ভূগোল

রামকেলি

পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলার অন্তর্গত ইংরেজবাজার থানার একটি সমৃদ্ধ গ্রাম হল রামকেলি। এটি মালদা সদর থেকে ষোলো কিলোমিটার দূরে শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। বাংলায় সেন বংশের শাসনকালে, বিশেষ করে রাজা বল্লালসেনের আমলে গৌড় ছিল রাজধানী। লক্ষণসেনের নামানুসারে পরবর্তীকালে এর নাম হয় লক্ষণাবতী। এই গৌড়ের পাশেই অবস্থিত রামকেলি গ্রাম।

এই গ্রামের নাম রামকেলি হল কিভাবে সে নিয়ে কোন ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়না। তবে জনশ্রুতি অনুযায়ী বনবাসে থাকাকালীন রামচন্দ্র তাঁর শ্বশুরবাড়ি মিথিলায় যাওয়ার পথে পুণ্ড্রদেশ বা মালদাতে কিছুদিন কাটিয়ে যান। সেখানে হনুমান রাম সহ সীতা ও লক্ষ্মণকে আম খাওয়াতে কালিন্দী নদীর তীরে এক আমবাগানে নিয়ে গেলে সেখানে আমের স্বাদে-গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে রামচন্দ্র ফলকেলি শুরু করে দেন। রামচন্দ্র আম নিয়ে ‘কেলি’ অর্থাৎ খেলা করেছিলেন বলেই এই অঞ্চলের নাম হয়ে যায় ‘রামকেলি’।

রামকেলি ঐতিহাসিক দিক থেকে অত্যন্ত প্রসিদ্ধ একটি গ্রাম। বৃন্দাবন দাস রচিত চৈতন্যভাগবত (অন্ত্যখন্ড)-এ এই গ্রামের উল্লেখ পাওয়া যায় –

“গৌড়ের নিকটে গঙ্গাতীরে এক গ্রাম।
ব্রাহ্মণ সমাজ তার রামকেলি নাম।।”

ষোড়শ শতকের প্রথম দিকে রামকেলি অত্যন্ত বর্ধিষ্ণু গ্রাম ছিল। হোসেন শাহ তখন গৌড়ের সুলতান। এ সময়ে অনেক হিন্দু কর্মচারী তাঁর রাজসভায় নিযুক্ত ছিলেন। এঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য – সনাতন গোস্বামী (সাকর মল্লিক – প্রধানমন্ত্রী) ও রূপ গোস্বামী (দবির খাস – খাস মুন্সী বা প্রাইভেট সেক্রেটারি)। ১৫১৪ সাধারণ অব্দে (মতান্তরে ১৫১৫) শ্রীচৈতন্যদেবের রামকেলিতে আগমন হয়। ভক্তিধর্ম প্রচারে শ্রীচৈতন্য বেরিয়েছিলেন দাক্ষিনাত‍্য ও ওড়িশায়। সেখান থেকে মথুরা-বৃন্দাবন যাওয়ার পথে গৌড়ে আসেন তিনি। তখন রামকেলি গ্রামে দিন তিনেক ছিলেন শ্রীচৈতন্য। সময়টা ছিলো জুন মাসের মাঝামাঝি, বাংলায় জ্যৈষ্ঠ সংক্রান্তি। ১লা আষাঢ় রামকেলিতে শ্রীচৈতন্যের নগরকীর্ত্তনে হাজার হাজার লোকের সমাবেশ দেখে আশ্চর্য হন হোসেন শাহ। রামকেলিতে অবস্থানকালেই হোসেন শাহের দুই বিশ্বস্ত রাজকর্মচারী সনাতন ও রূপকে কৃষ্ণমন্ত্রে দীক্ষা দেন চৈতন্যদেব। বস্তুত, দীক্ষা গ্রহণের পরেই তাঁদের নাম হয় সনাতন গোস্বামী (পূর্বনাম – অমর) ও রূপ গোস্বামী (পূর্বনাম – সন্তোষ)।

রামকেলির প্রসিদ্ধি তার মেলাতে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আগমনকালকে উপলক্ষ্য করে প্রতিবছর জ্যৈষ্ঠমাসের সংক্রান্তিতে রামকেলিতে বিরাট মেলা বসে। ১৫১৫ সালে রূপ ও সনাতন এই মেলার সূত্রপাত করেন। ৫০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসছে এই মেলা, যদিও মহামারির কারণে রাজধানী গৌড় ধ্বংস হয়ে গেলে মাঝে দুশো বছর (১৬০০ – ১৭০০ সাধারণ অব্দ) এই মেলা বন্ধ ছিল। পরে তা আবার চালু হয়। আগে এই মেলা প্রায় ত্রিশ দিন ধরে চলত। এখন মেলার স্থায়িত্ব ৭-১০ দিন।

বৈষ্ণবসমাজে রামকেলির মেলা ‘গুপ্ত বৃন্দাবন’ মেলা নামে বেশি পরিচিত। মেলার প্রথমদিনে মাতৃপিণ্ড দান করতে বিহার, ঝাড়খন্ড, ওড়িশা থেকে মহিলা ভক্তরা রামকেলি মেলা লাগোয়া গৌড়েশ্বরী থানে ভিড় করেন। রামকেলি মেলা সম্ভবত ভারতের একমাত্র স্থান যেখানে মাতৃপিণ্ড দান করা হয়। মহিলারাই এই পিণ্ড দান করেন। এই গ্রামের কাছে অবস্থিত গৌড়ের বিখ্যাত ফিরোজ মিনারের পশ্চিম দিকে আম বাগানের মধ্যে অবস্থিত গয়েশ্বরী মন্দির। অনেকে এই মন্দিরকে গৌড়েশ্বরী নামেও ডেকে থাকেন। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী এই এলাকাটির প্রাচীন নাম ছিল বামন পাড়া। জনশ্রুতি যে আসল মন্দির নবাবী আমলে ধ্বংস হয়ে যায়। আবার অন্য একটি মতানুসারে মূল মন্দির গঙ্গাগর্ভে তলিয়ে যায়। কথিত আছে, রাজা গনেশের রাজত্বের অনেক আগে থেকে রামকেলিতে মহিলাদের পিণ্ডদানের রীতি ছিল। একসময় এই মন্দির ছুঁয়ে প্রবাহিত হত জাহ্ণবী নদী। এই মন্দিরে পাথর খোদিত একটি চতুর্ভুজ দেবী মূর্তিকে দেবী গয়েশ্বরী বা গৌড়েশ্বরী রূপে আরাধনা করা হয়।এই মন্দিরেই হয় মাতৃ পিণ্ডদান। এই পিণ্ডদান কেবলমাত্র রামকেলি মেলার সময়েই হয়ে থাকে। সকাল পাঁচটা থেকে বেলা বারোটা পর্যন্ত পিণ্ডদান চলে।

এই রামকেলি মেলা বিখ্যাত আরও একটি কারণে। বৈষ্ণব সমাজের বিয়ের জন্য। প্রাচীনকালে রূপ সাগরের উত্তর পাড়ে এক বিস্তৃত চাতালে বৈষ্ণব-বৈষ্ণবীদের মিলন উৎসব হত। বৈষ্ণবীরা কাপড় দিয়ে নিজেদের আবৃত করে রাখতেন, ফলে বৈষ্ণবরা তাঁদের চেহারা দেখতে পেতেন না। শুধু বাঁ হাতের কড়ে আঙ্গুল (মতান্তরে অনামিকা) দেখে বৈষ্ণবী নির্বাচন করা হত। নির্বাচিত বৈষ্ণবীকে পছন্দ করে ছয় আনা মূল্য দিয়ে তাঁকে গ্ৰহণ করার চল ছিল। বর্তমানে এই প্রথা বিলুপ্ত। এখন মালাবদল (কণ্ঠী বদল) করেই গান্ধর্ব মতে বিয়ের অনুষ্ঠান পালনের রীতি প্রচলিত। আষাঢ় মাসের প্রথম ও দ্বিতীয় দিন মন্দির প্রাঙ্গণে কীর্ত্তন, পালাগান, বাউলগানের আসর বসে।

রামকেলিতে মেলা ছাড়াও অন্যান্য কিছু দর্শনীয় স্থানও রয়েছে। এর মধ্যে সনাতন গোস্বামীর প্রতিষ্ঠিত মদন মোহন জীউ মন্দির উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও এই মন্দিরের পূর্বে কদম ও তমাল গাছের তলায় পাথরের ওপর মহাপ্রভুর যুগল পদচিহ্ন প্রতিষ্ঠিত। এই পদচিহ্ন সংরক্ষণের জন্য রয়েছে একটা ছোট মন্দির। মদন মোহন জীউ মন্দিরের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে রূপ সাগর, উত্তর-পূর্বে সনাতন সাগর, যা স্থানীয় ভাবে সনাতন দীঘি নামে পরিচিত। এ ছাড়াও রয়েছে শ্যমকুন্ড, রাধকুন্ড সহ শ্রীরাধার অষ্টসখী কুন্ড।

সব মিলিয়ে ইতিহাস ও ধর্মের এক অনবদ্য মিলনস্থল এই রামকেলি।

তথ্যসূত্র


  1. চৈতন্যভাগবত - বৃন্দাবন দাস
  2. মালদহের দেবদেউল - ড. নিমাইচন্দ্র ঝা, প্রকাশক - সংবেদন, পাতা: ১৪৯ - ১৭৫
  3. মালদহ - সুস্মিতা সোম, ISBN: 978-81-922470-2-1;  প্রকাশক - সোপান, পাতা: ৫৩-৫৪
  4. http://archives.anandabazar.com/archive/1120616/16uttar4.html
  5. https://www.anandabazar.com/
  6. https://www.aamadermalda.in/
  7. https://www.aajkaal.in/
  8. https://books.google.co.in/

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।