্শ্বিক অন্যান্য মহিলাদেরকেও শিক্ষিত করে তুলতে পারবেন এবং এর মাধ্যমেই ভারতের বুকে এক নারী নবজাগরণ গড়ে উঠবে। তাই, শুধু পড়াশুনাই নয়, অধ্যয়নের পাশাপাশি তাঁর স্বামী তাঁকে শিক্ষকতার পাঠ-ও দিতে থাকলেন। নিজস্ব পড়াশুনা এবং শিক্ষকতার প্রশিক্ষণ শেষে সাবিত্রীবাঈ আশেপাশের অল্পবয়সী মহিলাদের পড়াতে শুরু করলেন। এর পাশাপাশি, সাবিত্রীবাঈ একের পর এক সমাজ সংস্কারের কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও নিজেকে জড়িয়ে নিতে লাগলেন।

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন সাবিত্রীবাঈ ফুলে। অসাধারণ কাব্য প্রতিভার অধিকারী ছিলেন তিনি। জীবদ্দশায় বেশ কিছু অসামান্য কবিতা তিনি লিখেছিলেন যার মাধ্যমে তিনি তুলে ধরেছিলেন নারী শিক্ষার গুরুত্ব এবং অপরিহার্যতা। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা দুইটি। ১৮৫৪ সালে প্রকাশিত হয় ‘কাব্য ফুলে’ এবং ১৮৯২ সালে প্রকাশিত হয় ‘বভন কাশি সুবোধ রত্ন‌কর’। সাধারণ নারীদের নারীশিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে সমাজের অভ্যন্তরে এক নতুন আন্দোলন তিনি আনতে চেয়েছিলেন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজকে বোঝাতে চেয়েছিলেন, এক জন নারী সর্বাগ্রে শিক্ষিত হলেই তাঁর সন্তান পরবর্তীকালে আরও বেশি শিক্ষিত হয়ে উঠতে পারে। সমাজ সংস্কারক  হিসেবে, সাবিত্রীবাঈ ফুলের নানান কর্মকাণ্ড রয়েছে। তাঁর মধ্যে অন্যতম হল ধর্ষিতা ও অসহায় মহিলাদের জন্য তিনি একটি সেবাকেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন যার মাধ্যমে অসহায় বিধবা মহিলাদের তিনি সেবা প্রদান করতেন। এছাড়াও তাঁদের আর্থিক স্বচ্ছলতার দিকেও তিনি জোর দিয়েছিলেন। উনবিংশ শতকে দাঁড়িয়েও তিনি জাত-পাত, গোত্র ও লিঙ্গ ভিত্তিক বৈষম্যের প্রতি প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন, প্রয়োজনে চালিয়ে গেছেন জনসচেতনতামূলক প্রচার।

১৮৪৮ সালে সাবিত্রীবাঈ ফুলে এবং তাঁর স্বামী জ্যোতিরাও ফুলে মহারাষ্ট্রের পুণের ভিডেওয়াড়াতে নারীদের জন্য ভারতের প্রথম বালিকা বিদ্যালয় চালু করেছিলেন। সেখানে তিনি প্রধান শিক্ষিকা রূপে সবার স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে শুধুমাত্র নারীদের জন্যই তিনি জীবদ্দশায় মোট আঠারোটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন যা ভারতীয় শিক্ষা জগতে এক যুগান্তকারী ঘটনা। সাবিত্রীবাঈ প্রতিষ্ঠিত সেই সব বালিকা বিদ্যালয়গুলিতে কোনও বর্ণাশ্রম প্রথা বা শ্রেণি ও ধর্মের ভেদাভেদ ছিল না। ভারতের প্রথম মহিলা শিক্ষিকা ছিলেন সাবিত্রীবাঈ ফুলে। এসব ছাড়াও, সাবিত্রীবাঈয়ের উদ্যোগে গ্রামীণ নারীদের মধ্যে সচেতনতা জাগাতে এবং তাদের অধিকারের গুরুত্ব বোঝাবার জন্য ‘মহিলা সেবা মন্ডল’ স্থাপিত হয়েছিল। অস্পৃশ্যতাকে দূর করতে নিজের বাড়ির কুয়ো তিনি সব জাতের মানুষদের জন্য ছেড়ে দিয়েছিলেন। উঁচু—নিচু সব জাতের মানুষ সেখান থেকে জল নিতে পারতেন। স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীদের চুল কেটে শোক পালনের কু প্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে তিনি ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিলেন। 

সাবিত্রীবাঈ চেয়েছিলেন এক কুসংস্কারমুক্ত সমাজ। যে কারণে তিনি বিশেষভাবে চাইতেন চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতি। সেই প্রকল্পের উন্নতিসাধনের জন্য তিনি তাঁর সাধ্যমত চিকিৎসা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে কাজ করেছিলেন। বিউবনিক প্লেগে আক্রান্তদের চিকিৎসা করার জন্য সাবিত্রীবাঈ তাঁর দত্তক পুত্র যশবন্তকে সঙ্গে নিয়ে ১৮৯৭ সালে পুণে শহরে একটি ক্লিনিক চালু করেছিলেন। এছাড়াও চিকিৎসা সংক্রান্ত নানান জন সচেতনামূলক প্রচার তিনি চালিয়ে গেছেন।

বিউবনিক প্লেগে আক্রান্তদের সেবা করার সময় তিনি নিজেই বিউবনিক প্লেগে আক্রান্ত হন এবং ১৮৯৭ সালের ১০ মার্চ তাঁর মৃত্যু হয়।

সাবিত্রীবাঈ এখনও তাঁর যোগ্য সম্মান পাননি। যদিও তাঁর সম্মানে পুনে সিটি কর্পোরেশন ১৯৮৩ সালে একটি স্মৃতি স্মারক স্থাপন করে। পুনে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ২০১৫ সালে পরিবর্তন করে ‘সাবিত্রীবাঈ ফুলে পুনে বিশ্ববিদ্যালয়’ নামকরণ করা হয়। ভারতীয় ডাক বিভাগ ১৯৯৮ সালে ফুলের সম্মানে একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করে।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top
error: Content is protected !!

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন