ইতিহাস

পল গগ্যাঁ

ইউজিন হেনরী পল গগ্যাঁ (Paul Gauguin) ছিলেন একজন ‘পোস্টইম্প্রেসনিষ্ট’ দিকপাল ফ্রেঞ্চ চিত্রশিল্পী, মৃত্যুর পর যাঁর নাম ও খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে দিকে দিকে। সমসাময়িক ‘ইম্প্রেসনিজম’ শৈলীর বাইরে বেরিয়ে তিনি ছবি আঁকা শুরু করেন। চিত্রশিল্পী হওয়ার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন দক্ষ ভাস্কর, নামী প্রিন্ট মেকার, স্বনামধন্য মৃৎশিল্পী ও বিখ্যাত লেখক।

 ১৮৪৮ সালের ৭ জুন প্যারিসে জন্ম হয় পল গগ্যাঁর। তাঁর বাবার নাম ছিল ক্লভিস গগ্যাঁ এবং মায়ের নাম ছিল অ্যালিনে সেজহা্ল। গগ্যাঁর বাবা ছিলেন একজন চৌঁত্রিশ বছর বয়সী উদার সাংবাদিক।  পল গগ্যাঁ ফ্রান্সে লে চ্যাপেল্লে সেইন্ট মেসমিন স্কুলে তিন পড়াশোনা করার পর চোদ্দ বছর বয়সে তিনি প্যারিসের লরিওল ইনস্টিটিউটে পড়াশুনা শুরু করেন। 

  ১৮৭১ সালে, গগ্যাঁ স্টকব্রোকারের চাকরি অর্জন করেন।  স্টকব্রোকার হওয়ার পর গগ্যাঁ তাঁর ১৫ রুয়েল বরিয়ারের বাড়িতে অবসর সময়ে ছবি আঁকা শুরু করেন।  ১৮৭৩ সালে, তিনি  মেটে সোফি গাড কে বিয়ে করেন। বিয়ের পরে তাদের পাঁচ সন্তান হয়। গগ্যাঁ ছবি আঁকাকে জীবনের একমাত্র পেশা হিসাবে বেছে নিলে তাঁদের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। বিবাহ বিচ্ছেদের পর তিনি বিভিন্ন ছবি প্রদর্শনীর গ্যালারিতে ঘুরতে যেতেন ও নতুন শিল্পীদের ছবি কিনতেন।  ১৮৮১-১৮৮২ সালে ক্যামিইলে পিস্সারোর সাথে পরিচয় হয় গগ্যাঁর। তাঁর সাহায্যে প্রথম ‘ইমপ্রেসনিস্ট’ প্রদর্শনীতে গগ্যাঁ তাঁর ছবি প্রকাশ করেন। তখন নাম না করতে পারলেও সেই ছবিগুলির মধ্যে ‘দ্য মার্কেট গার্ডেনস অব্ ভগীরার্ড'(The Market Gardens of Vaugirard)  পরে খুব নাম করে।

১৮৮৪ সালে বন্ধু পিস্সারোর সাথে তিনি একটি আর্ট কালেকশান প্রকাশ করেন। গগ্যাঁ এরপর কোপেনহেগেন শহরে থাকতে শুরু করেন। সেই সময়ে তাঁর আঁকা ছবিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ‘দ্য মার্কেট গার্ডেনস অব্ ভগীরার্ড'(The Market Gardens of Vaugirard, ১৮৭৯), ‘উইন্টার ল্যান্ডস্কেপ’ (১৮৯৭), পোট্রেট অব্ ম্যাডামে গগ্যাঁ’ (Portrait of Madame Gauguin, ১৮৮০-১৮৮১) এবং ‘গার্ডেন ইন ভগীরার্ড'(Garden in Vaugirard,১৮৮১)।  ১৮৮৫ সালের জুন মাসে প্যারিসে আঁকা তাঁর ছবি ‘বায়গনেউসেস এ ডিয়েপ্পে'(Baigneuses à Dieppe) খুব সাড়া ফেলে। গগ্যাঁ বুঝতে পারেন ইউরোপীয়ান ছবিগুলি যে কোনো একটি বিষয়কে সরাসরি নকল করে আঁকা হয়। ইউরোপীয়ান ছবিতে সাংকেতিকতার ব্যবহারও অনেক কম ছিল তখন। আফ্রিকার ও এশিয়ার ছবিতে সেই  তুলনায় অনেক বেশি সাংকেতিকতা ছিল । এসময়ে তিনি একটি ভারতীয় সম্প্রদায়ের সংস্পর্শে আসেন। তাঁদের প্রভাবে ভারতীয় সাংকেতিকতা তাঁর ছবিতে আসে । তিনি ‌সেই সময় ছবিতে খুব উজ্বল রং ব্যবহার করতেন এবং প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি আঁকতেন ।

 ১৮৯২ সালে গগ্যাঁ তাঁর বিখ্যাত তৈলচিত্র ‘নাফেয়া ফা ইপোইপো’(Nafea Faa Ipoipo) ছবিটি আঁকেন । এ ছবিতে তিনি তাহিতি দ্বীপের দুই নারীর প্রতিমূর্তি অঙ্কন করেন। ২০১৪ সালে সুইস ব্যবসায়ী রুডলফ স্টায়েচলিনের থেকে নিলামে ২১ কোটি ২০ লাখ ডলারে ছবিটি কিনে নেয় কাতারের রাজপরিবার।

এসময় তিনি যে ছবিগুলো আঁকেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-  ‘উইমেন‌ বাথিং'(Women Bathing, ১৮৮৫), ‘লা বেরগ্রে ব্রেটন্নে'(La Bregère Bretonne, ১৮৮৬), ‘ব্রেটন বাথার'(Breton Bather, ১৮৮৬-৮৭) প্রভৃতি।  ভ্যান গগের সাথে পল গগ্যাঁর সম্পর্ক শুরু হয় মার্টিনিক শহরে, আর্সেন‌ পয়টিয়ার নামক একজনের গ্যালারিতে । গগের আঁকা ‘দ্য ইয়োলো হাউস'(The Yellow House) ছবিতে  ৯ সপ্তাহ ধরে কাজ করেন তাঁরা একসাথে। কিন্তু ২৩ ডিসেম্বর ১৮৮৮ সালে তাঁদের সম্পর্ক  নষ্ট হয়ে যায়। পল গগ্যাঁর বায়োগ্রাফি লেখক বেলিন্ডা থমসন খেয়াল করেন যে তাহিতির আনন্দমুখর জীবনচিত্রের দৃশ্য তাঁর ছবিতে তুলে ধরতে পারছেন না গগ্যাঁ ‘ কিন্তু তাঁর ওই সময়ের আঁকা ছবি ‘ফাটাটা তে মিট্টি'(Fatata te Miti), ‘ভাহীনে নো টে টিয়ারে'(Vahine no te tiare) খুবই জনপ্রিয় হয়। তাহিতি ছিল তাঁর অনেক ছবির বিষয় । তাঁর সেই সময়ের একটি বিখ্যাত ছবি ছিল ‘স্পিরিট অব্ দ্যা ডেড ওয়াচিং'(Spirit of the Dead Watching)।

 ১৮৯৩ সালে ফ্রান্সে ফিরে আসেন পল গগ্যাঁ । তারপর তাহিতি শহর নিয়ে নানা ছবি আঁকতে থাকেন তিনি। ১৯০০ সালে তিনি ‘লেস গুয়েপেসর’ নামক একটি পত্রিকার সম্পাদক হন। ১৯০১ সালে তাহিতি ছাড়ার আগে পর্যন্ত তিনি এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। এসময়ে ‘নোয়া নোয়া’ বলে একটি ভ্রমণপঞ্জী লেখেন তিনি। ‘নোয়া নোয়া’ প্রথম প্রকাশ পায় ১৯০১ সালে। ১৮৯৭ সালের এপ্রিল মাসে যখন‌ তিনি খোঁজ পান‌ যে তাঁর প্রিয় মেয়ে অ্যালীন নিউমোনিয়া তে মারা গেছে তখন তিনি খুব ভেঙে পড়েন। সেই বছরের শেষে তিনি শেষ‌ করেন তাঁর বিখ্যাত ছবি ‘হ্যোয়ার ডাজ উই কাম ফ্রম ? হোয়াট্ আর উই ? হ্যোয়ার আর উই গোয়িং ?’। এই ছবিটি গগ্যাঁর একটি মাস্টারপিস্ হিসেবে বিবেচনা করা হয় । এসময় গগ্যাঁর সাথে থাকতেন‌একজষ মহিলা সঙ্গী পেহুরা । এই সময়ের তাঁর উল্লেখযোগ্য ছবিগুলোর মধ্যে ছিল, ‘ও তাইতী’ (O Taiti, ১৮৯৭) ও ‘ঈভ্’ (Eve, ১৮৯৯-১৯৯০)

 এরপর গগ্যাঁ মার্কিউসাস শহরে যান । মার্কিউসাস শহরে একধরনের কারুকার্য করা বাটি দেখে সেখানেই পল গগ্যাঁ থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তারপর ‘হিভাওয়ারা দ্বীপে’ ১৯০১ সালে ‘হাঊস অব্ প্লেজার’ নামক একটি বাড়ি তৈরি‌ করেন তিনি। সেখানে ম্যারী রোজ নামক একটি মেয়ের সাথে তাঁর ঘনিষ্টতা হয়। তাঁদের একটি কন্যা সন্তান হয়। গগ্যাঁ সেখানে স্টিললাইফ এবং ল্যান্ডস্কেপ নিয়ে‌ কাজ করতে থাকেন। ১৮৯৬-৯৭ সালের একটি পুরোনো পান্ডুলিপি তিনি বই আকারে প্রকাশ করেন। বইটি ছিল রোমান ক্যাথলিক ও চার্চের ওপর। পল গগ্যাঁ তাঁর নাম দেন ‘দ্যা মর্ডান স্পিরিট এন্ড ক্যাথোলিসিজম্’। গগ্যাঁর একটি বুদ্ধিদীপ্ত প্রবন্ধও এই সময়ে প্রকাশিত হয় যাঁর নাম ছিল, ‘টেলস্ অব্ আ ড্যাবলার’ এবং একটি আত্মজীবনী লেখেন তিনি যাঁর নাম, ‘অ্যাভেন্ট এট্ অ্যাপ্রেস’।

 ১৯০৩ সালের ৮ মে এই‌ মহান চিত্রশিল্পীর মৃত্যু হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।