সববাংলায়

পিরোজপুর জেলা

বাংলাদেশ ৬৪টি জেলাতে বিভক্ত। বেশীরভাগ জেলাই স্বাধীনতার আগে থেকে ছিল, কিছু জেলা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে গঠিত, আবার কিছু জেলা একটি মূল জেলাকে দুভাগে ভাগ করে তৈরি হয়েছে মূলত প্রশাসনিক সুবিধের কারণে। প্রতিটি জেলাই একে অন্যের থেকে যেমন ভূমিরূপে আলাদা, তেমনি ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকেও স্বতন্ত্র। প্রতিটি জেলার এই নিজস্বতাই আজ বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করেছে। সেরকমই একটি জেলা হল পিরোজপুর (Pirojpur)।

পিরোজপুর জেলা বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে স্বরূপকাঠির বিখ্যাত ভাসমান পেয়ারা বাজার, দুর্লভ কালোজিরা চাল ও জগদ্বিখ্যাত মাল্টা এবং দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র কাঠের তৈরি মমিন মসজিদ। নদীমাতৃক এই জেলা এককথায় তার নিজের গুণেই অনন্য।

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের বরিশাল বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল পিরোজপুর জেলা। ১৮৫৯ সালের ২৮ অক্টোবর পিরোজপুর মহকুমা স্থাপিত হয় এবং ১৮৮৫ সালে পিরোজপুর পৌরসভা। তবে সম্পূর্ণ পৃথক একটি জেলা হিসেবে পিরোজপুর ১৯৮৪ সালে আত্মপ্রকাশ করে।

উত্তরে বরিশাল জেলা ও গোপালগঞ্জ জেলা, দক্ষিণে বরগুনা জেলা, পূর্বে ঝালকাঠি জেলাবরগুনা জেলা এবং পশ্চিমে বাগেরহাট জেলা ও সুন্দরবন ঘিরে রয়েছে সমগ্র জেলাটিকে। পশ্চিমে বলেশ্বর নদী পিরোজপুরকে বাগেরহাট থেকে আলাদা করেছে।
বলেশ্বর এখানকার প্রধান নদী। এই নদীটি পিরোজপুরের মাটিভাঙ্গা থেকে উৎপন্ন হয়ে তুষখালীর কাছে কচানদীর সাথে এসে মিলিত হয়ে সেখান থেকে বঙ্গোপসাগরে এসে মিশেছে। আড়িয়াল খাঁ’র শাখা নদী সন্ধ্যা এই জেলার অন্যতম প্রধান নদী। এছাড়াও দামোদর, কচা, সন্ধ্যা, কালিগঙ্গা,গাবখান পোনা, ইত্যাদি নদী রয়েছে। 

আয়তনের বিচারে পিরোজপুর জেলা মোট ১,২৭৭.৮০ বর্গকিমি স্থানজুড়ে অবস্থান করছে। ২০১১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী জনসংখ্যার বিচারে পিরোজপুর জেলা সমগ্র বাংলাদেশে আটচল্লিশতম জনবহুল জেলা। এখানে প্রায় ১১,১৩,২৫৭ জন মানুষের বাস।

পিরোজপুর জেলার নামকরণ সম্পর্কে একটি ছড়া প্রচলিত আছে-

‘‘ফিরোজ শাহের আমল থেকে ভাটির দেশের ফিরোজপুর,

বেনিয়া চক্রের ছোঁয়াচ লেগে পাল্টে হলো পিরোজপুর।’’

তবে যতদূর জানতে পারা যায় বাংলার সুবেদার শাহ্ সুজা আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীর জুমলার কাছে হেরে দক্ষিণবঙ্গে এসে সুগন্ধা নদীর পাড়ে কেল্লা তৈরি করে আত্মগোপন করেন। মীর জুমলার বাহিনী খবর পেয়ে এখানেও হানা দিলে শাহ্ সুজা তাঁর স্ত্রীকে তাঁর পুত্রের দেখভালের জন্য প্রাসাদে রেখে দুই কন্যাসহ আরাকানে পালিয়ে যান এবং শেষপর্যন্ত সেখানে তিনি অন্য এক রাজার চক্রান্তে নিহত হন। পরবর্তীকালে তাঁর স্ত্রী পুত্র সহ বর্তমান পিরোজপুরের পার্শ্ববর্তী দামোদর নদীর কাছে আশ্রয় নেন। শাহ্ সুজার পুত্রের নাম ছিল ফিরোজ এবং তাঁর নাম অনুসারে এই অঞ্চলের নাম হয় ফিরোজপুর যা কালক্রমে লোকমুখে পরিবর্তিত হয়ে দাঁড়ায় পিরোজপুর।

বরিশাল ও খুলনা জেলার মধ্যবর্তীস্থানে অবস্থিত হওয়ায় এই দুই অঞ্চলের ভাষার প্রভাব পিরোজপুর এলাকাবাসীর কথ্য ভাষায় পরিলক্ষিত হয়। তবে পিরোজপুরের কোন আঞ্চলিক ভাষা নেই, নেই বিশেষ ভাষা-ভাষী গোষ্ঠীও।  

পিরোজপুর জেলা ৭টি উপজেলা, ৭টি থানা, ৪টি পৌরসভা, ৫৪টি ইউনিয়ন ও ৩টি সংসদীয় আসন নিয়ে গঠিত। এখানকার উপজেলাগুলি হল- ভান্ডারিয়া, কাউখালী, মঠবাড়িয়া, নাজিরপুর, পিরোজপুর সদর, নেছারাবাদ, ইন্দুরকানী।

বোরো, আমন ও রোপা আমন ধান এই জেলার প্রধান ফসল। অর্থকরী ফসলের মধ্যে কলা, পান, পেয়ারা, আমড়া, নারকেল ও সুপুরি বিশেষভাবে উল্লখযোগ্য। নেছারাবাদের (স্বরূপকাঠি) পেয়ারা এবং বরিশালের আমড়া এখানে যথেষ্ট উৎপাদিত হয়।

এই জেলার দর্শনীয় স্থান বলতে বলেশ্বর ব্রীজ, ইন্দুরকানি ব্রীজ, মঠবাড়ীয়ার মাঝের চর, সাপলেজা কুঠি বাড়ি, মমিন মসজিদ, শামীম লজ, রায়েরকাঠী জমিদার বাড়ী ও শিব মন্দির, স্বরূপকাঠির বিখ্যাত ভাসমান পেয়ারা বাজার বিশেষ উল্লেখযোগ্য। বুড়িরচর গ্রামের আকন বাড়িতে কাঠের মমিন মসজিদ দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র কাঠের তৈরি মুসলিম স্থাপত্যশিল্প।

এই জেলার কবিগান, জারিগান, থিয়েটার, যাত্রা,  নৌকাবাইচ, লাঠিখেলা, বিয়ের সয়লা ইত্যাদি এই জেলার লোকসংস্কৃতির অঙ্গ। প্রবাদ প্রবচন ও বিয়ের গানের জন্য পিরোজপুর বিশেষভাবে বিখ্যাত। 

এই জেলার কৃতী সন্তানদের মধ্যে আহসান হাবীব, বিশ্বজিৎ ঘোষ, আবুল হাসান,  ক্ষেত্রগুপ্ত,  মুহম্মদ হাবিবুর রহমান, এম এ বারী, এমদাদ আলী ফিরোজী, শেখ শহীদুল ইসলাম, খান মোহাম্মদ মোসলেহ্ উদ্দিনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। 


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading