আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষা একটি অন্যতম উৎকৃষ্ট ভাষা, এর শব্দ ও সাহিত্য ভান্ডার অপরিসীম। যেকোনো উৎকৃষ্ট ভাষার একটি প্রধান সম্পদ হল প্রবাদ, ইংরেজিতে যাকে বলে proverb। বাংলা ভাষায় প্রাচীনকাল থেকেই অনেক প্রবাদ লোকমুখে বা সাহিত্যে প্রচলিত আছে। এই রকমই একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ হল “সরফরাজি চাল”। এই প্রবাদটির প্রচলিত অর্থ হল: মোড়লগিরি, ফোঁপর দালালি। অকারণে মাতব্বরি বা কর্তৃত্ব দেখানোকে সরফরাজি চাল বলে। “সরফরাজি চাল” প্রবাদের উৎপত্তি বাংলার নবাব সরফরাজ খানের শাসনকাল থেকে। তাঁর অযোগ্যতা, বাহাদুরি ও অকার্যকর নেতৃত্বের কারণে মানুষ তাঁকে ব্যঙ্গ করে এই প্রবাদ চালু করে। এখানে আমরা জেনে নেব সরফরাজ খানের শাসনামল থেকে “সরফরাজি চাল” প্রবাদটি এলো কীভাবে।
সাম্প্রতিক পোস্ট
নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তাঁর জামাতা সুজাউদ্দিন খান ১৭২৭ সালের জুলাই মাসে বাংলা- বিহার উড়িষ্যার নবাব (সুবেদার) হন। সুজাউদ্দিন খানের মৃত্যু হয় ১৭৩৯ সালের ১৩ মার্চ তারিখে। তারপর সুজাউদ্দিনের পুত্র সরফরাজ খান বাংলার মসনদে বসেন। কিন্তু তিনি অত্যন্ত অলস, অকর্মণ্য, ভোগবিলাসী ও দুশ্চরিত্র ছিলেন বলে শাসনকাজে তেমন যোগ্যতার পরিচয় দিতে পারেননি। শোনা যায় যে, তাঁর হারেমে ১৫০০ রমণী ছিল। তাদের সাথে সরফরাজ খান প্রমত্ত অবস্থায় দিনরাত কাটাতেন। কোনও সুন্দরী রমণীর কথা শুনলে অসহিষ্ণু হয়ে তিনি ন্যায়নীতিবোধ হারিয়ে ফেলতেন।
১৭৩৯ সালে নাদির শাহ দিল্লি আক্রমণ করে সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দেন। ভীত সরফরাজ খান বাংলার তিন বছরের খাজনা নাদির শাহের কাছে পাঠিয়ে দেন, এমনকি নাদির শাহের নামে মুদ্রা পর্যন্ত প্রচলন করেন। বিষয়টি তৎকালীন মোগল সম্রাট মুহম্মদ শাহ ভালভাবে নেননি। বিরুদ্ধবাদী অমাত্যদের কৌশলে সম্রাটের বিরাগভাজন হন সরফরাজ।
সরফরাজ খান স্বেচ্ছাচারী ছিলেন। পিতার আমলের বিশ্বাসী ও অনুগতদের প্রতি প্রচণ্ড অন্যায় ব্যবহার করেন তিনি। জগৎশেঠের সুন্দরী পুত্রবধূকে তাঁর অন্তঃপুরে পাঠাতে বাধ্য করেন। তার প্রতি আপাত নতিস্বীকারের ভান করে তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের সূচনা হয়। নিজের ক্ষমতা, রাজামাত্য ও কর্মচারীদের বিশ্বাস এবং শাসন-সংক্রান্ত জ্ঞান সবকিছুতেই সরফরাজ খান অনভিজ্ঞ, অনবহিত ও অন্ধ ছিলেন। নিজেকে তিনি শক্তিমান বলে মনে করতেন এবং যাচ্ছেতাই আচরণ করতেন, নবাবি ফলাতেন। এই অবস্থায় বাংলায় বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। এই সুযোগে বিহারের নায়েব নাজিম আলীবর্দি খান দিল্লির সম্রাট মুহম্মদ শাহের নিকট প্রচুর উপঢৌকন প্রেরণ করে হিসামউদ্দিন সুজাউল মুল্ক মহব্বত জঙ্গ উপাধি এবং বাংলা-বিহার- উড়িষ্যার শাসনকর্তৃত্ব লাভ করেন।
এরপর ১৭৪০ সালের এপ্রিল মাসে সরফরাজ খানকে গিরিয়ার যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত করেন আলীবর্দি খান। এরপর আলীবর্দি খান দীর্ঘ ১৬ বছর বাংলার নবাব ছিলেন। অলস, অকর্মণ্য অথচ নবাব হিসেবে ক্ষমতার দাপট প্রকাশে সরফরাজ খান বাংলার এক প্রবাদ- পুরুষরূপে পরিচিত হয়ে আছেন।
‘সরফরাজি চাল’ প্রবাদটি দিয়ে বাক্যগঠন:
১। গ্রামের মিটিংয়ে সে সবসময় অকারণে মাতব্বরি করে, একেবারে সরফরাজি চাল।
২। পরীক্ষায় ফেল করেও বন্ধুদের সামনে বড়াই করছে, এ যেন খাঁটি সরফরাজি চাল।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- প্রবাদের উৎস সন্ধান – সমর পাল, শোভা প্রকাশ / ঢাকা ; ১৬১ পৃঃ


আপনার মতামত জানান