ভূগোল

বরগুনা জেলা

বাংলাদেশ ৬৪টি জেলাতে বিভক্ত। বেশীরভাগ জেলাই স্বাধীনতার আগে থেকে ছিল, কিছু জেলা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে গঠিত, আবার কিছু জেলা একটি মূল জেলাকে দুভাগে ভাগ করে তৈরি হয়েছে মূলত প্রশাসনিক সুবিধের কারণে। প্রতিটি জেলাই একে অন্যের থেকে যেমন ভূমিরূপে আলাদা, তেমনি ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকেও স্বতন্ত্র। প্রতিটি জেলার এই নিজস্বতাই আজ বাংলাদেশ কে সমৃদ্ধ করেছে। সেরকমই একটি জেলা হল বরগুনা (Barguna)।

বরগুনা জেলা যেমন নারকেল. সুপুরি ও মাছের জন্য বিখ্যাত তেমনি এখানে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনভূমি সুন্দরবন, বিহঙ্গ দ্বীপ, পায়রা নদীর সূর্যোদয় বরগুনাকে অনন্য করে তুলেছে। 

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের বরিশাল বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল বরগুনা জেলা।  ১৯৬৯ সালে বরগুনা মহকুমা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় এবং ১৯৮৪ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জেলা হিসেবে বরগুনা আত্মপ্রকাশ করে৷ 

এই জেলার উত্তরে রয়েছে ঝালকাঠি, বরিশাল, পিরোজপুর ও পটুয়াখালী, দক্ষিণে পটুয়াখালী ও বঙ্গোপসাগর। পূর্ব দিকে অবস্থিত পটুয়াখালী এবং পশ্চিমে পিরোজপুর ও বাগেরহাট ঘিরে রয়েছে সমগ্র জেলাটিকে। বরগুনা জেলাটিকে চারপাশ দিয়ে ঘিরে আছে অসংখ্য নদ-নদী আর খাল। পদ্মা, মেঘনা, আড়িয়াল খাঁ ও মধুমতি নদীর অববাহিকায় অবস্থিত বরগুনা জেলা মূলত প্রকৃতি, নদী ও সাগর নির্ভর। এই জেলার প্রধান নদ-নদীর মধ্যে পায়রা, বিষখালী, বলেশ্বর ও হরিণঘাটা উল্লেখযোগ্য। এছাড়া খাকদোন, টিয়াখালী, টিয়াখালী দোন, বগীরখাল, বেহুলা নদী, চাকামা্ইয়া দোন, নিদ্রাখাল, আমতলী নদী ইত্যাদি এই জেলার অন্যতম প্রধান নদী ও খাল। এগুলি ছাড়াও এই জেলার বিভিন্ন স্থানে কমপক্ষে ৩০০টি প্রাকৃতিক খাল রয়েছে। এই জেলার মোট আয়তনের প্রায় ২২ ভাগ অংশ অর্থাৎ মোট ১৬০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে নদী প্রবাহিত হয়েছে।

আয়তনের বিচারে বরগুনা জেলা সমগ্র বাংলাদেশে ৩০তম বৃহত্তম জেলা। এই জেলার আয়তন প্রায় ১৯৩৯ বর্গকিমি। ২০১১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী জনসংখ্যার বিচারে বরগুনা জেলা সমগ্র বাংলাদেশে ৫৮তম জনবহুল জেলা। শেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী বরগুনা জেলার মোট জনসংখ্যা প্রায় ৮,৯২,৭৮১ জন। এর মধ্যে পুরুষ প্রায় ৪,৩৭,৪১৩ জন এবং মহিলা প্রায় ৪,৫৫,৩৬৮ জন। 

বরগুনা জেলার নামকরনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য পাওয়া না গেলেও প্রচলিত জনশ্রুতি বলে উত্তরাঞ্চলের কাঠ ব্যবসায়ীরা এই অঞ্চলে কাঠ নিতে এসে খরস্রোতা খাকদোন নদী অতিক্রম করতে গিয়ে জোয়ার বা বড় গোনের জন্য এখানে অপেক্ষা করত বলে এ স্থানের নাম ‘বড় গোনা’ যা কালক্রমে বরগুনা নামে পরিণত হয়। আবার অন্য একটি মতানুযায়ী স্রোতের বিপরীতে গুন(দড়ি) টেনে নৌকা অতিক্রম করতে হয় বলে এই স্থানের নাম বরগুনা। অনেকে আবার মনে করেন, বরগুনা নামে কোন ক্ষমতাবান রাখাইন অধিবাসীর নামানুসারে এই জেলার নাম বরগুনা হয়েছে বলে মনে করা হয়।

বরগুনায় বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সংখ্যাই সর্বাধিক। তবে রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষেরা নিজেদের মধ্যে নিজস্ব আরাকাইন ভাষায় কথা বলে থাকেন। এই জেলায় চার ধর্মের লোক বাস করেন – মুসলমান ও হিন্দু, রাখাইন (বৌদ্ধ) ও খৃষ্ট ধর্মাবলম্বী মানুষ বাস করে থাকেন। 

বরগুনা জেলা ৬টি উপজেলা, ৬টি থানা, ৪টি পৌরসভা, ৪২টি ইউনিয়ন ও ২টি সংসদীয় আসন নিয়ে গঠিত। এখানকার অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। ধান, চিনাবাদাম, সর্ষে,সূর্যমুখী ও বিভিন্ন ধরনের ডাল এই জেলার প্রধান শস্য। এখানে একসময় পাট চাষ হত, কিন্তু ক্রমেক্রমে তা অর্থকারী ফসল হিসেবে জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলে।উপকূলবর্তী জেলা হওয়ায়, বরগুনার অনেকেই মৎসচাষের সাথে যুক্ত রয়েছেন। 

বরগুনা জেলার উল্লেখযোগ্য ভ্রমণ স্থানের মধ্যে রয়েছে – সোনাকাটা সমুদ্র সৈকত, লালদিয়া বন, রাখাইন পল্লী, মোগল আমলে স্থাপিত বিবিচিনি মসজিদ। এছাড়া বরগুনার তালতলী উপজেলা থেকে চব্বিশ কিলোমিটার দূরে সুন্দরবনের এক অংশের বিশাল বনভূমি নিয়ে তৈরী হয়েছে টেংরাগিরি ইকো পার্ক যা স্থানীয়ভাবে ফাতরার বন বা পাথরঘাটার বন বা হরিনঘাটার বন নামেও পরিচিত। এখানকার টাউন হল চত্বরে অবস্থিত রয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি জাগরিত ভাস্কর্য “অগ্নিঝরা একাত্তর “। ১৯৭১ সালের ২৯ ও ৩০ মে পাকিস্তানি বাহিনী বরগুনা মহাকুমা জেলে প্রায় শতাধিক নিরস্ত্র কয়েদিদের নৃশংসভাবে হত্যা করে। এই কারণেই এখানকার টাউন হলের নতুন নামকরণ করা হয়েছে স্বাধীনতা স্কয়ার। এছাড়া ঘূর্ণিঝড় সিডরে এই জেলার ১৩৪৫ জন মানুষ নিহত হয়। যার মধ্যে নলটোনা ইউনিয়নের গর্জন বুনিয়া গ্রামেই নিহত হয়েছিল ২৯ জন মানুষ। তাঁদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে সম্প্রতি নির্মিত হয়েছে সিডর স্মৃতি স্তম্ভ।

এই জেলার কৃতী সন্তানদের মধ্যে শাহজাদা আবদুল মালেক খান, অধ্যাপক মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান (উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), হুমায়ুন কবির হিরু, জাফরুল হাসান ফরহাদ উল্লেখযোগ্য।

বরগুনা জেলার দক্ষিণ অঞ্চলে বসবাসরত রাখাইন সম্প্রদায়ের বৈচিত্র্যময় কুটির শিল্প, জলক্রীড়া, ফানুস ছোড়া, পিঠা উৎসব এই জেলার অন্যতম লোকসংস্কৃতি। রাখাইনদের অন্যতম অনুষ্ঠান বাঘ শিকার, প্রেমময় নৃত্যানুষ্ঠান কিন্নর নাচ, রাক্ষস নাচ, বানর নাচ ইত্যাদি।

এই জেলা নারকেল ও সুপুরি চাষের জন্য বিখ্যাত। এছাড়াও এখানকার বিখ্যাত খাবার তালের মোরব্বা,চুইয়া পিঠে,শিরনি চ্যাবা পিঠে, মুইট্টা পিঠে, আল্লান, বিসকি, নারকেলের সুরুয়া, চালের রুটি, ইত্যাদি।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

রচনাপাঠ প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চান?



এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন