সববাংলায়

নবারুণ ভট্টাচার্য

নবারুণ ভট্টাচার্য (Nabarun Bhattacharya) একজন বাঙালি কবি ও ঔপন্যাসিক এবং গল্পকার যিনি তরুণ প্রজন্মের কাছে ‘ফ্যাতাড়ু’-নামে জনপ্রিয় ছিলেন।

১৯৪৮ সালের ২৩ জুন পশ্চিমবঙ্গের বহরমপুরে নবারুণ ভট্টাচার্যের জন্ম হয়৷ তাঁর বাবার নাম বিজন ভট্টাচার্য, যিনি ছিলেন বিখ্যাত বাঙালি নাট্য ব্যক্তিত্ব ও অভিনেতা  এবং মায়ের নাম মহাশ্বেতা দেবী যিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের এক দিকপাল কথাসাহিত্যিক ও মানবাধিকার আন্দোলনকর্মী। 

নবারুণ ভট্টাচার্যের প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয় কলকতার বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলে৷ পরবর্তীকালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত আশুতোষ কলেজ থেকে প্রথমে ভূতত্ত্ব (Geology) নিয়ে তারপর সিটি কলেজে ইংরেজি নিয়ে পড়াশোনা করেন৷ 

নবারুণ ভট্টাচার্যের কর্মজীবন বলতে তাঁর আজীবন সাহিত্য সাধনার কথা বলতে হয়৷ কলেজের পড়া শেষ হওয়ার পর তিনি ‘সোভিয়েত দেশ’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হন এবং দীর্ঘদিন তিনি এই পত্রিকার সঙ্গে কাজ করেছেন।

নবারুণ গল্প উপন্যাস লেখার পাশাপাশি কবিতাও লিখতেন৷ ১৯৬৮ সালে ‘পরিচয়’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর প্রথম ছোটগল্প ‘ভাসান’৷ ১৯৭২ সালে ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’ নামে তাঁর প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত হয়৷ তিনি  ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’  নামক কবিতায় সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদী সত্তা ব্যক্ত করেছেন৷ তাঁর লেখা প্রথম উপন্যাস ‘হারবার্ট’ ১৯৯২ সালে প্রকাশিত হয়েছিল৷ উপন্যাসটির পটভূমি ছিল সত্তরের দশকের নকশাল আন্দোলন। গল্প ও উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে তিনি নিজস্ব একটি ধারা তৈরী করে ফেলেছিলেন৷ বিজন ভট্টাচার্যের পুত্র হওয়ার পাশাপাশি তিনি ছিলেন বিজন ভট্টাচার্যের ঘনিষ্ঠ শিষ্য৷ নবারুণ ভট্টাচার্য খুব কাছ থেকে যেন লক্ষ্য করেছিলেন একজন শিল্পীর সংগ্রামকে৷

নবারুণ কোনদিনই নামী সংবাদপত্র এবং  জার্নালের জন্য লেখেননি অথচ তাঁর বলিষ্ঠ লেখনী তাঁকে পরিচিতি এনে দিয়েছিল৷ লেখালেখির পাশাপাশি তিনি নাটকের সঙ্গেও যুক্ত হন। মঞ্চে নাট্য অভিনয়ের মাধ্যেমে মানুষ তাঁকে ধীরে ধীরে চিনতে থাকেন৷  বিশ্বায়ন এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের বিচ্ছেদ তাঁকে প্রভাবিত করেছিল যথেষ্ট৷ তিনি কঠোর বাস্তবের কথাই নিজস্ব আঙ্গিকে লিখেছেন। তাঁর মনে হয়েছিল গদ্যের ইস্পাত কঠিন ভাষা দিয়ে সবটা ব্যক্ত করা সম্ভব যা কবিতায় বোঝা যায় না৷ যদিও তাঁর কবিতার ভাষা ছিল যথেষ্ট বলিষ্ঠ। নবারুণের লেখনীই ছিল তাঁর অস্ত্র৷ নবারুণের হাত ধরেই বাংলা সাহিত্যে অন্যধারার লেখা জন্ম নেয়।   তিনি একের পর এক গল্প উপন্যাস লিখতে থাকেন। তিনি নন্দীগ্রাম ও সিঙ্গুর মামলায় তাঁর বলিষ্ঠ বক্তব্য রেখেছিলেন। তাঁর জীবনযাপন ছিল অনাড়ম্বর, ঘোরতর রাজনৈতিক লেখা লিখেও  কোনও সরকারের তাঁবেদারি  করেননি তিনি । যদিও চিন্তার দিক থেকে তিনি বরাবরই বামপন্থী ছিলেন।

তাঁর লেখা সাহিত্য কীর্তিগুলি হল কাঙাল মালসাট (২০০৩), অটো ও ভোগী, হালাল ঝান্ডা ও অন্যান্য(২০০৯, মহাজানের আয়না( ২০১০), ফ্যাতাড়ুর কুম্ভীপাক, মসোলিয়ম, রাতের সার্কাস, খেলনানগর, ‘লুব্ধক,( ২০০৬), জোড়াতালি ইত্যাদি । তাঁর বাস্তববাদী লেখা বাঙালী পাঠকদের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল৷ তিনি ‘ফ্যাতাড়ু’ নামে একটি জনপ্রিয় কাল্পনিক চরিত্র তৈরী করেছিলেন। তাঁর সৃষ্ট চরিত্র ফ্যাতাড়ুরা উড়তে পারে এবং তাদের মন্ত্র হল “ফ্যাঁত ফ্যাঁত সাঁই সাঁই”। এই মন্ত্রবলে ফ্যাতাড়ুরা উড়ে গিয়ে হানা দিত কখনও আই পি এল চলাকালীন কালোবাজারিদের ভয় দেখাতে, কখনও বা ভন্ড সাহিত্যিকের মুখোশ খুলতে। এই ফ্যাতাড়ু আসলে হতভাগ্য মানুষদের প্রতিনিধি। বরাবরই সাহিত্যের চিরাচরিত নিয়ম ভাঙ্গা নবারুন ভট্টাচার্যের ফ্যাতাড়ুরা ভাষা ব্যবহারে সাহসী, আচরনে নির্ভীক ।ফ্যাতাড়ুদের নিয়ে দুটি ছোটগল্প সংকলন প্রকাশিত হয়েছে ‘ফ্যাতাড়ুর বোম্বাচাক’ এবং ‘ফ্যাতাড়ুর কুম্ভীপাক’।

নবারুন ভট্টাচার্যের তিনটি উপন্যাসে ফ্যাতাড়ুদের কথা পাওয়া যায় ‘কাঙাল মালসাট’ ‘মসোলিয়ম’ এবং ‘মবলগে নভেল’। নবারুণ ভট্টাচার্য বলেছেন,  “আমি নিজেকে প্রান্তিক বলে মনে করি এবং এতে আমার কিছু এসে যায়না। রিয়েল লাইফে ফ্যাতাড়ুর মত প্রথা ভাঙ্গতে তো পারিনা, তাই ফ্যাতাড়ুদের সৃষ্টি করি”। প্রথা ভাঙতে না পারলেও প্রথা ভাঙার পথটা তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন৷ মূল স্রোতের বাইরে থেকেও তিনি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন তরুন প্রজন্মের কাছে৷ নবারুণ ভট্টাচার্য তাঁর সৃষ্ট চরিত্র ফ্যাতাড়ু নামেই সম্বোধিত হয়ে থাকেন৷ 

১৯৯৭ সালে নবারুণ ভট্টাচার্য  ‘হারবার্ট’ উপন্যাসের জন্য সাহিত্য একাদেমী পুরস্কার পেয়েছিলেন। এই উপন্যাসই তাঁকে ১৯৯৬ সালে বঙ্কিম পুরস্কার এনে দিয়েছিল।  তাঁর লেখা ‘কাঙাল মালসাট’ উপন্যাসটিকে থিয়েটার জগতের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব  ও সিনেমা নির্দেশক সুমন মুখোপাধ্যায় নাট্যরূপ দিয়েছিলেন। পরে এটি নিয়ে তিনি চলচ্চিত্রও নির্মান করেছিলেন৷ আবার তাঁর রচিত প্রথম উপন্যাস ‘হারবার্ট’ অবলম্বনেও সুমন মুখোপাধ্যায় চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন। যেটি ৫৩তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ ছবি হিসেবে নির্বাচিত হয়৷ 

২০১৪ সালের ৩১ জুলাই অগ্নাশ্যয়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে নবারুণ ভট্টাচার্যের মৃত্যু হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading