ভারতবর্ষের স্বাধীনতা লাভ বিশ্ব ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। এই পথ কখনওই মসৃণ ছিল না। দারুণ রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম তথা আত্মবলিদানের মধ্যে দিয়ে এসেছে ভারতের স্বাধীনতা। ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল হয়ে আছে দেশমাতৃকার সাহসী সন্তানদের জীবনকাহিনী। কিন্তু অনেক সময়ই ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে গেছে এমন কিছু নাম, যাঁদের আত্মত্যাগ ছাড়া প্রজাতান্ত্রিক ভারতবর্ষের উদ্ভব সম্ভব ছিল না, যাঁদের অবদান অন্যান্য স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মতই স্বমহিমায় ভাস্বর। ঠিক সেরকমই স্বাধীনতার ইতিহাসে অগ্নিযুগের একজন বিপ্লবী হলেন সতীশচন্দ্র সামন্ত (Satish Chandra Samanta)। রাজনীতি ছাড়াও শিক্ষাপ্রসার, সমাজকল্যাণমূলক কাজের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন।
১৯০০ সালের ১৫ ডিসেম্বর, পূর্ব মেদিনীপুর জেলার মহিষাদল থানার অন্তর্গত, গোপালপুর গ্রামে সতীশচন্দ্র সামন্তের জন্ম হয়। তাঁর পিতার নাম ত্রৈলোক্যনাথ সামন্ত এবং মাতা কিশোরী দেবী।
সতীশচন্দ্রের যখন ১৫ বছর বয়স, সেই সময়ে তাঁর স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ সরস্বতীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় এবং তিনি ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত হন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, স্বাধীনতা সংগ্রামে যেসব সন্ন্যাসীরা অংশ নিয়েছিলেন, স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ সরস্বতী তাঁদের একজন। তিনি যুগান্তর দলের একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তাঁর সংস্পর্শে এসেই সতীশচন্দ্র সামন্ত ব্রহ্মচর্য পালনের সংকল্প নেন এবং দেশমাতৃকার সেবায় আত্মবলিদানের মন্ত্রে দীক্ষা নেন।
এক নজরে সতীশচন্দ্র সামন্ত-র জীবনী:
- জন্ম: ১৫ ডিসেম্বর, ১৯০০
- মৃত্যু: ৪ জুন, ১৯৮৩
- কেন বিখ্যাত: সতীশচন্দ্র সামন্ত একজন বাঙালি স্বাধীনতা সংগ্রামী। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা হিসেবে গড়ে ওঠা ‘তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার’ এবং ‘থানা জাতীয় সরকার’ এর সর্বাধিনায়ক ছিলেন। শিক্ষার প্রসার ও সমাজসেবায় তাঁর ভূমিকা অপরিসীম। হলদিয়া ডকের প্রতিষ্ঠায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছেন। ১৯৫২ সাল থেকে ১৯৭৭ সাল অব্দি দীর্ঘ ২৫ বছর লোকসভার সাংসদ ছিলেন।
- পুরস্কার: সতীশচন্দ্র সামন্ত-র স্মৃতিতে ২০০১ সালে একটি ডাক টিকিট প্রকাশ করা হয়েছিল।
সতীশচন্দ্র সামন্ত শিক্ষাজীবন শুরু করেছিলেন মহিষাদলের রাজ হাইস্কুলে। সেখানে প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ সমাপ্ত করেন ও পরবর্তী শিক্ষালাভ করেন কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজ থেকে। পরবর্তীকালে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য তিনি তৎকালীন বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন যেটি বর্তমানে ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ারিং সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, শিবপুর’ (Indian Institute of Engineering Science and Technology, Shibpur) নামে পরিচিত।
ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দ্বিতীয় বর্ষে থাকাকালীন তিনি প্রথাগত পড়াশোনা ছেড়ে দেন এবং পুরোপুরিভাবে ভারতমাতার পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনে মনোনিবেশ করেন। তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তিনি কুমার চন্দ্র জানা, রমণীমোহন মাইতি, শ্রীপতি চরণ বয়াল, অনঙ্গ মোহন দাস প্রমুখদের সঙ্গে মিলে ১৯২০ সালে অসহযোগ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন।
১৯৩৮ সালে তিনি ওড়িশাতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘সত্যবাদী হাই স্কুল’, তৎকালীন সময়ে শিক্ষার প্রসার এই প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য ছিল। একইসাথে এই প্রতিষ্ঠানটি আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর আলোকপাত করেছিল, যেমন সামগ্রিকভাবে ব্যক্তিত্বের বিকাশ, নৈতিক মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা ইত্যাদি।
সতীশচন্দ্র সামন্ত যথাক্রমে ১৯৩০ সাল এবং ১৯৪২ সালে সংগঠিত আইন অমান্য আন্দোলন এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল, ১৯৪২ সালে যে ‘তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার’ এবং ‘থানা জাতীয় সরকার’ গঠিত হয়েছিল, তার সর্বাধিনায়ক ছিলেন বিপ্লবী সতীশচন্দ্র সামন্ত। ইতিহাসের নিরিখে, তৎকালীন সময়ে প্রবল ব্রিটিশ শাসনের মধ্যে, একটি সমান্তরাল সংস্থা বা সরকার গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকারের একটি নিজস্ব সংবাদপত্রও ছিল, যার নাম ছিল ‘বিপ্লবী’ (Revolutionary)। এই সরকারের বিবিধ জনকল্যাণমূলক কাজগুলির মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য: বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে ত্রাণের কাজে অংশগ্রহণ করা, বিভিন্ন বিদ্যালয় এবং মহাবিদ্যালয়গুলিতে অনুদান দেওয়া, ‘বিদ্যুৎ বাহিনী’ গড়ে তোলা ইত্যাদি। এই সরকারে যাঁরা গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন তাঁদের মধ্যে প্রমুখ হলেন, সুশীল কুমার ধারা, অজয় মুখার্জী এবং মাতঙ্গিনী হাজরা। সেই সময়ে প্রবল ব্রিটিশ শাসনকে উপেক্ষা করে, বিশেষতঃ দরিদ্র এবং অসহায়, নিপীড়তদের জন্য তথা সামগ্রিকভাবে সকল দেশবাসীর জন্য তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার স্থাপন করেছিল পুলিশ স্টেশন, মিলিটারি ডিপার্টমেন্ট এবং রাজস্ব সংগ্রহ বিভাগ।
এখানে জেনে রাখা প্রয়োজন, সেই সময়ে তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকারের সশস্ত্র শাখা ছিল বিদ্যুৎ বাহিনী। ব্রিটিশ শাসক এবং তার দমনমূলক নীতিগুলির বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লবের দায়িত্বে ছিল এই বাহিনী। এর সদস্যরা ছিল সুপ্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং উচ্চ আদর্শে অনুপ্রাণিত, যারা ভারতমাতাকে স্বাধীন করতে নিজেদের জীবন পর্যন্ত দিতে প্রস্তুত ছিল। স্বদেশ বান্ধব সমিতি, হিন্দুস্তান স্যোশালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন (Hindustan Socialist Republican Association) ইত্যাদির মত অন্যান্য বৈপ্লবিক সংস্থাগুলিকেও সময়ে সময়ে বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছিল এই বিদ্যুৎ বাহিনী।
১৯৪৪ সাল পর্যন্ত তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার সক্রিয় ছিল। বর্তমানে আমরা যে হলদিয়া ডক দেখতে পাই, তাও তাঁরই অবদান। হলদিয়া শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার নেপথ্যে মূল স্থপতি ছিলেন তিনি।
স্বাধীনতা আন্দোলনে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্বদান করার জন্য ইংরেজ শাসক বহুবার সতীশচন্দ্র সামন্তকে গ্রেপ্তার করেছিল। ১৯২০ সালে অসহযোগ আন্দোলন এবং ১৯৩০ সালে আইন অমান্য আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকার জন্য একাধিকবার ব্রিটিশ সরকার তাকে গ্রেপ্তার করেছিল কিন্তু তাঁর অদম্য মনোভাবকে প্রভাবিত করতে পারেনি। পরবর্তীকালেও ১৯৪৩ সালে যখন তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার সক্রিয়ভাবে কাজ করছে, তখনও তিনি ইংরেজ শাসক কর্তৃক কারারুদ্ধ হন, কিন্তু তাঁর গঠন করা সমান্তরাল সরকারের কাজকর্ম থেমে যায়নি কারণ তাঁর কাজ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল তাঁরই প্রশিক্ষিত একদল বিপ্লবী যুবক।
তিনি গভীরভাবে অনুভব করেছিলেন যে শিক্ষা মানবজাতির মেরুদণ্ড। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভ করার পরবর্তীকালে, প্রজাতান্ত্রিক ভারতের স্বাধীন সরকারকে বিভিন্ন শিক্ষাসংক্রান্ত নীতি প্রনয়ণে এবং অন্যান্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ নীতি তৈরি করার ক্ষেত্রে প্রভূত সহায়তা করেছিলেন।
সতীশচন্দ্র সামন্ত ১৯৫২ সালের প্রথম লোকসভা নির্বাচনে তমলুক লোকসভা কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হন এবং পরবর্তীকালে ১৯৫৭, ১৯৬২, ১৯৬৭ এবং ১৯৭১ সালে ধারাবাহিকভাবে পুনর্নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৫২ সাল থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত টানা ২৫ বছর তিনি সম্মানের সঙ্গে সাংসদের দায়িত্ব পালন করেছেন।
শিক্ষা ছাড়াও অন্যান্য ক্ষেত্রেও সতীশচন্দ্র সামন্তের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক সত্ত্বার বাইরে মানবদরদী সতীশচন্দ্র সামন্ত আজীবন সমাজসেবায় নিযুক্ত থেকেছেন। বিভিন্ন সময়ে ম্যালেরিয়া, কলেরাসহ অন্যান্য রোগ ছড়িয়ে পড়লে সেবাকাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এছাড়াও সময়ে সময়ে বিভিন্ন কর্মশালা, অবৈতনিক শিক্ষাদানের আসর আয়োজন করার মত বিবিধ জনকল্যাণমূলক সেবাদানের সঙ্গে নিজেকে জীবনভর জড়িয়ে রেখেছিলেন।
অগ্নিযুগের বীর বিপ্লবী সতীশচন্দ্র সামন্তের মৃত্যু হয় ১৯৮৩ সালের ৪ জুন। পরবর্তীকালে ২০০১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর, ভারত সরকার তাঁর স্মৃতিতে একটি বিশেষ ডাক টিকিট (Letter Stamp) প্রকাশ করেছে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- https://www.pramanaresearch.org/
- https://docslib.org/
- https://medium.com/
- https://www.indianetzone.com/
- https://en.wikipedia.org/
- https://www.biographies.net/
- https://thephilatelist.in/
- https://www.odisha.plus/
- https://theshillongtimes.com/
- https://timesofindia.indiatimes.com/
- https://edurev.in/


আপনার মতামত জানান