সববাংলায়

কলকাতা জৈন মন্দির | পরেশনাথ মন্দির

বিভাগঃ , ,

প্রাচীন এই কলকাতা শহরের বুকে মন্দির-মসজিদের সংখ্যা যে কত তার ইয়ত্তা নেই। এই শহরটার মতনই সেইসব স্থাপত্যও অনেক প্রাচীন এবং বহু ইতিহাস তারা বুকে নিয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে। কলকাতার জৈন সম্প্রদায়ের মানুষদের উপাসনালয় হিসেবে অনেক জৈন মন্দির রয়েছে, সেগুলির মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যে জৈন মন্দিরটি তা পরেশনাথ মন্দির (Pareshnath Jain Temple) হিসেবে পরিচিত। মানিকতলার কাছে গৌরীবাড়ি অঞ্চলের বদ্রীদাস মন্দির স্ট্রীটে অবস্থিত এই জৈন মন্দিরটি। বিশাল অঞ্চল জুড়ে অবস্থিত এই মন্দিরে পরেশনাথের মন্দির ছাড়াও আরও চারটি মন্দির রয়েছে। জৈন তীর্থঙ্করদের উদ্দেশ্যে নির্মিত সেইসব মন্দিরের সৌন্দর্যে চোখ জুড়িয়ে যায়। কলকাতার অন্যান্য জৈন মন্দিরগুলির তুলনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় এই পরেশনাথ মন্দিরটি, সেই কারণে ভারতেরও বিভিন্ন প্রান্তের জৈন সম্প্রদায়ের মানুষ এই মন্দির দর্শনের অভিপ্রায় নিয়ে এখানে আসেন।

কলকাতা বরাবরই ব্যবসা-বাণিজ্যের এক অন্যতম কেন্দ্র। এই টানেই গ্রাম-মফস্বল থেকে দলে দলে মানুষ এসেছে এই শহরে রুজিরোজগারের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। শুধু তাই নয়, ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের অবাঙালি ব্যবসাদারেরও ক্রমেই ভিড় বেড়েছে কলকাতায়। এই শহরে আজ মারোয়ারী ও গুজরাটি ব্যবসায়ীদের আধিক্য দেখলেই তা বোঝা যায়। এইসব ব্যবসায়ী এবং অর্থের টানে চলে আসা মানুষের দলে ছিলেন জৈন সম্প্রদায়েরও মানুষ, যাঁরা একসময় এই শহরে এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন। একটি নির্দিষ্ট ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষ কোন একস্থানে বসতি গড়লে তাদের ঈশ্বর উপাসনার জন্য উপাসনালয়ের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। সেই কারণেই কলকাতা শহরের বিভিন্ন দিকে ছোট-বড় বহু জৈন মন্দির গড়ে উঠতে থাকে।

পরেশনাথ মন্দিরটি ১৮৬৭ সালে ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয়ের সহকারী রায় বদরীদাস বাহাদুর মুকিম দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। তবে মন্দির প্রতিষ্ঠার কাজ করেছিলেন শ্রী কল্যাণসুরিশ্বরজী মহারাজ। এই মন্দিরে যেহেতু ২৩তম জৈন তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথ পূজিত হন, তাই সেই পার্শ্বনাথ মন্দিরই ক্রমে হয়ে গেছে পরেশনাথ মন্দির। পরেশনাথের মন্দির এবং আরও যে চারটি মন্দির নিয়ে এই জৈন মন্দির, সেগুলি হল, শীতলনাথজীর মন্দির, চন্দ্রপ্রভুজী মন্দির, মহাবীরস্বামী মন্দির (শেষ জৈন তীর্থঙ্কর মহাবীরের উদ্দেশে নিবেদিত) এবং দাদাওয়াড়ি ও কুশলজী মহারাজ মন্দির। এর মধ্যে প্রধান মন্দির অর্থাৎ শীতলনাথজীর মন্দিরের এই শীতলনাথ হলেন জৈনদের ১০ম তীর্থঙ্কর। এই মন্দিরের দক্ষিণদিকে যে চন্দ্রপ্রভুজীর মন্দির রয়েছে, সেটি ১৮৯৫ সালে গণেশলাল কাপুরচাঁদ জহর দ্বারা নির্মিত হয়েছিল।

এই মন্দিরের গর্ভগৃহের অভ্যন্তরে যে প্রদীপ জ্বলতে দেখা যায় সেটি সেই ১৮৬৭ সালে মন্দিরের সূচনার পর থেকেই অবিরাম জ্বলছে।

মানিকতলার মতো ঘিঞ্জি একটা অঞ্চলে এই জৈন মন্দির যেন হঠাৎ খুবই বেমানান। মন্দিরের স্থাপত্যকর্ম সত্যিই অসাধারণ এবং আকর্ষণীয়। এখানকার নকশায়, অলঙ্করণে এতখানিই রাজস্থানী শিল্পের প্রভাব রয়েছে, মনে হয় রাজস্থানেরই কোন মন্দিরে বুঝি ঢুকে পড়া হয়েছে। মূলত রাজস্থানী ও মুঘল স্থাপত্যশৈলীর এক সংমিশ্রণ এখানে লক্ষ করা যায়।

২৩তম জৈন তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথের উদ্দেশে নিবেদিত এই মন্দিরে মোট চারটি মন্দির রয়েছে, যা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। এই চারটির মধ্যে ভগবান শীতলনাথজীর মন্দিরটিকে প্রধান মন্দির হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শীতলনাথজীর মন্দিরের দক্ষিণ দিকে রয়েছে চন্দ্রপ্রভুজীর মন্দির। মূল মন্দিরের ডানদিকে দাদাওয়াড়ি ও কুশলজী মহারাজ মন্দিরের অবস্থান, যেখানে জৈন আচার্য জিন দত্ত কুশল সুরির পদচিহ্ন রাখা রয়েছে, যেটিকে নিত্য পূজা করা হয়। মূল শীতলনাথজীর মন্দিরের উত্তরদিকে রয়েছে মহাবীরস্বামী মন্দির। এই মন্দিরগুলি সূক্ষ্ম ও জটিল নকশা দ্বারা অলঙ্কৃত। মন্দিরের অধিকাংশই মার্বেল দ্বারা নির্মিত এবং তাতে ফুলের অসাধারণ নকশা। মন্দিরগুলির প্রত্যেকটির গড়ন অত্যন্ত আকর্ষণীয়। দাগযুক্ত কাচের তৈরি স্তম্ভ এবং জানালা দ্বারা সেগুলি সুসজ্জিত। তিনটি সুন্দর বারান্দা দ্বারা বেষ্টিত এই মন্দির। মন্দিরের দেওয়ালে দৃষ্টিনন্দন মোজাইকের কাজ লক্ষণীয়। মন্দিরের অভ্যন্তরে দেওয়ালগুলি চিত্রশিল্পী গণেশ মুসকারের চিত্র দ্বারা শোভিত।

মূল মন্দিরটি মূলত তিনটি ভাগে বিভক্ত। সবচেয়ে ভিতরের অংশটিতে তীর্থঙ্করদের মূর্তি রয়েছে। এখানে উল্লেখ্য যে, গর্ভগৃহে উপবিষ্ট শীতলনাথজীর বিগ্রহের কপাল হীরক-খচিত, যা দর্শনার্থীদের একটি অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। অন্যান্য দেবতারাও মূল্যবান পাথর ও ধাতু দ্বারা নির্মিত। বাইরের অংশটিতে দেওয়াল, ছাদ, স্তম্ভ সব মোজাইক করা কাচ দ্বারা সজ্জিত। এই অংশে বিরাট একটি ঝাড়বাতিও চোখে পড়ে। মন্দিরের বাইরে দেশী-বিদেশী বিবিধ গাছপালায় ভরা বাগান রয়েছে। সেই বাগানে আবার ভাস্কর্য যেমন দেখা যায় তেমনই রয়েছে বেশ কয়েকটি ফোয়ারাও। ছোট্ট একটি জলধারাও প্রবাহিত হতে দেখা যার চারপাশ বিভিন্ন ধরনের ফুলের সমারোহে অত্যন্ত সুন্দর। এছাড়াও দারুণভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা একটি জলাধারও রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে প্রচুর রঙিন মাছ। দর্শনার্থীরা সেই জলাশয়ের ধারে গিয়ে মাছেদের খাবার দেন এবং ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ তখন এক জায়গায় এসে ভিড় করে সেই খাদ্যের জন্য। সব মিলিয়ে বিরাট এই মন্দির চত্বরটি রাজকীয় স্থাপত্যের মতো কাচ ও মার্বেলের নকশা দ্বারা সজ্জিত কয়েকটি মন্দির এবং বাগান, ফোয়ারা, জলাশয় ইত্যাদির সমাহারে এক অসাধারণ দৃষ্টিনন্দন স্থান হয়ে উঠেছে।

বছরের বিভিন্ন সময়ে জৈনরা বেশ কিছু উৎসব খুব নিষ্ঠাসহকারে ধুমধাম করে পালন করেন এই মন্দিরে। জৈনদের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব হল পর্যুষণ উৎসব। মূলত ভাদ্র মাসে অর্থাৎ ইংরেজি আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে জৈন সম্প্রদায়ের মানুষেরা আট-দশদিন ধরে এই উৎসব পালন করে থাকেন। এই উৎসবে মূলত মহাবীরের প্রদান করা শিক্ষাগুলিকে স্মরণ করা এবং আরও নৈতিক ও সহানুভূতিশীল এক জীবনযাপনের দিকে নিজেদের নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টাকে অন্তর থেকে জাগিয়ে তোলবার প্রয়াস করেন এই ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষেরা। জৈন ধর্মের দিগম্বর এবং শ্বেতাম্বর নামক দুটি শাখাই এই উৎসব উদযাপন করে। এসময় তাঁরা একটি নির্দিষ্ট সময় উপবাস করেন, ধ্যান করেন এবং সকলপ্রকার হিংসা থেকে বিরত থাকেন। এছাড়াও বিভিন্ন দাতব্য কাজকর্ম করেন, জৈন মন্দিরগুলিতেও তাঁরা যান এবং সেখানকার ধর্মীয় নানা অনুষ্ঠানেও যোগদান করেন। উৎসবের শেষ দিনটিকে বলা হয় সম্বতসরি। পরেশনাথ মন্দিরেও এই উৎসব নিষ্ঠাসহকারের উদযাপিত হয়। এছাড়াও রাস পূর্ণিমার দিন এই মন্দির থেকে বিশাল শোভাযাত্রা বের করা হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading