খেলা

পল সেকারেস

যদি ইচ্ছা প্রবল থাকে, কোনো বাধাই আর বাধা থাকে না। তখন পর্বতও খর্ব হয়ে যায়, সমুদ্রও শান্ত হয়ে যায়। ইচ্ছে প্রবল এবং দৃঢ় হলে একটি পাত্রে সমস্ত সমুদ্রকে পান করে ফেলা যায়। স্বামী বিবেকানন্দের বলে যাওয়া এই কথাগুলি বারবার প্রমাণ করেছেন বহু মানুষ। সমস্ত বাধা-প্রতিবন্ধকতাকে কাটিয়ে উঠে তারা নিজেদের সফল করে তুলেছেন এই ইচ্ছের জোরে। তা সে বাধা শারীরিক প্রতিবন্ধকতাই হোক বা মানসিক কিংবা পারিবারিক। আর খেলার দুনিয়ায় এই ঘটনা হামেশাই দেখি আমরা।প্রতিদিন নতুন নতুন অনুপ্রেরণার গল্প তৈরি হয়। কখনো দৃষ্টিহীন হয়েও কেউ সাঁতারে সোনা জেতে, কেউ একটা পা না থেকেও দৌড়োয়, আবার কেউ একটা হাতেই জ্যাভলিন ছুঁড়ে অলিম্পিকে সোনা জেতেন। এমনই অলিম্পিক প্যারালিম্পিক দুই ক্ষেত্রেই হুইলচেয়ারে বসে ফেন্সিংয়ে পদক জিতেছেন হাঙ্গেরির পল সেকারেস (Pal Szekeres)। একদিন বাস দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হুইলচেয়ার বেছে নিতে হয়েছিল পলকে, তবু জীবন থেমে যায়নি তাঁর। কথায় বলে জীবন কিছু নিলে, বহুগুণে আরো অনেক কিছু ফিরিয়ে দেয়। পলও হারাননি কিছুই, দূর্ঘটনায় পা দুটি অক্ষম হয়ে গেলেও মনের জোর হারাননি তিনি। পরপর দুইবার অলিম্পিকে তিনটি স্বর্ণপদক এবং তারপরে আরো তিনবার তিনটি ব্রোঞ্জ পদক লাভ করেন পল। প্যারালিম্পিক এবং অলিম্পিকে একাধারে পদকজয়ের শিরোপা যে একমাত্র তাঁরই প্রাপ্য।

১৯৬৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর হাঙ্গেরিতে পল সেকারেস এর জন্ম। ১৯৮৮ সালের সিওল অলিম্পিকে হাঙ্গেরির প্রতিনিধি হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়েই তাঁর জয়যাত্রা শুরু। তাঁর দলের পক্ষ থেকে তিনি সেবারে একটি ব্রোঞ্জ পদক জয় করেছিলেন ফেন্সিংয়ে আর তারপরে ১৯৮৯ সালে বিশ্বকাপ জয় করে জাতীয় স্তরে তাঁর খ্যাতি বাড়তে থাকে। কিন্তু কে জানতো এমন উন্নতির রেখা এভাবে ছিন্ন হয়ে যাবে মাঝপথে? তিন বছর পরেই পরবর্তী অলিম্পিক গেমসের প্রস্তুতি চলাকালীন একটা সড়ক দূর্ঘটনায় তাঁর সাজানো জীবনটাই পুরো এলোমেলো হয়ে যায়। কিন্তু পল সেকারেসই শেখালেন কীভাবে মনের জোরে উঠে দাঁড়ানো যায়। হতাশা তো ক্ষণিকের, আরো বড়ো কোনো লক্ষ্যের পথে এগিয়ে যাওয়াটাই জীবন, ক্লান্তিবিহীন পথে চলাই জীবন। সেখানে ক্ষয় নেই, রোগ নেই, জরা নেই, আছে শুধু আনন্দ – জয়ের আনন্দ। আর সেই জয়ই পেয়ে দেখালেন পল। মাত্র এক বছরের মধ্যে নিজেকে সুস্থ ও প্রস্তুত করে প্রথম প্রতিবন্ধী অ্যাথলিট হিসেবে অলিম্পিক এবং প্যারালিম্পিক দুই মঞ্চেই পদক জয়ের খেতাব অর্জন করেন পল সেকারেস। হুইল চেয়ার ফেন্সিংয়ে পদক জয় করেন পল। যে ফেন্সিংয়ে একসময় স্কুলে পড়াকালীন তাঁর কঠিন বলে মনে হয়েছিল, যে খেলায় নিজের দক্ষতা প্রমাণ করতে পারেননি সেদিন তাকেই ভালোবেসে ফেললেন পল। প্রথমে সাইক্লিং-এর চেষ্টা করলেও অবশেষে শিশুর মতো খেয়ালে বেছে নেন ফেন্সিং। একটামাত্র হুইলচেয়ার তাঁর জীবনকে পুরো বদলে দিয়েছিল। না তিনি বাস্কেটবল ধরতে পারতেন ঠিকমতো, না তিনি ঠিকভাবে ফেন্সিং খেলতে পারতেন। সবসময় হুইলচেয়ার নিয়ে পিছন দিকে তাঁর পড়ে যাওয়া নিয়ে অন্য অ্যাথলিটরা হাসতো, বিদ্রূপ করতো, ঠাট্টা করতো। সব গঞ্জনা, সব বিদ্রূপ সহ্য করে নিয়েছিলেন পল। একদিন যে তাঁকে সফল হয়ে দেখাতেই হবে। কথায় বলে উত্তাল সমুদ্রই দক্ষ নাবিক তৈরি করে। এই সমস্ত ব্যর্থতা ধীরে ধীরে গড়ে তুলছিল পলকে। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল – প্রায় পাঁচ বছর লেগে গেল পুরোপুরি স্বাভাবিকভাবে ফেন্সিং করা শিখতে। এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ করে মার্কেটিং এবং অর্থনীতি নিয়ে পড়া শুরু করেন পল আর সেইসঙ্গে চলতে থাকে হুইলচেয়ার ফেন্সিং-এর প্রশিক্ষণ। ১৯৯৬তে বিবাহ হয় পল সেকারেসের। তখন একটি কোম্পানিতে পুনর্বাসনের জন্য কাজ করা শুরু করেন তিনি, কিছুদিনের মধ্যে ড্রাইভিং লাইসেন্সও পেয়ে যান পল। আন্তর্জাতিক একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে যুক্ত থেকে পল হুইল চেয়ারের মধ্যেও নিজের মতো করে জীবনটাকে গুছিয়ে নিচ্ছিলেন। এই হুইলচেয়ার নিয়েই অলিম্পিকে ফেন্সিং প্রতিযোগিতায় যোগ দেন পল আর ১৯৯২ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রায় প্রতিবারই পদক অর্জন করেন তিনি। হাঙ্গেরির প্যারালিম্পিয়ান হিসেবে ১৯৯২ সালের বার্সেলোনা অলিম্পিকে স্বর্ণপদক, তারপরে ১৯৯৬ সালের আটলান্টা অলিম্পিকে দুটি স্বর্ণপদক এবং তারপর ২০০০ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে একটি মাত্র ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করেছেন পল সেকারেস। শুধুই অলিম্পিক নয়, হুইলচেয়ার ফেন্সিং বিশ্বকাপ এবং ২০০৭ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে একক স্যাবার শ্রেণিতে যথাক্রমে ব্রোঞ্জ ও স্বর্ণপদক জয় করেন তিনি।

তবে এই অলিম্পিকের বাইরেও নিজের জীবনকে প্রসারিত করেছিলেন পল। ১৯৯৯ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত শিশু, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রকের রাজ্য সম্পাদকের পদ দক্ষ হাতে সামলেছেন পল। মিনিস্টেরিয়াল কমিশনার এবং সরকারের প্রোগ্রাম অফিসার হিসেবে তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল প্রতিবন্ধীদের মধ্যে সমানভাবে শিক্ষা পৌঁছানো এবং তাঁদেরকে সমান সুযোগ বন্টন করা। ১৯৯৬ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক হুইলচেয়ার ফেন্সিং কমিটির সভাপতিত্বও করেছেন তিনি এবং তারই সঙ্গে ইউরোপিয়ান প্যারালিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের ‘মেম্বার অ্যাট লার্জ’ পদে আসীন ছিলেন পল ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত। নিজের ক্রীড়াজীবনেও যেমন তিনি সাফল্য পেয়েছেন, তেমনই প্রশাসনিক নানা পদেও তাঁর সাফল্য চোখে পড়ার মতো। ২০০৫ সালে একইসঙ্গে তিনি ‘হাঙ্গেরিয়ান স্পোর্টস ফেডারেশন ফর দ্য ডিসেব্‌লড’ এর সভাপতিত্ব এবং হাঙ্গেরির ‘ন্যাশনাল প্যারালিম্পিক কমিটি’র কার্যনির্বাহী গোষ্ঠীর সদস্যপদ লাভ করেন।

কোনোরকম নেতিবাচক মনোভাবকে কখনোই প্রাধান্য দেননি পল। স্কুলে-কমিটিতে যেখানেই বক্তৃতা দিতে গিয়েছেন, মনের মধ্যে শত ঝড়-ঝাপ্টা চললেও তা মুখে কখনো প্রকাশ করেননি। সবসময় তিনি ভেবেছেন তাঁর এই খ্যাতি এই সাফল্য অন্যদের প্রভাবিত করবে, অনুপ্রাণিত করবে আর সেখানে যদি তিনি নিজেই হতাশ হয়ে পড়েন তাহলে তারাও তো পিছিয়ে পড়বে। যে বয়সে একটি সাধারণ ছেলে দামি বিলাসবহুল গাড়ি আর নারীর সান্নিধ্য চায়, ঠিক সেই বয়সেই একজন দক্ষ অলিম্পিয়ান হতে চেয়েছিলেন পল সেকারেস। তবে এত সাফল্য তাঁকে পালটে ফেলতে পারেনি, অত্যন্ত স্বাভাবিক সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত থেকেছেন পল। একটা দূর্ঘটনা তাঁকে চিনিয়েছে মানুষের আসল দূর্বলতা কোথায়, আর সেখানেই মানুষকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। আগুনে পুড়ে পুড়েই সোনা খাঁটি হয় আর সেভাবেই শত বাধার আগুনে নিজেকে পুড়িয়ে শ্রেষ্ঠ করার পথে এগোতে চেয়েছিলেন পল সেকারেস – পৃথিবীর একমাত্র স্বর্ণপদকজয়ী হুইল-চেয়ার ফেন্সিং-অ্যাথলিট।

এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।