বিজ্ঞান

মানুষের চোখের রেজোলিউশন

মানুষের চোখের রেজোলিউশন

পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকেই এই পৃথিবীর গাছ-গাছালি, নদী, জল, মনোরম প্রকৃতি, আমাদের আপনজন, পৃথিবীর অন্যান্য মানুষ সকলকেই চিনতে সাহায্য করেছে আমাদের এই চোখ। মানবদেহের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলির মধ্যে চোখ অন্যতম। জেগে থাকা অবস্থায় যতক্ষণ চোখ খোলা থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের সামনে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা, আমাদের সামনে হেঁটে-চলে বেড়ানো সকল মানুষ, জীব-জন্তু সবকিছুই আমরা দেখতে পাই আর এই দৃষ্টির স্পন্দন গিয়ে পৌঁছায় আমাদের মস্তিষ্কে আর এই দৃষ্টির অনুভূতির সাহায্যেই মস্তিষ্কের নির্দেশে আমরা প্রতিক্রিয়া জানাই। তাই চোখকে পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের একেবারে প্রথমেই উল্লেখ করা হয়। ক্যামেরায় ঠিক যেভাবে লেন্সের সাহায্যে ছবি তোলা হয়, অনেকটা একইভাবে আমাদের চোখ প্রতিনিয়ত সবকিছুর ছবি তুলে যাচ্ছে আর তা সঞ্চিত হচ্ছে আমাদের স্মৃতিতে। ক্যামেরার তোলা ছবি কত উন্নত হবে তা নির্ভর করে ক্যামেরার রেজোলিউশনের উপর। সেভাবে চোখেরও কী নির্দিষ্ট রেজোলিউশন আছে? কী মনে হয়? চলুন তাহলে জেনে নেওয়া যাক মানুষের চোখের রেজোলিউশন সম্পর্কে।

যে কোনও বস্তুর আকার, রঙ, অন্যান্য দৃশ্যমান বিবরণ সমস্ত নিখুঁতভাবে ধরা পড়ে মানুষের চোখে আর তা মানুষের মস্তিষ্ক স্মৃতিতে ধরে রাখে অবিকৃতভাবে। ক্যামেরায় ছবি তোলার সময় আমরা অনেকেই পিক্সেল বা মেগাপিক্সেলের উল্লেখ করে থাকি। এখন দেখে নেওয়া যাক, চোখের রেজোলিউশন ঠিক কত মেগাপিক্সেল। সাধারণভাবে ক্যামেরার কৌশল ও ছবি তোলার পদ্ধতির সঙ্গে চোখের ক্রিয়াপদ্ধতির অনেক অমিল রয়েছে। ফলে চোখের রেজোলিউশন সম্পর্কে চটজলদি কোনও উত্তর দেওয়া মুশকিল। তবে বিজ্ঞানীরা নানাবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরে জানিয়েছেন যে মানুষের চোখের রেজোলিউশন আনুমানিক ৫৭৬ মেগাপিক্সেল। বর্তমান দিনের সবথেকে উন্নতমানের উচ্চ-ডেফিনিশনযুক্ত 4K রেজোলিউশন সম্বলিত টিভির থেকেও চোখের রেজোলিউশন অনেক বেশি এবং সবথেকে উন্নতমানের স্মার্টফোনগুলির থেকে মানুষের চোখের রেজোলিউশন প্রায় ২০০ গুণ বেশি। বিজ্ঞানীরা বলছেন যে, মানুষের চোখে উঠে আসা ছবিকে অনায়াসে ৪৩ ফুট চওড়া মাপে অবিকৃত অবস্থায় ছাপানো যেতে পারে। তাতে ছবির গুণমান একটুকুও কমে যাবে না। অনেক অনেক সূক্ষ্ম দৃশ্যমান বর্ণনাও মানুষের চোখে ধরা পড়ে। ফলে মানুষের চোখের রেজোলিউশন এক কথায় ৫৭৬ মেগাপিক্সেল বললে তা অর্ধসত্য বলা হয়। বলা উচিত মানুষের চোখ সর্বোত্তম অবস্থায় ৫৭৬ মেগাপিক্সেল রেজোলিউশনে দেখতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এটি মানুষের বয়স, পরিবেশ, দৃষ্টির তীক্ষ্ণতার উপর নির্ভর করে। একটি আদর্শ মানবচক্ষু একসঙ্গে প্রায় ২০ লক্ষ পৃথক রঙ চিনতে পারে। অত্যাধুনিক ক্যামেরার থেকেও মানবচক্ষুর ক্ষমতা অনেক বেশি। মানুষ চোখের সাহায্যে দিনের আলোয় কিংবা অন্ধকারে বিভিন্ন ঔজ্জ্বল্য ও বৈপরীত্যের মধ্যেও বিভিন্ন জিনিস দেখতে পারে। মোবাইল ফোন বা ডিজিটাল ক্যামেরার মত একক ফ্রেমের স্ন্যাপশট (Single Frame Snapshot) নিতে পারে না আমাদের চোখ, কিন্তু আমাদের দুটি চোখ সর্বদা অনবরত ক্ষুদ্র ও বৃহৎ পরিসরে নড়াচড়া করে এবং আমাদের মস্তিকের দৃশ্য প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রে (Visual Processing Centre) সর্বদাই দৃষ্টি-সংকেত পাঠাতে থাকে। আমরা দুটি চোখে একত্রে দেখার কারণে চোখের রেজোলিউশন এমনিতেই অনেকগুণ বেড়ে যায়। আর আমাদের চোখ যত বেশি নড়াচড়া করে তত বেশি দৃশ্য-বিন্দু সংগ্রহ করে এবং তার ফলে ছবির পিক্সেল বেড়ে যায়। চোখের সাহায্যে যে দৃশ্য ধরা পড়ে আমাদের মস্তিষ্কে তার গুণমান শুধু চোখের ক্ষমতার উপর নির্ভর করে না, বরং তা রড কোশ, কোন কোশ, চোখের ভিতরকার স্নায়বিক অবস্থার উপরেও নির্ভর করে। তাহলে প্রশ্ন হতে পারে, বিজ্ঞানীরা যে ধারণা দিলেন মানুষের চোখের রেজোলিউশন আনুমানিক ৫৭৬ মেগাপিক্সেল, সেই গণনাটি কীভাবে সম্ভব হল?

সাধারণভাবে মাথা না ঘুরিয়ে আমাদের চোখ তার চারপাশের ১২০ ডিগ্রি পর্যন্ত দৃশ্য-সংকেত সংগ্রহ করতে পারে। তাহলে ধরে নেওয়া যাক আমাদের চোখের সামনের দৃশ্যটি একটি ১২০ × ১২০ মাপের একটি বর্গাকার দৃশ্যক্ষেত্র। তাহলে চোখের রেজোলিউশন হবে নিম্নরূপ –

(১২০×১২০×৬০×৬০ )/(০.৩×০.৩)=৫৭৬,০০০,০০০ পিক্সেল

৫৭৬,০০০,০০০ পিক্সেলকেই ৫৭৬ মেগাপিক্সেল বলা হয়। এই গণনায় দুটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। প্রথমত কৌণিক পরিমাপের একক হিসেবে চোখের রেজোলিউশন নির্ণয়ের সময় ০.৩ আর্ক-মিনিট (arc-minute) ধরা হয়েছে আর তাকে ডিগ্রিতে রূপান্তরের জন্য ৬০ দিয়ে গুণ করতে হয়েছে। এই হিসেবটির যদিও অনেক ধরনের বৈচিত্র্য হতে পারে। যেহেতু আমাদের দুটি চোখ তাই এখানে সব সংখ্যাই দুবার করে গুণ করা হয়েছে। তবে এই গণনায় আমাদের চোখের সাধারণ দৃশ্যমান ক্ষেত্র ১২০ ডিগ্রি ধরা হয়েছে, কিন্তু উন্নত ও আদর্শ চোখের ক্ষেত্রে সেই পরিমাপ ১৭৬ ডিগ্রি হয়ে থাকে বলেই বিজ্ঞানীরা ধারণা দিয়েছেন। ফলে সেক্ষেত্রে চোখের রেজোলিউশন আরও অনেকটা বেড়ে যাবে, তা বলাই বাহুল্য।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়