সববাংলায়

প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়

উনিশ ও বিশ শতকের মধ্যবর্তী পর্যায়ে অত্যন্ত জনপ্রিয় রবীন্দ্রানুসারী গল্পকার ছিলেন প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় (Prabhat Kumar Mukhopadhyay)। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং তাঁকে ছোটগল্পের জগতে ‘সব্যসাচী অর্জুন’ আখ্যা দিয়েছিলেন। প্রথম জীবনে কিছু কবিতাও লিখেছিলেন যেগুলি সবই ‘ভারতী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। সমগ্র সাহিত্য জীবনে প্রভাতকুমার মোট ১৪টি উপন্যাস এবং প্রায় ১০০টি ছোটগল্প লিখেছিলেন। ‘রমাসুন্দরী’ (১৯০৮), ‘নবীন সন্ন্যাসী’ (১৯১২), ‘রত্নদীপ’ (১৯১৫) ইত্যাদি তাঁর লেখা শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। রবীন্দ্রনাথের পরে এবং শরৎচন্দ্রের আগে বাংলা সাহিত্যে তাঁর সমকক্ষ সরস গল্প লেখার দক্ষতা ছিল না কারও।

১৮৭৩ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি বর্ধমানে কালনার কাছে ধাত্রীগ্রামে মাতুলালয়ে প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের জন্ম হয়। তাঁর বাবা জয়গোপাল মুখোপাধ্যায় পূর্ব ভারতীয় রেলের সিগনালার পদে কাজ করতেন। বদলির চাকরি হওয়ার সুবাদে ঝাঝা, জামালপুর, দিলদারনগর ইত্যাদি বহু স্থানে তাঁকে যেতে হয়েছিল পরিবারসহ, ফলে শৈশবেই প্রভাতকুমারের বহু স্থান ভ্রমণ করা হয়ে যায়। তাঁর মায়ের নাম ছিল কাদম্বরী দেবী। তাঁদের আদি পৈতৃক নিবাস ছিল হুগলি জেলার গুড়াপ গ্রামে। বাবার বদলির চাকরির সূত্রে বহু জায়গায় ঘুরলেও তাঁর শৈশবের বেশিরভাগ সময় কেটেছে জামালপুরে। প্রথমে হালিশহরের ব্রজবালা দেবীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ স্থির করা হলেও ব্রজবালা দেবীর অকালমৃত্যু ঘটে। তারপর সরলা দেবীর সঙ্গে প্রভাতকুমারের বিবাহ দিতে চেয়েছিলেন সরলা দেবীর মামা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, কিন্তু দ্বিতীয় বিবাহে মত দেননি প্রভাতকুমারের মা। ফলে এই সিদ্ধান্তে ব্যথিত হয়ে এরপর আর কখনোই বিবাহ করেননি প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় ।     

জামালপুরের উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু হয়েছিল প্রভাতকুমারের। তাঁর মাসতুতো দাদা রাজেন্দ্রচন্দ্র মুখোপাধ্যায় এই স্কুলেই পড়াতেন এবং তাঁর তত্ত্বাবধানেই প্রভাতকুমারের পড়াশোনা চলতে থাকে। ১৫ বছর বয়সে জামালপুর এইচ সি ই স্কুল থেকে দ্বিতীয় বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। তারপরে পাটনা কলেজে ভর্তি হন তিনি এবং সেখান থেকে ১৮৯১ সালে এফ.এ পরীক্ষা এবং ১৮৯৫ সালে এই কলেজ থেকেই বি.এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি।

সরকারি চাকরির পরীক্ষা দিয়ে সিমলার একটি অফিসে কেরানির অস্থায়ী চাকরিতে যোগ দেন প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় । এক বছরের মধ্যেই বদলি হয়ে কলকাতায় টেলিগ্রাফ অফিসের ডিরেক্টর জেনারেলের স্থায়ী পদে কাজ করতে শুরু করেন তিনি। সিমলায় থাকার সময় তাঁর অভিজ্ঞতার ছবি পাওয়া যায় ১৮৯৭ সালের ‘প্রদীপ’ পত্রিকার মাঘ সংখ্যায় প্রকাশিত তাঁর লেখা ‘সিমলা শৈল’ নামে একটি সচিত্র প্রবন্ধে। এই অফিসে কাজ করার সময়েই তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় ‘ভারতী’ পত্রিকার সম্পাদক সরলা দেবীর সঙ্গে। সেই সময় ‘ভারতী’ পত্রিকার নিয়মিত লেখক ছিলেন প্রভাতকুমার। সরলা দেবীর সঙ্গে পরিচয়ের পর থেকে তাঁর সঙ্গে আলাপ বাড়তে থাকে এবং পরে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সরলা দেবীর ঐকান্তিক আগ্রহেই ১৯০১ সালের ৩ জানুয়ারি ব্যারিস্টারি পড়তে বিলেতের উদ্দেশ্যে রওনা দেন প্রভাতকুমার। ১৯০৩ সালে পড়া শেষ করে দেশে ফিরে আসেন তিনি। বিলেত যাওয়ার আগের বছরই তাঁর বাবা মারা গিয়েছিলেন, তাই মা যাতে তাঁর এই বিলেতযাত্রার সংবাদে কষ্ট না পান, তাই কাউকে কিছু না জানিয়েই চলে গিয়েছিলেন তিনি। ফিরে এসে ১৯০৪ সাল থেকে ব্যারিস্টারিকেই জীবিকা হিসেবে বেছে নেন এবং ওকালতি প্র্যাকটিস করতে থাকেন। প্রথমে দার্জিলিং-এ প্র্যাকটিস করা শুরু করলেও কিছুদিনের মধ্যেই তিনি রংপুরে চলে আসেন। সেখানে চার বছর থাকার পরে ১৯০৮ সালে তিনি চলে আসেন গয়ায় এবং গয়াতে দীর্ঘ ৮ বছর প্র্যাকটিস করেন প্রভাতকুমার। এরপরে নাটোরের মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায়ের অনুরোধে ‘মানসী’ ও ‘মর্ম্মবাণী’ পত্রিকার সহ-সম্পাদকের পদে যোগ দেন তিনি। মহারাজের চেষ্টাতেই ১৯১৬ সালের ১ আগস্ট কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ল’ কলেজে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এখানেই অধ্যাপনা করে গিয়েছেন তিনি। আর এই সময় থেকেই স্থায়ীভাবে কলকাতায় থাকতে শুরু করেন তিনি। আসলে পত্রিকা সম্পাদনার কাজের সুবিধের জন্যই মহারাজার চেষ্টায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন প্রভাতকুমার। প্রায় চোদ্দ বছর মানসী ও মর্ম্মবাণী পত্রিকার সহ-সম্পাদকের পদে আসীন ছিলেন তিনি। যদিও প্রথমে ‘মানসী’ পত্রিকাতেই সহ-সম্পাদকের কাজ পেয়েছিলেন প্রভাতকুমার, তারপর অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণকে সঙ্গে নিয়ে জগদিন্দ্রনাথ ‘মর্ম্মবাণী’ পত্রিকা চালু করলে সেখানেও প্রভাতকুমারকেই দায়িত্ব নিতে হয়। পরবর্তীকালে ‘মর্ম্মবাণী’ পত্রিকা বন্ধ হয়ে যায়, পরিবর্তে ‘মানসী’ পত্রিকার আয়তন বেড়ে যায় এবং নতুনভাবে ‘মানসী ও মর্ম্মবাণী’ নামে পত্রিকা চালু হয়। এই পত্রিকায় স্বনামে ও ছদ্মনামে বহু লেখা লিখেছেন তিনি।

ছোটবেলা থেকেই কবিতা লেখার প্রতিই ঝোঁক ছিল প্রভাতকুমারের। ছাত্র থাকাকালীনই ‘ভারতী’, ‘দাসী’, ‘প্রদীপ’ ইত্যাদি পত্রিকায় বহু কবিতা লিখেছেন। ১৮৯০ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে ‘ভারতী ও বালক’ পত্রিকায় ‘চির নব’ নামে তাঁর একটি কবিতা প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথের লেখাপত্রের সঙ্গে এই সময়েই পরিচিত হয়েছিলেন প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় এবং রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পত্র বিনিময়ও হত তাঁর। বলা হয় একটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথের অনুরোধ এবং উৎসাহেই গদ্য লিখতে আগ্রহী হন তিনি। তারপরই ‘দাসী’ পত্রিকায় ছদ্মনামে রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্রা’ কাব্যের সমালোচনা লেখেন তিনি। পরে ‘প্রদীপ’ পত্রিকার প্রথম বর্ষের সংখ্যাতে ‘শ্রীবিলাসের দুর্ব্বুদ্ধি’ নামে আরেকটি প্রবন্ধ লেখেন প্রভাতকুমার। সেই সময় তাঁর নিজের কবিসত্তাকে প্রাধান্য দিতে গদ্য লেখার সময় ‘শ্রীরাধামণি দেবী’ ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন তিনি। আসলে ‘কুন্তলীন’ পত্রিকার বার্ষিক পুরস্কারের প্রতিযোগিতায় ‘পূজার চিঠি’ বিষয়ের উপর একটি চিঠি লেখার সূত্রেই এই ছদ্মনাম ব্যবহার শুরু করেছিলেন তিনি। এই চিঠি লিখে কুন্তলীনের প্রথম পুরস্কার পেয়েছিলেন প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়। রবীন্দ্রনাথের সম্পাদনায় ‘ভারতী’ পত্রিকায় ‘বেনামা চিঠি’ নামে একটি গল্প প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর, পরে সরলা দেবীর সম্পাদক থাকাকালীন ‘অঙ্গহীনা’ ও ‘হিমানী’ নামে তাঁর আরো দুটি গল্প প্রকাশিত হয় এই পত্রিকাতেই। ১৮৯০ থেকে ১৮৯৯ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ নয় বছর কবিতা চর্চা করেছিলেন তিনি। তাঁর উল্লেখযোগ্য কবিতাগুলির মধ্যে রয়েছে ‘অবসান’, ‘অভিশাপ’, ‘অতিথি’, ‘শেষদান’, ‘মহাযাত্রা’, ‘কামনা’, ‘হোলি কাহিনী’, ‘মীরাবাঈ’, ‘প্রেমের সৌরভ’, ‘অনন্ত শয্যা’, ‘একটি প্রার্থনা’, ‘অকাল মৃত্যু’, ‘পরলোকতত্ত্ব’, ‘নামলেখা’ ইত্যাদি। রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রথমদিককার বেশ কিছু গল্পের প্রশংসা করেছিলেন আর তাতেই বুকে বল পেয়ে আরো গল্প লেখায় উৎসাহিত হয়ে পড়েন তিনি। পরবর্তীকালে উপন্যাসও লিখেছেন প্রভাতকুমার। তাঁর ছোটগল্পের বিষয় এবং বর্ণনাভঙ্গির অভিনবত্বে খুব দ্রুত একজন প্রতিভাবান কথাসাহিত্যিক হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। গ্রন্থাকারে প্রকাশিত ‘ষোড়শী’, ‘দেশী ও বিলাতী’ ইত্যাদি বইয়ের গল্পগুলি খুবই সমাদর পেয়েছিল পাঠকমহলে। রস এবং গল্পের বিষয়বস্তু অনুযায়ী তাঁর সবকটি গল্পকে কতগুলি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। যেমন – গার্হস্থ্য গল্পের মধ্যে রয়েছে ‘বউচুরি’, ‘হিমানী’, ‘খালাস’, ‘চিরায়ুস্মতী’, ‘কলির মেয়ে’, ‘বাস্তুশাপ’ ইত্যাদি গল্প। আবার তাঁর লেখা বিখ্যাত ব্যঙ্গ গল্পগুলি হল ‘মাদুলি’, ‘ধর্মের কল’, ‘যুগল সাহিত্যিক’, ‘সচ্চরিত্র’ ইত্যাদি। এছাড়া তাঁর লেখা ‘দেবী’, ‘ফুলের মূল্য’, ‘মাতৃহীনা’, ‘কাশীবাসিনী’ ইত্যাদি গল্পগুলিকে করুণ গল্পের শ্রেণিতে ফেলা হয়েছে। সবশেষে পশুচরিত্র কেন্দ্রিক তাঁর দুটি গল্পের কথা বলতেই হয় – ‘আদরিণী’ ও ‘কুকুরছানা’। তাঁর বেশিরভাগ গল্পেই হাস্যরসের প্রাধান্য দেখা যায়। ‘বলবান জামাতা’, ‘কুড়ানো মেয়ে’, ‘বিলাত ফেরতের বিপদ’ ইত্যাদি গল্পগুলি বাংলা সাহিত্যে বহুল পঠিত গল্প। ইউরোপের পটভূমিকাতেও বহু গল্প লিখেছেন প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়। তাঁর সমকালে হাসির গল্প লেখায় প্রভাতকুমারের সমকক্ষ লেখক কেউই ছিলেন না। বাঙালি সাহিত্য সমালোচকেরা মনে করেন রবীন্দ্রনাথের পরে বাংলা সাহিত্যে যে শূন্যস্থান দেখা গিয়েছিল, সেই স্থান পূরণ করেছিলেন প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়। দৈনন্দিন জীবনের অতি তুচ্ছ ঘটনাগুলিও তাঁর মুন্সিয়ানায় অসাধারণ গল্পের রূপ পেত। ক্লাইম্যাক্স নির্মাণ এবং গল্পের বুনন তৈরিতে প্রভাতকুমার আজও অতুলনীয়। প্রায় শতাধিক গল্পের পাশাপাশি ১৪টি উপন্যাসও লিখেছেন তিনি যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘রমাসুন্দরী’ (১৯০৮), ‘নবীন সন্ন্যাসী’ (১৯১২), ‘রত্নদীপ’ (১৯১৫), ‘জীবনের মূল্য’ (১৯১৭), ‘সিন্দুর কৌটা’ (১৯১৯), ‘মনের মানুষ’ (১৯২২), ‘আরতি’ (১৯২৪), ‘সত্যবালা’ (১৯২৫), ‘সুখের মিলন’ (১৯২৭), ‘সতীর প্রতি’ (১৯২৮), ‘প্রতিমা’ (১৯২৮), ‘গরীব স্বামী’ (১৯৩০), ‘নব দূর্গা’ (১৯৩০), ‘বিদায় বাণী’ (১৯৩৩) ইত্যাদি।

১৯২৮ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। তাঁর ‘দেবী’ গল্প অবলম্বনে সত্যজিৎ রায় একটি চলচ্চিত্রও তৈরি করেছিলেন যা ১৯৬০ সালে মুক্তি পায়।

১৯৩২ সালের ৫ এপ্রিল ৫৯ বছর বয়সে কলকাতায় প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয়।   


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading