স্বাধীন ভারতের প্রথম মামলাটি মৌলিক অধিকার বিষয়ক কয়েকটি প্রশ্নকে কেন্দ্র করে দানা বেঁধেছিল। কমিউনিস্ট নেতা এ কে গোপালন (A K Gopalan) বিনা বিচারে নিজের আটক থাকাকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। তাঁকে মূলত প্রিভেন্টিটিভ ডিটেনশন অ্যাক্ট ১৯৫০-এর অধীনে আটক রাখা হয়েছিল এবং তিনি এক্ষেত্রে তাঁর মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন হয়েছে বলে অভিযোগ জানিয়েছিলেন৷ এই মামলাটি এ কে গোপালন বনাম মাদ্রাজ হাইকোর্ট মামলা নামে পরিচিত আবার একে প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন কেসও বলা হয়ে থাকে। এই মামলার রায় সংবিধানে বর্ণিত মৌলিক অধিকারের কয়েকটি বিষয়কে বিশদে বর্ণনা করেছিল, নিঃসন্দেহে যার মূল্য ঐতিহাসিক।
সাম্প্রতিক পোস্ট
এ কে গোপালন যিনি সংক্ষেপে একেজি নামেও পরিচিত ছিলেন একজন বিশিষ্ট কমিউনিস্ট নেতা। বহু বছর ধরে তিনি মাদ্রাজ রাজ্য (বর্তমানে তামিলনাড়ু) দ্বারা প্রিভেন্টিটিভ ডিটেনশন অ্যাক্ট ১৯৫০-এর অধীনে আটক ছিলেন। আসলে ১৯৪৭ সাল থেকে বিনা বিচারে তাঁকে আটক রাখা হয়েছিল। ১৯৫০ সালে উক্ত প্রতিরোধমূলক আটক আইন দ্বারা তাঁকে আবার আটক করা হলে তিনি ভারতীয় সংবিধানের ৩২(১) অনুচ্ছেদের অধীনে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন যা হেবিয়াস কর্পাস রিট নামে পরিচিত। তিনি অভিযোগ করেন যে, তাঁকে আটক করার এই আদেশ সংবিধানের ১৪, ১৯ এবং ২১ অনুচ্ছেদে বর্ণিত মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করেছে। ১৯৫০-এর প্রতিরোধমূলক আটক আইনের ৩(১) ধারার অধীনে প্রদত্ত আটকের আদেশের বিরুদ্ধে গোপালনের করা মামলাটি ছিল স্বাধীন ভারতের প্রথম মামলা।
এ কে গোপালন কেবল ১৪, ১৯ ও ২১ ধারায় বর্ণিত মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের কথা বলেই ক্ষান্ত হননি, তিনি নিজের মামলার সপক্ষে আরও যুক্তি দেন যে, তাঁর পরিস্থিতির ক্ষেত্রে ২১ অনুচ্ছেদে উল্লিখিত ‘আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি’ অনুসরণ করা হয়নি, ফলে ২১ ধারাটিরও লঙ্ঘন করা হয়েছে। এছাড়াও তিনি দাবি করেন যে, তাঁকে গ্রেপ্তারের কারণ সম্পর্কে অবহিত করা হয়নি, যা সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে বর্ণিত এই মৌলিক অধিকারটিকে লঙ্ঘন করে।
এ কে গোপালনের দায়ের করা এই মামলা মূল যে প্রশ্নগুলি আদালতের সামনে তুলে ধরেছিল, সেগুলি হল, প্রতিরোধ ও আটক আইন ১৯৫০ ভারতীয় সংবিধানের ১৪, ১৯ এবং ২১ ধারা লঙ্ঘন করেছে কিনা, ১৯ এবং ২১ অনুচ্ছেদের মধ্যে কোন যোগসূত্র রয়েছে কিনা, ভারতীয় সংবিধানে বর্ণিত ‘আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি’র অর্থ এবং আমেরিকান সংবিধানে উল্লিখিত ‘আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া’র অর্থ একই কিনা এবং সবশেষে গোপালনের প্রাকৃতিক ন্যায়বিচার লঙ্ঘিত হচ্ছে কিনা।
মামলার সপক্ষে আবেদনকারী আরও বেশ কয়েকটি যুক্তি দিয়েছিলেন। আবেদনকারী যেমন গ্রেপ্তারের কারণ জানার অধিকারের কথা বলেছিলেন তেমনি বলেন, রাজ্য যেহেতু তাঁকে আটকের নির্দেশ দিয়েছে, অতএব ভারত ভূখন্ডের মধ্যেই বিভিন্ন জায়গায় চলাফেরা করবার অধিকার তাঁর নেই। এই ধরনের আটকের ক্ষেত্রে সংবিধানের ১৯(৫) ধারার অধীনে আটকের যুক্তিসঙ্গত কারণ দেখানো রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কর্তব্য। অথচ তা হয়নি।
আবেদনকারী এও বলেন যে, আমেরিকান সংবিধানে বর্ণিত ‘আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া’ এবং ভারতীয় সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে উল্লিখিত ‘আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি’ একই অর্থ বহন করে। আমেরিকান সংবিধান মৌলিক এবং পদ্ধতিগত, উভয়প্রকার সুরক্ষাই প্রদান করে অথচ ভারতীয় সংবিধানে কেবল পদ্ধতিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়।
স্পষ্ট করে বলা হয় যে, আইন মানে কেবল আইনসভা কর্তৃক প্রণীত নীতি নয়, আইন শব্দটির অর্থ আসলে প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতি, যা তাঁর ক্ষেত্রে মান্যতা পায়নি বলেই গোপালন মনে করেন। এই প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতি আসলে প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের স্বেচ্ছাচারী কর্ম থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে প্রদত্ত একটি আইনি সুরক্ষা। প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতিগুলির মধ্যে অন্যতম হল, বিচারককে সবরকম পক্ষপাত থেকে দূরে থাকতে হবে, মামলার সিদ্ধান্ত দেওয়ার সময় কোন পক্ষের কথা শোনা বিচারকের অনুচিত এবং কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর কারণও বিচারককে ব্যাখা করতে হবে৷ এ কে গোপালন তাঁর ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতিগুলি অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ জানিয়েছিলেন।
আবেদনকারীর বিপরীতে সরকার পক্ষের আইনজীবীরাও পাল্টা কিছু যুক্তির বিন্যাস করেছিলেন। তাঁদের মতে, এই প্রতিরোধমূলক আটক আইন ১৯৫০ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১ লঙ্ঘন করে না এবং ২২ অনুচ্ছেদ অনুসারেই এই আইন নির্মিত হয়েছে। তাঁরা আরও যুক্তি দেন যে, ২১ অনুচ্ছেদে বর্ণিত ‘আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি’ এক্ষেত্রে যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে, কারণ পার্লামেন্ট তালিকা ১-এর এন্ট্রি ৯-এর অধীনে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আটক সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের জন্য উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ। আরও যুক্তি দেওয়া হয় যে, এই প্রতিরোধমূলক আটক আইন কোনও আইন লঙ্ঘন করে না, কারণ এটি সংসদ দ্বারা অনুসৃত আইনি প্রক্রিয়ার ফলাফল।
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ১৯৫০ সালের ১৯ মে এই মামলার ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেছিল। সুপ্রিম কোর্টের ছয় জন বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ এই মামলার শুনানি করেছিল। সেই ছয়জন বিচারপতি হলেন, এম এইচ কানিয়া (সিজেআই), বিচারপতি সাইয়িদ ফজল আলী, বিচারপতি এম. পতঞ্জলি শাস্ত্রী, বিচারপতি মেহর চাঁদ মহাজন, বিচারপতি বি কে মুখার্জি ও বিচারপতি এস আর দাস।
সুপ্রিম কোর্ট জানায় যে, প্রতিরোধমূলক আটক আইন ১৯৫০-এর সঙ্গে অনুচ্ছেদ ১৯-এর কোন বিরোধ নেই। কোনরকম প্রতিরোধমূলক বা শাস্তিমূলক আটক অনুচ্ছেদ ১৯-এর অন্তর্ভুক্ত নয়। আদালত এও জানিয়েছে যে, ১৯(১) ধারা সেইসব ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় যাদের স্বাধীনতা আইন দ্বারা সীমিত। নানারকম ব্যাখা এবং বিশ্লেষণ করে আদালত এই সিদ্ধান্তে এসেছে যে, প্রতিরোধমূলক আটক আইন ১৯৫০ ভারতীয় সংবিধানের ১৯ ও ২১ ধারাকে লঙ্ঘন করে না। এছাড়াও আদালত জানিয়ে দিয়েছিল যে, সংবিধানের ১৯ এবং ২১ অনুচ্ছদের মধ্যে কোনরকম সম্পর্ক নেই। আদালত আরও জানায় যে, এই মামলায় প্রাকৃতিক বিচারের নীতি লঙ্ঘন করা হয়নি। এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতিকে বিশদে ব্যাখা করেছিল আদালত, যা প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারীতার বিরূদ্ধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এইসব কারণেই আদালত অবশেষে এ কে গোপালনের দায়ের করা রিট পিটিশন বাতিল করে দিয়েছিল।
এখানে উল্লেখ্য যে আদালতের ছয় বিচারপতির মতের মিল ছিল না, কেউ কেউ ভিন্নমতও পোষণ করেছিলেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতির মতে সংবিধানের ১৪ ধারা, যা আটকের কারণ প্রকাশে বাধা দেয়, তা অসাংবিধানিক। যদিও বিচারপতি ফজল আলী ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন। স্বাধীন ভারতের প্রথম মামলাটিতে মৌলিক অধিকারের এমন সব দিক নিয়ে আলোচনা করেছিল আদালত যা নিঃসন্দেহে ছিল ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান