সববাংলায়

নুশু – যে ভাষায় কথা বলে কেবল মেয়েরাই

বিভাগঃ , ,

পৃথিবীতে যে কত রকমের ভাষা রয়েছে তার ইয়ত্তা নেই।  ভাষা মানুষের একে অন্যের সাথে যোগাযোগের মাধ্যম হয়েই কেবল থেমে থাকেনি তার সুখ দুঃখ প্রকাশের অন্যতম একটি মাধ্যমেও পরিণত হয়েছে। এই পৃথিবীর অগুনতি ভাষার মধ্যে এমন ভাষাও রয়েছে যা কেবলমাত্র মেয়েদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।  নারী মনের হাজারো সুখ দুঃখ প্রকাশের এক অত্যন্ত নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে সেই ভাষার সৃষ্টি।  ভাষাটির নাম নুশু (Nushu)।

নুশু প্রাচীন চীনের লিখিত একটি উপভাষা। ভাষা বিশেষজ্ঞদের মতে এটি সম্ভবত বিশ্বের একমাত্র ভাষা, যার সৃষ্টি নারীদের জন্য এবং যা ব্যবহারের একমাত্র অধিকার ছিল কেবল নারীদেরই।

দক্ষিণ-পূর্ব চীনের হুনান প্রদেশে অবস্থিত এক  পাহাড় বেষ্টিত গ্রাম জ্যাংইয়াংয়ে কৃষিকাজে যুক্ত মহিলাদের মধ্যে এই ভাষার উদ্ভব ঘটে। এখান থেকে ভাষাটি দাওসিয়ান এবং জ্যাংঘুয়া প্রদেশে পরবর্তীকালে ছড়িয়ে পড়ে। তবে এটি ঠিক তখনই এটি বিশ্বের নজরে আসে যখন তা বিলুপ্তির পথে। বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে কিছু লিপি উদ্ধার করা হলেও ধারণা করা হয় প্রাচীনযুগ থেকেই গোপনে ব্যবহৃত হয়ে আসছে এই ভাষা। কিছু বিশেষজ্ঞের ধারণা, ভাষাটি নবম শতকের দিকে জন্মলাভ করে, যখন সং রাজবংশ (৯৬০-১২৭৯) চীনের শাসনে ছিল। নুশু লিপিটি প্রায়শই মহিলাদের দ্বারা তৈরি সুতোর কাজ, ক্যালিগ্রাফি এবং হস্তশিল্পে ব্যবহার হত। এই লিপিটির নিদর্শন যেমন কাগজে লেখা পাওয়া যায় তেমনি কাপড়ে করা সুতোর কাজ কম্বল এপ্রোন, স্কার্ফ, রুমাল প্রভৃতি বস্তুতেও দেখা গেছে। যদিও এই বস্তুগুলি প্রায়শই মহিলাদের সাথে কবর দেওয়া হত বা পুড়িয়ে দেওয়া হত।

নুশু যদিও একটি ভাষা হিসাবে বিবেচিত হয়, প্রকৃতপক্ষে এটি একটি লিপি। নুশুর কথ্য উপভাষাটি এই অঞ্চলের পুরুষ দ্বারা ব্যবহৃত হানজির মতোই।  অন্য যেকোনো চীনা অক্ষরের মতো, নুশুও স্তম্ভকারে লেখা হয়। স্তম্ভগুলি ডান থেকে বামে লেখা হয়। এই ভাষায় বিরাম চিহ্ন সহ প্রায় একহাজার  থেকে দেড় হাজার অক্ষর রয়েছে। যাইহোক, লক্ষণীয় বিষয় হল যে নুশু লিপিটি মূলত শব্দের উপর ভিত্তি করে তৈরী হয়েছে। এই লিপিতে অক্ষর আঁকার জন্য মোট চার ধরনের টান অনুসরণ করা হয়: বিন্দু, আনুভূমিক, উল্লম্ব এবং বক্র।

কয়েকশো বছর ধরে এই ভাষা কেবল হুনান প্রদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এবং বাকি বিশ্বের কার্যত এর অস্তিত্ব সম্পর্কে কোনও ধারণা ছিল না। ১৯৫০ এর দশকে ইয়ান জুইজিয়ং নামে একজন চীনা ভাষাবিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং গগ জেবিং নামের একজন শিক্ষক চীনা ক্যালিগ্রাফি সম্পর্কে গবেষণা করার সময় এই লিপিটির সন্ধান পান। বিচিত্র এই ভাষাটির খোঁজ পাওয়া মাত্রই তাঁরা নুশু ব্যবহারকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং বাকি বিশ্বকে এই ভাষাটির অস্তিত্ব সম্পর্কে জানানোর জন্য অনুরোধ করেন । ঝৌ শুয়োই নামে আরও এক ব্যক্তি ১৯৮০-এর দশকে দশ প্রজন্ম আগে রচিত একটি কবিতায় নুশু অক্ষরগুলির সন্ধান পান।  

প্রাচীন চীন সমাজ ছিল মূলত পুরুষ তান্ত্রিক। প্রাচীন সেই সমাজে  শুধুমাত্র পুরুষদেরই  লেখা পড়ার অধিকার ছিল। প্রাচীন চীনের একটি অন্যতম নিষ্ঠুর প্রথা ছিল ‘ফুট বাইন্ডিং’ । জ্যাংইয়াংয়ে অল্পবয়সী কৃষক মেয়েদের বিশেষ করে  যারা এই নিষ্ঠুর প্রথার শিকার হত তাদের বয়স্ক মহিলা আত্মীয়রা নিজেদের মধ্যে কথোপকথনের জন্য  এই নুশু লিপি লিখতে শেখাতো।  

বর্তমানে নুশু লিপিটি চীনা মহিলাদের দ্বারা তৈরি এমব্রয়ডারি, ক্যালিগ্রাফি এবং হস্তশিল্পে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয় । এই লিপির ব্যবহার চিঠি, হাতে লেখা কবিতা এবং বাড়ির সাজসজ্জাতেও পাওয়া যায়। ২০০৩ সালে, চীন সরকার এই নুশু লিপির আকস্মিক জনপ্রিয়তা উপলব্ধি করে নুশু সংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে। এমনকি তারা আঠেরোশো অক্ষর সম্বলিত একটি নুশু অভিধানও  প্রকাশ করে। ২০০৪ সালে চীন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সমগ্র বিশ্বের সামনে নুশু লিপির অস্তিত্বের খবর উন্মোচন করে। তারপর থেকে এমনকি চীনের বাইরেও ১০০ টিরও বেশি নুশু পাণ্ডুলিপি আবিষ্কৃত হয়েছে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading