সববাংলায়

মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রামের জনপ্রিয় পিকনিক স্পট

পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে পিকনিক স্পট। শীতকাল হলেই সেখানে মানুষ সেখানে ভিড় জমায়, জায়গাগুলো কানায় কানায় ভরে ওঠে। আসুন এক নজরে মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রামের জনপ্রিয় পিকনিক স্পট কী আছে দেখে নিই।

১) নিউ দিঘা টাউনশিপ পিকনিক জোন (পূর্ব মেদিনীপুর)

নিউ দিঘা টাউনশিপ পিকনিক জোন পূর্ব মেদিনীপুর জেলার একটি সুপরিচিত ও পরিকল্পিত পিকনিক এলাকা। এটি মূলত সমুদ্রতীর থেকে কিছুটা ভিতরের দিকে অবস্থিত একটি প্রশস্ত খোলা অঞ্চল, যেখানে সবুজ ঘাসের মাঠ, পরিকল্পিত বসার জায়গা ও গাছের ছায়া রয়েছে। এই স্থানটি বিশেষ করে পারিবারিক পিকনিকের জন্য খুবই জনপ্রিয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি কলকাতা ও অন্যান্য শহর থেকেও বহু মানুষ শীতকালে বা ছুটির দিনে এখানে এসে দিনের পিকনিক উপভোগ করেন।

এই জায়গায় চাদর পেতে বসে খাবার খাওয়া খুব স্বাভাবিক বিষয়। অনেকেই বাড়ি থেকে খাবার এনে পরিবার বা বন্ধুদের নিয়ে আরামে সময় কাটান। নির্দিষ্ট কিছু অংশে সীমিতভাবে রান্নাও করতে দেখা যায়, তবে গ্যাস স্টোভ ব্যবহারের সময় সতর্কতা বজায় রাখা প্রয়োজন। নিউ দিঘা টাউনশিপ এলাকায় সাধারণত প্রবেশের জন্য সামান্য টিকিট নেওয়া হয়, যা স্থানীয় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে থাকে। টিকিটের মূল্য তুলনামূলকভাবে কম এবং সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যেই। এখানে শৌচালয়, পানীয় জল এবং ছোট দোকানের সুবিধাও রয়েছে, যা দিনের পিকনিককে আরও স্বস্তিদায়ক করে তোলে। নিরাপত্তার দিক থেকেও জায়গাটি বেশ নির্ভরযোগ্য এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়।

২) গোপীবল্লভপুর – কংসাবতী নদীর পাড় (পশ্চিম মেদিনীপুর)

গোপীবল্লভপুর কংসাবতী নদীর পাড় পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার অন্যতম জনপ্রিয় পিকনিক গন্তব্য। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বিস্তীর্ণ খোলা জায়গা এবং নদীর শান্ত পরিবেশ এই অঞ্চলকে পিকনিকের জন্য বিশেষ আকর্ষণীয় করে তুলেছে। স্কুল-কলেজের দল, অফিস কর্মী ও পারিবারিক গ্রুপ মিলিয়ে নানা ধরনের মানুষ এখানে নিয়মিত পিকনিক করতে আসেন। এই এলাকায় চাদর পেতে বসা, খেলাধুলা করা এবং সারাদিন অবসর কাটানো খুবই স্বাভাবিক বিষয়। এখানে রান্না করা সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য এবং অনেক দলই রান্নার সরঞ্জাম নিয়ে এসে খিচুড়ি, মাংস বা অন্যান্য খাবার প্রস্তুত করে। পরিবেশ খোলা হওয়ায় বড় দলকেও জায়গা নিয়ে তেমন সমস্যায় পড়তে হয় না।

গোপীবল্লভপুর নদীর পাড়ে পিকনিক করার জন্য সাধারণত কোনো স্থায়ী টিকিট ব্যবস্থা নেই। তবে নির্দিষ্ট সময় বা বিশেষ দিনে স্থানীয় প্রশাসন সামান্য ফি ধার্য করতে পারে। নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে নদীর খুব কাছে না যাওয়াই বাঞ্ছনীয়, বিশেষ করে বর্ষাকালে। এই স্থানটি মূলত প্রকৃতিপ্রেমী ও শান্ত পরিবেশ পছন্দকারীদের মধ্যে বেশি জনপ্রিয়। যারা শহরের কোলাহল থেকে দূরে সারা দিন খোলা আকাশের নিচে সময় কাটাতে চান, তাদের জন্য এটি একটি আদর্শ পিকনিক স্পট।

৩) নারায়ণগড় নদীপাড় এলাকা (পশ্চিম মেদিনীপুর)

নারায়ণগড় অঞ্চলের নদীপাড় সংলগ্ন খোলা জায়গাগুলো স্থানীয়ভাবে পিকনিকের জন্য পরিচিত। এটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে খুব বেশি প্রচারিত না হলেও, আশপাশের মানুষদের মধ্যে জায়গাটি বেশ জনপ্রিয়। নিরিবিলি পরিবেশ, কম ভিড় এবং প্রাকৃতিক দৃশ্য এই এলাকার প্রধান আকর্ষণ।

এখানে পিকনিক করতে আসা মানুষরা সাধারণত পরিবার বা ছোট গ্রুপে এসে চাদর পেতে বসেন। খাবার খাওয়া ও বিশ্রামের জন্য এটি উপযোগী একটি স্থান। সীমিত আকারে রান্নাও করা যায়, বিশেষত যদি আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে আসা হয়। বড় আকারের পিকনিকের চেয়ে মাঝারি ও ছোট দলের জন্য এই জায়গাটি বেশি উপযুক্ত।

নারায়ণগড় নদীপাড়ে সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট টিকিট পদ্ধতি চালু নেই। তবে কিছু জায়গায় স্থানীয় মানুষের অনুমতি নেওয়া ভালো। সরকারি বা বাণিজ্যিক রূপে এটি খুব বেশি উন্নত নয়, তাই এখানে আসার সময় প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে রাখাই ভালো। এই স্থানটি বিশেষ করে তাদের মধ্যে জনপ্রিয় যারা শান্ত পরিবেশে নির্ভার পিকনিক করতে চান এবং যাদের অতিরিক্ত ভিড় বা কোলাহল পছন্দ নয়।

৪) কেশিয়াড়ি বনাঞ্চল সংলগ্ন এলাকা (পশ্চিম মেদিনীপুর)

কেশিয়াড়ি অঞ্চলের বনাঞ্চল সংলগ্ন কিছু অংশ দিনের বেলায় পিকনিকের জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি মূলত প্রাকৃতিক পরিবেশে গঠিত একটি এলাকা যেখানে ঘন গাছপালা ও ছায়াযুক্ত জায়গা রয়েছে। প্রকৃতিপ্রেমীদের মধ্যে এই স্থানটি ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এখানে সাধারণত ছোট ও মাঝারি গ্রুপ পিকনিক করতে আসে। চাদর পেতে বসা, হালকা রান্না করা এবং কয়েক ঘণ্টা সময় কাটানো সম্ভব। তবে যেহেতু এটি সম্পূর্ণ পরিকল্পিত পিকনিক পার্ক নয়, তাই নিরাপত্তা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে নিজস্ব সচেতনতা বজায় রাখা জরুরি।

টিকিট সংক্রান্ত নির্দিষ্ট কোনো স্থায়ী নিয়ম এখানে নেই। অধিকাংশ সময় কোনো প্রবেশমূল্যও নেওয়া হয় না। তবে বনাঞ্চল হওয়ায় স্থানীয় প্রশাসনের নিয়ম মেনে চলা এবং নির্দিষ্ট সীমার বাইরে না যাওয়াই শ্রেয়। এই জায়গাটি বেশি পছন্দ করেন তারা, যারা একটু ভিন্ন পরিবেশে, গাছগাছালির মাঝে শান্তভাবে সময় কাটাতে চান এবং শহুরে ভিড় এড়িয়ে প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে চান।

৫) কানকড়াঝোড় (ঝাড়গ্রাম)

কানকড়াঝোড় ঝাড়গ্রাম জেলার একটি সুপরিচিত পিকনিক ও প্রকৃতিভিত্তিক গন্তব্য। চারদিকে শালবন ও পাহাড়ি পরিবেশের কারণে এটি পর্যটক ও স্থানীয় মানুষের কাছে সমানভাবে জনপ্রিয়। এখানে বিশেষ করে শীতকালে ও বছরের শুরুতে প্রচুর মানুষ পিকনিক করতে আসে।

এই এলাকায় খোলা জায়গায় চাদর পেতে বসা এবং খাবার খাওয়া খুব সাধারণ বিষয়। অনেক দলই রান্নার সরঞ্জাম নিয়ে এসে নিজেদের মতো করে খাবার প্রস্তুত করে। পরিবেশ প্রাকৃতিক হলেও পুলিশ বা স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি কিছুটা থাকে, যার ফলে নিরাপত্তার দিক থেকে জায়গাটি তুলনামূলকভাবে বিশ্বাসযোগ্য।

কানকড়াঝোড়ে প্রবেশের জন্য কোনো স্থায়ী টিকিট ব্যবস্থা সবসময় থাকে না, তবে নির্দিষ্ট পর্যটন অঞ্চলে সামান্য ফি আরোপ করা হতে পারে। পার্কিং ও বসার জন্য জায়গা পাওয়া যায়, যদিও ছুটির দিনে ভিড় বেশি হতে পারে। এই স্থানটি মূলত তরুণ ও প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের মধ্যে খুবই জনপ্রিয়, যারা একদিনের জন্য শহর থেকে দূরে শান্ত পরিবেশে সময় কাটাতে চান।

৬) চিল্কিগড় – কনকদুর্গা মন্দির সংলগ্ন এলাকা (ঝাড়গ্রাম)

চিল্কিগড় অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে ঝাড়গ্রামের একটি পরিচিত পিকনিক স্পট হিসেবে বিবেচিত। কনকদুর্গা মন্দির সংলগ্ন খোলা জায়গা, গাছের ছায়া ও সবুজ পরিবেশ এই স্থানকে পিকনিকের জন্য উপযুক্ত করে তুলেছে।

এখানে পরিবার, বন্ধু ও বিভিন্ন সংগঠনের দল দিনের বেলায় এসে পিকনিক করে। চাদর পেতে বসা ও খাবার খাওয়া খুবই স্বাভাবিক দৃশ্য। সীমিত আকারে রান্নাও করা হয়, তবে পরিবেশ পরিষ্কার রাখা এবং ধর্মীয় স্থানের মর্যাদা বজায় রাখা জরুরি।

চিল্কিগড়ে সাধারণত কোনো স্থায়ী টিকিট ব্যবস্থা নেই। তবে বিশেষ দিনে বা উৎসবের সময় কিছু এলাকায় প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। এখানে বসার জায়গা এবং পার্কিংয়ের সুবিধা মোটামুটি পাওয়া যায়। এই স্থানটি মূলত পরিবার ও মধ্যবয়সী দর্শনার্থীদের মধ্যে বেশি জনপ্রিয়, যারা শান্ত ও ধর্মীয় পরিবেশে সময় কাটাতে পছন্দ করেন।

৭) হাতিবাড়ি – সুবর্ণরেখা নদীর তীর (ঝাড়গ্রাম)

হাতিবাড়ি ঝাড়গ্রামের একটি পরিচিত নদীতীরবর্তী পিকনিক স্পট। সুবর্ণরেখা নদীর ধারে অবস্থিত এই এলাকা প্রাকৃতিক দৃশ্য ও শান্ত পরিবেশের জন্য জনপ্রিয়। এখানে মানুষ পরিবার বা বন্ধুবান্ধব নিয়ে এসে চাদর পেতে বসে, খাবার খায় এবং সময় কাটায়। অনেক দলই নিজে রান্নার ব্যবস্থা করে নেয়, বিশেষ করে শীতকালে। নদীর কাছাকাছি হওয়ায় পরিবেশ বেশ মনোরম হলেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

এই জায়গায় প্রবেশের জন্য সাধারণত কোনো নিয়মিত টিকিট নেই, তবে পর্যটন মৌসুমে বা নির্দিষ্ট স্থানে স্থানীয়ভাবে সামান্য ফি নেওয়া হতে পারে। নিরাপত্তা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি ব্যক্তিগতভাবে খেয়াল রাখা জরুরি। হাতিবাড়ি মূলত শান্ত প্রকৃতি ভালোবাসেন এমন মানুষদের মধ্যে জনপ্রিয়, যারা নদীর পাশে নিশ্চিন্তে এক দিন কাটাতে চান।

এখানে উল্লিখিত পিকনিক স্পটগুলি ছাড়াও বর্ধমানে আরও যে পিকনিক স্পট রয়েছে যেগুলো মূলত প্রাইভেট পিকনিক স্পট। তবে সেই সমস্ত জায়গাকে এখানে উল্লেখ করা হয়নি কারণ আগে সমস্ত পিকনিক মানেই বড় খোলা জায়গায় বা মাঠে পরিবার বা বন্ধুবান্ধব নিয়ে একসঙ্গে রান্না বান্না করে খাওয়া দাওয়া করা বোঝাত। বর্তমানে অনেকক্ষেত্রেই দেখা যায় পিকনিক বলতে দল বেঁধে রিসোর্ট ভাড়া করে সেখানে খাওয়া দাওয়া করাকে বোঝায়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে পিকনিকের সংজ্ঞা বিভিন্ন হওয়ার ফলে কোন জায়গাকে পিকনিক স্পট বলা হবে আর কোন জায়গাকে বলা হবে না তাই নিয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হচ্ছে।

তাই সববাংলায় এর থেকে “পিকনিক স্পট” আখ্যা দেওয়ার জন্য কিছু শর্ত বানানো হয়েছে এবং যে জায়গাগুলো সেই শর্তাবলী মানছে তাদের পিকনিক স্পটের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সেই সমস্ত শর্তাবলীসমেত পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় পিকনিক স্পটগুলো নিয়ে বিস্তারিত পড়ুন এখানে


সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২৫


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. নিজস্ব সংকলন

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading