আজকের দিনে

২৪ এপ্রিল ।। জাতীয় পঞ্চায়েতি রাজ দিবস (ভারত)

জাতীয় পঞ্চায়েতি রাজ দিবস

প্রতি বছর প্রতি মাসের নির্দিষ্ট কিছু দিনে বিভিন্ন দেশে কিছু দিবস পালিত হয়। ঐ নির্দিষ্ট দিনে অতীতের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে স্মরণ করা বা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করতেই এই সমস্ত দিবস পালিত হয়। ভারতও তার ব্যতিক্রম নয়। ভারতের পালনীয় সেই দিবসগুলির মধ্যে একটি হল জাতীয় পঞ্চায়েতি রাজ দিবস (National Panchayati Raj Day)।

প্রতি বছর ২৪ এপ্রিল তারিখে সমগ্র ভারত জুড়ে বিস্তৃত পঞ্চায়েতি শাসন ব্যবস্থার সাফল্য ও ঐতিহ্যকে স্মরণ করতে জাতীয় পঞ্চায়েতি রাজ দিবস পালন করা হয়। এই বিশেষ দিনটি পালনের মধ্য দিয়েই ভারতের প্রথম সারির নেতৃবৃন্দ ও অন্যান্য প্রশাসনিক মহলের কর্মীদের সঙ্গে সমগ্র দেশের গ্রাম-প্রধান বা পঞ্চায়েত প্রধানদের যোগাযোগ ঘটে, তাঁদের কাজ-কর্মের পুনর্মূল্যায়ন হয় এবং সর্বোপরি পঞ্চায়েতি ব্যবস্থার ভালো-মন্দ নিয়ে পুনর্বিবেচনার অবকাশ তৈরি হয়। প্রতি বছর পঞ্চায়েতি শাসন মন্ত্রকের উদ্যোগে ও পরিচালনায় এই দিনটি পালন করা হয়ে থাকে।

ভারতকে বলা হয় বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের দেশ এবং আয়তনের দিক থেকেও এই দেশ অনেকটাই বড়। ভারতের বহু রাজ্যে অনেক জনসংখ্যা, বৃহদায়তনের কারণে রাজ্যের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে আসীন ব্যক্তির পক্ষে গ্রামের সাধারণ মানুষের মুখোমুখি হওয়া বা তাঁদের সমস্যার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা একেবারেই অসম্ভব। তাই ভারতের সরকারের পক্ষ থেকে গণতান্ত্রিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের কথা ভাবা হয়েছিল প্রথম। আর এই প্রয়োজনেই বলবন্তরাই মেহেতার সভাপতিত্বে ১৯৫৭ সালে একটি কমিটি গঠিত হয় যে কমিটিই প্রথম গণতান্ত্রিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের সুপারিশ করেছিল। ভারতের ইতিহাসে প্রথম পঞ্চায়েতি শাসনের সূত্রপাত ঘটে রাজস্থানের নাগৌর জেলায়। ১৯৫৯ সালের ২ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরু প্রথম এই ব্যবস্থা চালু করেন। তারপর একই পদ্ধতিতে পঞ্চায়েত ব্যবস্থা চালু হয় অন্ধ্রপ্রদেশে। বলবন্তরাই মেহেতার কমিটি ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত ব্যবস্থার প্রণয়ন করেছিলেন। এই ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত ব্যবস্থার অংশগুলি হল –

  • গ্রামীণ স্তরে গ্রাম পঞ্চায়েত
  • ব্লক স্তরে পঞ্চায়েত সমিতি
  • জেলা স্তরে জেলা পরিষদ

১৯৯২ সালের ৭৩তম সংবিধান সংশোধনী আইনের মাধ্যমে ভারতে প্রতি বছর জাতীয় পঞ্চায়েতি রাজ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়। ১৯৯৩ সালের ২৪ এপ্রিল প্রথম ভারতে জাতীয় পঞ্চায়েতি রাজ দিবস পালনের অনুমতি স্বীকৃত হয়। এই বিশেষ দিনের প্রধান তাৎপর্যের মধ্যে অন্যতম হল ভারতের সাধারণ মানুষের হাতে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণকে স্বীকৃতি দেওয়া। আঞ্চলিক প্রশাসন চালু রাখার জন্য বর্তমানে প্রতিটি গ্রাম, ব্লক ও জেলায় নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি রয়েছেন যারা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর অধীনে সমস্ত প্রশাসনিক কার্যক্রমকে সচল রাখতে সাহায্য করেন। ভারতের পঞ্চায়েতি ব্যবস্থা পরিচালনা ও পর্যবেক্ষণের জন্য ২০০৪ সালের ২৭ মে পঞ্চায়েতি রাজের একটি পৃথক মন্ত্রক তৈরি হয়। ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং-এর  অনুমোদনেই ২০১০ সালের ২৪ এপ্রিল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমগ্র ভারতে এই বিশেষ দিনে পঞ্চায়েতি রাজ দিবস হিসেবে পালন করা হয়। তিনি বলেছিলেন যে পঞ্চায়েতি রাজ মন্ত্রক সঠিকভাবে কাজ করলে এবং স্থানীয়দের উন্নয়ন কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করতে পারলে ভারতে মাওবাদী আক্রমণের পরিমাণও কমে যাবে। ভারতে পরিসংখ্যানের হিসেবে প্রায় ২.৫৪ লক্ষ পঞ্চায়েত রয়েছে যার মধ্যে ২.৪৭ লক্ষ হল গ্রাম পঞ্চায়েত, ৬২৮৩টি ব্লক পঞ্চায়েত ও ৫৯৫টি জেলা পঞ্চায়েত। দেশে মোট ২৯ লক্ষেরও বেশি পঞ্চায়েত প্রতিনিধি আছেন। ইতিমধ্যে ভারতে ১৪তম অর্থ কমিশনের সৌজন্যে গ্রামে গ্রামে ভৌত ও অবকাঠামো প্রকল্পগুলি চালু করার জন্য ২ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছিল গ্রাম পঞ্চায়েতগুলিকে। এই বিশেষ দিনকে উপলক্ষ্য করে প্রতি বছর ২৪ এপ্রিল ভারতের পঞ্চায়েতি রাজ মন্ত্রক কাজ ও দক্ষতার ভিত্তিতে শ্রেষ্ঠ পঞ্চায়েতগুলিকে পুরস্কৃত করে থাকে। মোট চার ধরনের পুরস্কার দেওয়া হয় –

  • গ্রাম সভার অসামান্য কর্মদক্ষতার জন্য গ্রাম পঞ্চায়েতকে দেওয়া হয় ‘নানাজি দেশমুখ রাষ্ট্রীয় গৌরব গ্রামসভা পুরস্কার’।
  • ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েতের প্রত্যেক বিভাগে দক্ষতার জন্য দেওয়া হয় ‘দীনদয়াল উপাধ্যায় পঞ্চায়েত সাশক্তিকরণ পুরস্কার’।
  • এছাড়া রয়েছে ‘শিশু-বান্ধব গ্রাম পঞ্চায়েত পুরস্কার’।
  • সমগ্র দেশে তিনটি সেরা কর্মক্ষমতাযুক্ত পঞ্চায়েতকে দেওয়া হয় ‘গ্রাম পঞ্চায়েত উন্নয়ন পরিকল্পনা’।

ভারতের রাজ্য আইনসভাগুলি বিশেষ আইনি ক্ষমতার মাধ্যমে পঞ্চায়েতগুলিকে নিজ সরকারের প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করার প্রয়োজনীয় ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব দিয়ে থাকে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় অনেকসময় ওই পঞ্চায়েতগুলির হাতেই। তাছাড়া পঞ্চায়েতগুলি কর ও আর্থিক সম্পদ আরোপের ক্ষমতাও ধারণ করে। এলাকার উন্নয়নের জন্য রাজ্যের একত্রিত তহবিল থেকে বেশ কিছু অংশ পঞ্চায়েতগুলিকে অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়ে থাকে। সব মিলিয়ে মানুষের হাতে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নীতির সবথেকে বড় উদাহরণ হল এই পঞ্চায়েত ব্যবস্থা।

২০১৫ সালের ২৪ এপ্রিল এই বিশেষ দিন উপলক্ষ্যে নির্বাচিত পঞ্চায়েত প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে জানান যে ‘সরপঞ্চ-পতি’ অর্থাৎ মহিলা পঞ্চায়েত প্রধানের স্বামী হিসেবে আলাদা প্রভাব খাটানোর প্রক্রিয়াবন্ধ করতে হবে অবিলম্বে। ২০২১ সালে পঞ্চায়েতি রাজ দিবস উপলক্ষ্যে ভারতের পঞ্চায়েতি রাজ মন্ত্রক বিশেষ টুইটের মধ্য দিয়ে জানিয়েছেন যে আত্মনির্ভর ভারত গড়ার কাজে পঞ্চায়েতগুলিকে তাঁদের কাজের স্বীকৃতি ও সেই জন্য অভিনন্দন জানানো দরকার। এই বিশেষ দিনে ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বক্তব্য রাখেন সমগ্র পঞ্চায়েত প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে। তাছাড়া এই বিশেষ দিন উপলক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী চালু করেন একটি নতুন প্রকল্প ‘স্বামিত্ব’ (SVAMITVA) অর্থাৎ Survey of Villages and Mapping with Improvised Technology। ২০২১ সালে জাতীয় পঞ্চায়েতি রাজ মন্ত্রকের পক্ষ থেকে পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিল প্রায় ৭৪ হাজার পঞ্চায়েত। ২০২০ সালের তুলনায় এই অংশগ্রহণের হার ২৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়