পৃথিবীতে থেকে পৃথিবীর বাইরের মহাশূন্যের অসীম অপার রহস্য জানার আগ্রহ মানুষের চিরকালের। গ্যালিলিওর টেলিস্কোপ আবিষ্কারের পর মানুষ দূর-দূরান্তের গ্রহ-গ্রহাণু দেখে বুঝতে চেয়েছে এই সৌরজগত, এই মহাবিশ্বের চেহারাটা আসলে ঠিক কেমন! সেই সময় থেকেই শুরু হয়েছিল মানুষের মহাকাশ-গবেষণা। পৃথিবী ছাড়াও এই সৌর পরিবারের অন্যান্য গ্রহগুলির সম্পর্কে মানুষ জানতে শুরু করেছিল, কিন্তু পৃথিবীর বাইরে পা রাখবে সে একথা কেউ কল্পনাতেও আনেনি সেদিন। পৃথিবীর প্রতিটি রাত্রিকে যে চাঁদ সুন্দর জ্যোৎস্নার শোভায় ভরিয়ে তোলে, সেই চাঁদের মাটিতে পা রাখার কথা মানুষ ভেবেছিল কোনও এক দিন। পৃথিবীর মাটি থেকে দেখা চাঁদের কলঙ্ক আসলে যে সত্যিই চাঁদের উঁচু-নিচু পাহাড়, গর্ত, গভীর গহ্বর তা নিজের চোখে পরখ করে দেখার অসীম আগ্রহ থেকেই শুরু হয় চন্দ্র অভিযানের প্রয়াস। প্রথমে শুধু পরীক্ষামূলক মহাকাশযান উৎক্ষেপণের মাধ্যমে চাঁদের প্রকৃতি-পরিবেশ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে বিশ্বের বহু দেশ। রাশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফলভাবে চাঁদে মহাকাশযান পাঠাতে সক্ষম হয়েছে, কিন্তু তাতে মানুষ ছিল না। সেই থেকেই শুরু হয় মানুষের চন্দ্র অভিযান বা মুন মিশন (Moon Mission)।
১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই দুই মার্কিন মহাকাশচারীকে দেখার জন্য পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ লোকের দৃষ্টি স্থির নিবদ্ধ ছিল টেলিভিশনের পর্দায়। বিশালাকায় স্পেস-স্যুট আর অক্সিজেন মাস্ক পরে চাঁদের মাটিতে সেদিন প্রথম অবতরণ করেছিলেন দুটি মানুষ – নীল আর্মস্ট্রং এবং এডউইন অলড্রিন। মানুষের জন্য সেই পদক্ষেপ ক্ষুদ্র হলেও, সমগ্র মানব জাতির কাছে তা ছিল এক বিশাল লাফ। এই যাত্রা শুরু হয়েছিল অনেক আগে থেকেই। ১৯৫৭ সালেই রাশিয়া প্রথম স্পুটনিক ১ নামে একটি কৃত্রিম উপগ্রহ মহাকাশে পাঠাতে সফল হয়, তারপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও সেই পথে অনেকটাই সাফল্য অর্জন করে। পরে মহাকাশে মানুষকে পাঠানোর চেষ্টাও শুরু করেছিল এই দুই দেশ। ১৯৬১ সালের ১২ এপ্রিল প্রথম রাশিয়ার ইউরি গ্যাগারিন মহাকাশে যান। এর ঠিক এক মাসের মধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালান শেফার্ড প্রথম মার্কিন মহাকাশচারীর শিরোপা পান। এই সময়েই মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি ঘোষণা করেন যে ‘নাসা’-র পক্ষ থেকেই আগামী ১০ বছরের মধ্যেই চাঁদে সফলভাবে মানুষকে পাঠানো হবে। এরপরেই ১৯৬৯ সালের ১৬ জুলাই মহাকাশযান ‘অ্যাপোলো ১১’-তে তিনজন মহাকাশচারীকে চাঁদে পাঠানোর প্রস্তুতি নেয় নাসা। নাসার পক্ষ থেকে চন্দ্রাভিযানে মহাকাশযারী হিসেবে নির্বাচিত হন নীল আর্মস্ট্রং, এডুইন অলড্রিন এবং মাইকেল কলিন্স। ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণের মাত্র ৪ দিন পরেই ‘অ্যাপোলো ১১’ মহাকাশযানটি চাঁদের মাটির কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। চাঁদের মাটি স্পর্শ করার আগেই তিনজন মহাকাশচারী একে অপরের থেকে পৃথক হয়ে যান। মাইকেল কলিন্স মহাকাশযানের কমান্ড মডিউল ‘কলম্বিয়া’তে বসেন, সেই মডিউলটিতে তিনিও চাঁদের কক্ষপথে আবর্তন করছিলেন। আর্মস্ট্রং এবং এডুইন দুজনে মহাকাশযানের লুনার মডিউল ‘ঈগল’-এ বসেন যেটি প্রথম চাঁদের মাটি স্পর্শ করে। ‘সি অফ ট্রাঙ্কুইলিটি’ নামে চাঁদের একটি গহ্বরে ঝুঁকিপূর্ণভাবে অবতরণ করেছিল এই অ্যাপোলো ১১ মহাকাশযানটি। মাটিতে নামার সাড়ে ৬ ঘন্টা পরে মহাকাশযান থেকে প্রথম বেরিয়ে আসেন নীল আর্মস্ট্রং। ফলে চাঁদের মাটিতে পা রাখা প্রথম মানুষ হিসেবে ইতিহাসে তাঁর নামই লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। তার ২০ মিনিট পরে মহাকাশযান থেকে নেমে আসেন এডুইন অলড্রিন। দুজনেই তারপর তাঁদের পিঠে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা টাঙিয়ে ছবি তুলেছিলেন এবং তৎকালীন মারক্রিন রাষ্ট্রপতি রিচার্ড নিক্সন তাঁদের অভিনন্দন জানাতে ফোনও করেছিলেন। চাঁদের পাথর ও ধূলিকণা পরীক্ষা করা এবং তার নমুনা সংগ্রহ সেরে দুই ঘন্টা পরে তাঁরা আবার মহাকাশযানে ফিরে যান। ১৯৬৯ সালের ২৪ জুলাই পৃথিবীর মাটিতে ফিরে আসে ‘অ্যাপোলো ১১’। এরপর ১৯৭২ সাল পর্যন্ত আর্মস্ট্রং এবং অলড্রিনের পদাঙ্ক অনুসরণ করে আরও ১০ জন মহাকাশচারী চাঁদের মাটিতে পা রেখেছেন।
তবে চাঁদের মাটিতে মহাকাশযান প্রেরণের চেষ্টা করেছিল প্রথম সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১৯৫৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়নের পাঠানো মহাকাশযান ‘লুনা ২’ সেকেন্ডে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার গতিবেগে চাঁদের ভূপৃষ্ঠে আছড়ে পড়েছিল। ফলে সেই প্রয়াস সফল না হলেও ‘লুনা ২’-ই ছিল চাঁদে মানুষের পাঠানো প্রথম কোনও বস্তু। এরপরে ১৯৬৬ সালেও একবার সোভিয়েত রাশিয়ার পক্ষ থেকে চাঁদের বুকে অবতরণ করেছিল ‘লুনা ৯’। দুটি মহাকাশযানেই সমাজতন্ত্রী রাশিয়ার পতাকা ও প্রতীক লাগানো ছিল। ফলে রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এরপরেই একটা অদৃশ্য প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। চাঁদের মাটিতে মানুষের পা রাখার বহু আগে থেকেই চন্দ্রাভিযান শুরু হয়ে গিয়েছিল। লুনা ৯-এর পরে ১৯৭০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পাঠানো লুনা ১৬ মহাকাশযানই প্রথম অপরিশোধিত চাঁদের মাটির নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে আসে। এরপরে ১৯৭২ সালে লুনা ২০ এবং ১৯৭৬ সালে লুনা ২৪ নভোযানও পাঠায় সোভিয়েত ইউনিয়ন। এর মধ্যে কয়েকটি মহাকাশযান সফলভাবে চাঁদে অবতরণ করতেও ব্যর্থ হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাঠানো ‘ইউ এস সার্ভেয়ার ৪’ নামের মহাকাশযানটি চাঁদে নামার কিছুক্ষণ আগেই সমস্ত বেতার যোগাযোগ হারিয়ে ফেলে। শুধুই রাশিয়া আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমায়িত ছিল না। এর পাশাপাশি জাপান এবং চীনও তাদের নিজস্ব চন্দ্র-অভিযান প্রকল্প চালিয়েছিল। ১৯৯৩ সালে জাপানের চন্দ্রযান ‘হিটেন’ চাঁদের মাটিতে আছড়ে পড়ে। এর পরে ২০০৯ সালে চিনের ‘চ্যাং ১’ মহাকাশযানটিও চাঁদের সঙ্গে সংঘর্ষে ধ্বংস হয়।
ভারতও চাঁদে মহাকাশযান পাঠাবার প্রয়াস করেছে। এশিয়ার মধ্যে চীন ও জাপানের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ২০০৮ সালের ২২ অক্টোবর সকাল ৬টা ২২ মিনিটে অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীহরিকোটা থেকে উৎক্ষিপ্ত হয় ‘চন্দ্রযান ১’। ভারতের মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে এটাই ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এতে কোনও মানুষ ছিল না, কেবলমাত্র একটি ইম্প্যাক্টর (Impactor) এবং একটি অরবিটর (Orbitor) ছিল এই মহাকাশযানে। ২০০৮ সালের ১৪ নভেম্বর মুন ইমপ্যাক্ট প্রোবটি চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অবতরণ করে। এই সমগ্র প্রকল্পটিতে ভারত সরকার মোট ৩৮৬ কোটি টাকা ব্যয় করেছিল এবং সেটাই প্রথমবার বিশ্বের চতুর্থ দেশ হিসেবে ভারতের পতাকা উত্তোলিত হয় চাঁদের মাটিতে। চাঁদের মাটিতে জলের উপস্থিতি পরীক্ষা করে দেখাই এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। এরপরে ২০১৯ সালে ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ‘ইসরো’-র উদ্যোগে আবার একটি মহাকাশযান চাঁদে পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয় এবং সেই অনুসারে ২০১৯ সালের ২২ জুলাই শ্রীহরিকোটা থেকে চাঁদের উদ্দেশ্যে উৎক্ষেপিত হয় এই মহাকাশযান। এর মোট তিনটি অংশ ছিল – একটি অরবিটার (Orbiter), একটি ল্যান্ডার (Lander) আর একটি রোভার (Rover)। এর ল্যান্ডারটির নাম ছিল ‘বিক্রম’ আর রোভারটির নাম ছিল ‘প্রজ্ঞান’। এর আগে পর্যন্ত প্রায় সব চন্দ্র-অভিযানই হয়েছে চাঁদের উত্তর মেরুতে, ভারতের ‘চন্দ্রযান ২’-ই প্রথম চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে যায়। জলের অস্তিত্ব, চাঁদের মাটিতে ভূমিকম্প এবং খনিজের উপস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করাই এই চন্দ্রযানের কাজ ছিল। কিন্তু অদ্ভুতভাবে চাঁদের মাটিতে নামার কিছুক্ষণ আগেই বিক্রমের সঙ্গে পৃথিবীর সমস্ত যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে এই অভিযানটি পূর্ণতা পায়নি। এভাবেই মানুষের চন্দ্র অভিযান বহাল রয়েছে। তবে এখনও পর্যন্ত একশোটির মত চন্দ্রযান পাঠানো হলেও মাত্র ১২ জন মানুষই চাঁদের মাটিতে পা রাখার বিরল অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। কিন্তু অভিযান এখানেই থেমে নেই। প্রতিনিয়ত নিত্য-নতুন আবিষ্কারে নিয়োজিত রয়েছেন বিশ্বের মহাকাশ গবেষকরা এবং সমস্ত মহাকাশ গবেষণা সংস্থাগুলি।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান