বিবিধ

মানুষরূপী নদী

সময়টা ২০১৭ সাল। নিউজিল্যাণ্ড সরকার মানুষের মর্যাদা দিল হোয়াংগানুই নদী কে। এই প্রথম বিশ্বের কোনো নদী একজন মানুষের সমান অধিকার ও আইনি মর্যাদা লাভ করলো। নিউজিল্যাণ্ডের প্রধান উপজাতি মাওরি সম্প্রদায়ের কাছে এই নদী অত্যন্ত শ্রদ্ধার এবং তাঁদের জীবন-যাপনের সহায়ক। ‘এই বিশাল নদী পর্বতের কোল থেকে বেরিয়ে সমুদ্রে গিয়ে মিশেছে। আমিই নদী, ঐ নদীই আসলে আমি’। হোয়াংগানুই প্রদেশের মাওরি উপজাতিদের এই কথাই বুঝিয়ে দেয় বহু বহু কাল ধরে এই নদীর সঙ্গে তাদের এক অচ্ছেদ্য বন্ধন গড়ে উঠেছে। নর্থ আইল্যাণ্ডের মধ্যাঞ্চলের তিনটি বরফাবৃত আগ্নেয়গিরির বুক থেকে উৎপত্তি ঘটেছে এই হোয়াংগানুই(Whanganui) নদীর। ঐ মাওরি উপজাতিদের বিশ্বাস যে, আকাশের পিতার চোখের এক বিন্দু অশ্রুকণা এই সব পর্বতের মধ্যে উচ্চতম বরফাবৃত রুপেহু পর্বতটির পাদদেশে এসে পড়েছিল কোনো একদিন, আর সেই থেকেই জন্ম নিয়েছে হোয়াংগানুই নদী। নদীকে এভাবে মানুষের সমমর্যাদা দেওয়ার ঘটনা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল।

১৮০ মাইল দীর্ঘ এই নদী পর্বতের গা বেয়ে অবশেষে তাসমান সাগরে এসে মিশেছে। সাতশো বছরেরও বেশি সময় ধরে এই নদী মাওরি উপজাতিদের জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠেছে। তাঁদের ভাষায় এই নদী হল – ‘আওয়া টুপুয়া’ যার অর্থ হল পবিত্র শক্তির নদী। কিন্তু ১৮০০ সালের মাঝামাঝি ইউরোপীয়রা এই অঞ্চলে আসা মাত্রই মাওরিদের সঙ্গে এই নদীর সম্পর্ক ছিন্ন হল। সেই সময় থেকেই তাঁদের চোখের সামনেই এই নদী অবক্ষয়িত হয়েছে। পর্যটকদের স্টিমার যাতায়াতের সুবিধের জন্য এই নদীর বাঁকে বাঁকে ডিনামাইট বিস্ফোরণ করে রাস্তা করা হয়েছে, নদীর বুক থেকে নুড়ি-পাথর তুলে নিয়ে গিয়ে রেললাইনে বসানো হয়েছে আর তা দিয়ে রাস্তাও নির্মিত হয়েছে। এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নদীবখ, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নদীর জলজ প্রাণীরা। নদীতে এসে মিশেছে আশেপাশের নগরাঞ্চলের সমস্ত প্রকার বর্জ্য। এমনকি এর প্রাকৃতিক প্রবাহকে রুদ্ধ করে নদীর উর্ধ্বগতিতেই একটি ভিন্ন খাতে নদীকে চালিত করে সেখানে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়েছে। মাওরিরা এই নদীকে তাঁদের পূর্বপুরুষ মনে করে এবং এভাবে একটি নদীর উর্ধাংশের পথ কেটে দেওয়া মানে তাঁদের বিশ্বাসে একটি মানুষের শিরচ্ছেদ করা। দীর্ঘ ১৬০ বছর ধরে এই মাওরিরাই হোয়াংগানুই নদীর আইনি সুরক্ষার জন্য লড়াই করেছে। এই নদীই তাঁদের জল দিয়েছে, থাকার উপযোগী স্থান দিয়েছে নদীতীরে আর দিয়েছে খাদ্য। ফলে নদীকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার ফলে এর পরবর্তীকালে নদীতে কোনো প্রকার ক্ষতিসাধন বা অননুমোদিত ক্রিয়াকলাপ চালালে তা মাওরিদের জীবনকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে প্রতিপন্ন হবে। জনৈক আমেরিকান আইন-অধ্যাপক ক্রিস্টোফার ডি স্টোন তাঁর ‘শ্যুড ট্রিস হ্যাভ স্ট্যান্ডিং’ বইতে লিখেছিলেন যে, প্রকৃতির প্রতি আগ্রহ মানবিক বিষয়গুলির থেকে পৃথক করে দেখা উচিত। কিন্তু মাওরি উপজাতিদের পক্ষে এই উক্তিকে প্রতিপ্রশ্ন করেছেন জেমস মরিস এবং জাসিন্টা রুরু তাঁদের লেখা ‘গিভিং ভয়েসেস টু রিভার্স’ বইতে। তাঁরা যুক্তিসহকারে বোঝাতে চেয়েছেন কেন নিউজিল্যাণ্ডের নদীগুলিকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। হোয়াংগানুই নদীর পাশাপাশি এই আইনি স্বীকৃতির সহায়তায় নদী পার্শ্বস্থ ‘টে উরেওয়েরা’ অভয়ারণ্য, তারানাকি পর্বতও মানুষের সমান মর্যাদা এবং আইনি স্বীকৃতি পেয়েছে। এই আইনি স্বীকৃতির সাহায্যে এতদিন ধরে চলে আসা নদীর উপর যথেচ্ছাচার প্রতিরোধ করার চেষ্টা করতে চান মাওরি সম্প্রদায়ের মানুষরা। বহু আগে ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে তাঁদের ‘ওয়েটেঙ্গির চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হলেও ব্রিটিশ সরকার তা লঙ্খন করেছে। ফলে ১৯৭৫ সাল থেকেই ওয়েটেঙ্গি ট্রাইবুন্যাল চেষ্টা করে এসেছে কীভাবে মাওরিদের আনা অভিযোগ সমাধান করা যায়। আর সেই ট্রাইবুন্যাল সিদ্ধান্ত জানায় যে, মাওরিরাই একমাত্র হোয়াংগানুই নদীর ব্যাপারে সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। তাদের কাছে এই নদী একাধারে ঔষধের উৎস, খাদ্যের উৎস এবং যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই নদী যেন তাঁদের একমাত্র হৃদয়ের একমাত্র রক্তবাহী শিরার মতো গুরুত্বপূর্ণ। নদীর ব্যাপারে তাঁদের জ্ঞান অপরিসীম। তারা জানে কখন কোথায় এবং কীভাবে ১৮ রকমের মিষ্টি জলের মাছ এই নদীতে পাওয়া যাবে, তারা জানে ঝিনুক, চিংড়ি ইত্যাদি কোথায় পাওয়া যায়, এমনকি বাঁশের ফাঁদ নির্মাণ করে তাঁরা ইল মাছ ধরতেও সিদ্ধহস্ত। তাঁদের বিশ্বাস এই নদীর প্রতিটি বাঁকে ‘তানিহা’ নামে এক প্রেতপুরুষ বসবাস করেন। ফলে এই নদীর প্রবাহপথের সর্বত্র নিজেদের অধিকার স্থাপনের জন্য লড়াই করেছে মাওরি উপজাতির মানুষেরা। মাওরিরা নিউজিল্যাণ্ডের অন্য মানুষদের ‘পাকেহা’ বলে সম্বোধন করে এবং তাঁদের বিশ্বাস এই নদীকে বাঁচাতে হলে মাওরি আর পাকেহাদের সমবেত প্রয়াস জরুরি এবং উভয়ের পারস্পরিক সহাবস্থানও জরুরি। তাঁরা বিশ্বাস করে এই বিশ্বসংসারে যা কিছু আছে সবই পৃথিবী আর আকাশের অনুমোদনক্রমে সহাবস্থান করছে, ফলে মাওরিরা নিজেদের অন্য কোনো প্রাণী বা জীবের তুলনায় ছোটো বা বড়ো বলে মনে করে না। প্রকৃতিকে তারা তাঁদের নিজেদের পরিবার বলে মনে করে। আর তাই এই নদীকে বাঁচাতে মাওরিদের নদীর অভিভাবকত্বের আইনি স্বীকৃতি দানের সাফল্য কতদূর পৌঁছাবে তা সময় বলবে। কিন্তু বিশ্বের ইতিহাসে এই ঘটনা সত্যই বিরল। হোয়াংগানুই নদী বিশ্বের অন্যতম প্রধান মানুষরূপী নদীতে পরিণত হয়েছে।

যদিও এই ঘটনার পাশাপাশি বিশ্বের অন্যত্র টোলেডো, ওহিও প্রভৃতি অঞ্চলের মানুষের সমর্থনে ইরি হ্রদকেও আইনি মর্যাদা দেওয়া হয়েছে এবং ভারতের গঙ্গা ও যমুনা নদীকেও একইসঙ্গে মানুষের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। গঙ্গা-যমুনার অধিকার রক্ষায় অভিভাবকত্ব করবেন উত্তরাখণ্ডের মুখ্য সচিব এবং অ্যাটর্নি জেনারেল। গঙ্গা ও যমুনা নদীর ক্রমবর্ধমান দূষণ প্রতিরোধে জনস্বার্থ মামলার চূড়ান্ত রায়েই মানুষের মতো এই দুটি নদীর মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি ঘোষণা করেছে উত্তরাখণ্ডের মুখ্য আদালত। নদীকে মানুষের মর্যাদা দেওয়ার ঘটনা মুখ্যত ক্রমবর্ধমান প্রকৃতি ধ্বংসের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করে তোলার একটি প্রয়াস হিসেবে ধরে নেওয়া যায়।

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

শুধুমাত্র খাঁটি মধুই উপকারী, তাই বাংলার খাঁটি মধু খান


ফুড হাউস মধু

হোয়াটস্যাপের অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন