সার্জেন্ট বাপি সেন হত্যা মামলা

সার্জেন্ট বাপি সেন হত্যা মামলা

কলকাতার রাজপথে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে অনেক। স্টোনম্যান থেকে শুরু করে আরও অনেক হত্যার রক্তে ভেসেছে কলকাতার সড়ক। প্রতিটি হত্যাকাণ্ড স্বতন্ত্র এবং শোকাবহ হলেও কলকাতা পুলিশ বিভাগের ইতিহাসে সার্জেন্ট বাপি সেন হত্যা মামলা আজও বিশেষভাবে স্মরণীয়। মদ্যপ বাইক-চালকদের হাত থেকে তরুণী যুবতীর লাঞ্ছনা আটকাতে গিয়ে সেদিন বর্ষবরণ-রাতের কলকাতা সাক্ষী থেকেছিল এক নির্ভীক সৎ সার্জেন্টের মৃত্যুর। আইনি গোলযোগের মধ্য দিয়ে বারবার সেই সার্জেন্টকে মদ্যপ এবং দোষী প্রমাণের চেষ্টা করা হলেও সত্য চাপা থাকেনি বেশিদিন। কলকাতা পুলিশেরই রিজার্ভ ফোর্সের কয়েকজন কর্মীর হাতে বেধড়ক মার খেয়ে মারা গিয়েছিলেন কর্তব্যপরায়ণ সেই সার্জেন্ট। এই মামলার মধ্য দিয়ে কলকাতা পুলিশ বিভাগের এক ন্যক্কারজনক অধ্যায়ও প্রকাশ্যে আসে।

২০০৩ সালের ১০ মার্চ কলকাতার নিম্ন আদালতে শুরু হয় বহু বিতর্কিত সার্জেন্ট বাপি সেন হত্যা মামলা। মামলার প্রধান অভিযুক্ত ছিলেন পাঁচজন পুলিশকর্মী  শ্রীদাম বাউরি, মধুসূদন চক্রবর্তী, পীযূষ গোস্বামী, মুজিবুর রহমান এবং শেখর মিত্র। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২, ৩৪ এবং ৩৫৪ নং ধারায় খুনের উদ্দেশ্যে একাধিকের সম্মিলিত পরিকল্পনা এবং শ্লীলতাহানির উদ্দেশ্যে মহিলার উপর বলপ্রয়োগের আইনি অভিযোগ আনা হয়। অভিযুক্তদের দোষী সাব্যস্ত করতে প্রায় ৪১ জন প্রত্যক্ষদর্শীর কাছ থেকে বয়ান সংগ্রহ করেছিল আদালত। পরে মামলাটি উচ্চ আদালতেও যায়। সেখানেও নিম্ন আদালতের রায়কেই প্রাধান্য দিয়ে রায় বহাল রাখা হয়। অভিযুক্তরা পরে এই রায়ের বিরোধিতা করে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করলে সুপ্রিম কোর্ট সেই আবেদন প্রথমেই নাকচ করে দেয়। বাপি সেন হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতের বিচারপতি ছিলেন বাসুদেব মজুমদার। বউবাজার থানায় প্রথমে এই অভিযোগটি দায়ের হয়েছিল এবং এই মামলার তদন্তকারী পুলিশ অফিসারের দায়িত্বে ছিলেন কলকাতা পুলিশের হোমিসাইড শাখার তৎকালীন ইন্সপেক্টর অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়।

বেহালার পর্ণশ্রীর বাসিন্দা নারায়ণচন্দ্র সেন এবং রেণুকা সেনের তিন পুত্রের মধ্যে কনিষ্ঠ পুত্র ছিলেন বাপি সেন। বাবার মত তিনিও পুলিশের চাকরিতে যোগ দেন। ২০০২ সালে এই ঘটনার সময় বাপি সেন টালিগঞ্জের ট্রাফিক গার্ড বিভাগে কর্মরত ছিলেন। সময়টা ২০০২ সালের ৩১ ডিসেম্বর, বর্ষবরণের রাত। পর্ণশ্রী রিক্রিয়েশন ক্লাবে অন্যান্য বন্ধুদের সঙ্গে প্রায়ই রাতে আড্ডা মারতে যেতেন বাপি। সেদিনও ডিউটি সেরে আড্ডাস্থলে গিয়েছিলেন তিনি এবং সেখান থেকে এক বন্ধুর ট্যাক্সিতে চেপে প্রথমে তারাতলায় এক বন্ধুকে গাড়িতে তুলে পার্ক স্ট্রিটের উদ্দেশে রওনা দেন তাঁরা। রাত সাড়ে বারোটার সময় পার্ক স্ট্রিট ঘুরে বাড়ির পথে রওনা দেন বাপিরা। রাস্তায় গাড়ির চাপ অনেক বেশি থাকায় রফি আহমেদ কিদোয়াই রোড ধরে তাঁরা বাড়ি যাওয়ার কথা ভাবেন। ওয়েলিংটনের কাছাকাছি পৌঁছে বাপি গাড়ি থেকে লক্ষ্য করেন একটি চলন্ত মোটরবাইকে থাকা এক যুবক এবং এক যুবতীকে তাড়া করছে ধাবমান একটি ট্যাক্সি। কিছুক্ষণ পরেই বাইক থামিয়ে যুবকটি নেমে আসেন এবং বাইকে থাকা সেই মহিলাকে উদ্দেশ্য করে তখন ট্যাক্সিতে থাকা পাঁচজন যুবক অশ্লীল আচরণ করতে থাকেন। সেই মহিলার গায়ে হাত দেওয়ারও চেষ্টা করেন তারা। নির্ভীক বাপি সেন সেদিন এগিয়ে গিয়েছিলেন মহিলাকে বাঁচাতে। কিন্তু উন্মত্ত সেই পাঁচ যুবককে প্রতিহত করার বদলে তাদের হাতে প্রচণ্ড মার খেয়ে গুরুতরভাবে আহত হন বাপি। বাপির সঙ্গী-সাথীরা চেষ্টা করেও তাদের মারের হাত থেকে বাপিকে বাঁচাতে পারেননি। কথায় কথায় জানা যায় সেই পাঁচজন যুবকও কলকাতা পুলিশের কর্মী। এরই মধ্যে একপ্রকার চুপিসারেই মোটরবাইক চালক এবং সেই যুবতী ঘটনাস্থল থেকে চলে গিয়েছেন। মধ্যরাতের কলকাতার রাস্তায় এক যুবতীর শ্লীলতাহানি রুখতে গিয়ে উন্মত্ত পুলিশকর্মীদের হাতে মার খেয়ে অচৈতন্য হয়ে পড়েছিলেন সার্জেন্ট বাপি সেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় কলকাতা মেডিকেল কলেজে। কিন্তু সেখানে সিটি স্ক্যান করার পরে অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় সিএমআরআই (CMRI) প্রতিষ্ঠানে। সেখানে আইসিইউতে নিউরোসার্জেন অজয় আগরওয়ালের অধীনে বাপি সেনের চিকিৎসা শুরু হয়। ততক্ষণে তাঁর বাড়ির সকলে দুঃসংবাদ পেয়ে গেছেন এবং তা শুনে মেজো ভাই অনুপ ছুটে এসেছিলেন তাঁর কাছে। সেদিন রাত্রে নাইট রাউন্ডের দায়িত্বে থাকা বউবাজার থানার সাব-ইন্সপেক্টর রক্ষাকর মণ্ডল পরদিন সকালে খুঁজে বের করেন ট্যাক্সিচালক মধুকান্ত ঝা-কে আর তার থেকেই জানা যায় অভিযুক্ত পাঁচ পুলিশকর্মীর নাম। পাঁচজনই কলকাতা পুলিশের রিজার্ভ ফোর্সের কনস্টেবল ছিলেন। পুলিশ মেস থেকে গ্রেপ্তার করা হয় মধুসূদন আর পীযূষকে। পরে বাকি তিনজনও নিজে থেকেই আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। পুলিশি হেফাজতে আটক করা হলে পাঁচজনের প্রত্যেকেই অভিযোগ অস্বীকার করলেন। এরই পাশাপাশি ২০০৩ সালের ৬ জানুয়ারি হাসপাতালের আইসিইউতেই মারা যান বাপি সেন। পুলিশকর্মীর হাতেই আরেক পুলিশকর্মীর মৃত্যু কলকাতার ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় সূচিত করল। কলকাতা পুলিশের তৎকালীন হোমিসাইড শাখার ইন্সপেক্টর অতনু বন্দ্যোপাধ্যায় এই রহস্যভেদের দায়িত্ব নেন এবং অভিযুক্তদের যোগ্য শাস্তি দেওয়ার জন্য তৎপর হয়ে ওঠেন। সব তথ্যপ্রমাণ সাজিয়ে ২০০৩ সালের ১০ মার্চ কলকাতার নিম্ন আদালতে দায়ের করা হয় সার্জেন্ট বাপি সেন হত্যা মামলা। অদ্ভুতভাবে সেদিন যে মহিলা পুলিশকর্মীদের হাতে নিগৃহীতা হয়েছিলেন, তাকে কোনওভাবেই খুঁজে পাওয়া গেল না, ফলে তার জরুরি বয়ানও পাওয়া যায়নি সমগ্র মামলায়। নগরপাল এ ব্যাপারে সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি জারি করে সেই যুবতীকে প্রকাশ্যে আসার অনুরোধ করলেও তিনি আর কখনই প্রকাশ্যে আসেননি।

মামলা চলার সময় অভিযুক্তদের আইনজীবী সম্পূর্ণ মিথ্যে ঘটনা সাজিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে বাপি সেন সেদিন নিজেই মদ্যপ ছিলেন এবং ট্যাক্সিচালকের কাছে লাইসেন্স দেখতে চেয়েছিলেন তিনি। ট্যাক্সিচালক তা দেখাতে অস্বীকার করলে চলন্ত ট্যাক্সিতে উঠতে গিয়ে ট্রামলাইনে পড়েই নাকি বাপি সেন গুরুতর আহত হন এবং পরে মারা যান। মিথ্যে ঘটনার প্রমাণ হিসেবে সেই রাত্রে মেডিকেল কলেজের আউটডোরের টিকিট তথ্য হিসেবে পেশ করা হয় যাতে মদ্যপানের উল্লেখ ছিল। এমনকি এটাও বলা হয়েছিল যে সেদিন রাত্রে ঘটনাস্থলে রাত সোয়া একটার সময় নাকি অভিযুক্তদের হুবহু চেনার জন্য যথেষ্ট আলোই ছিল না। অতনু বন্দ্যোপাধ্যায় হাল ছাড়েননি। এর বিরোধিতায় বাপি সেনের হয়ে বয়ান দিয়েছিলেন ফরেন্সিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. অজয় গুপ্ত। তাঁর মতে যে ধরনের ক্ষতচিহ্ন পাওয়া গিয়েছিল বাপি সেনের দেহে এবং মাথার খুলিতে, তা থেকে স্পষ্ট হয় যে খুন করার উদ্দেশ্যেই তাঁকে লাথি-চড়-ঘুষি মারা হয়েছিল, নিছক গাড়ি থেকে ট্রামলাইনে পড়লে আঘাত এত তীব্র হত না। পরে জানা যায় যে, আউটডোরের সেই টিকিটে উদ্দেশ্য-প্রণোদিতভাবে ভুল তথ্য আলাদা করে লিখে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি সেই রাত্রে ঘটনাস্থলে যথেষ্ট আলো না থাকার তত্ত্বটিও ভুল প্রমাণিত হয় সিইএসসি দপ্তরের প্রধান ইঞ্জিনিয়ারের বয়ানের ভিত্তিতে। ২০০৪ সালের ১ জুলাই কলকাতার নিম্ন আদালত সার্জেন্ট বাপি সেন হত্যা মামলা সংক্রান্ত রায় ঘোষণা করে যাতে বাপি সেনকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে খুনের দায়ে অভিযুক্তদের দোষী সাব্যস্ত করে তাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ট্যাক্সিচালক মধুকান্ত ঝা এবং তার সহকারী মেওয়ালাল গুপ্তাকে আদালতে মিথ্যে সাক্ষ্য দেওয়ার অপরাধে মামলা চলাকালীন পুলিশি হেফাজতে আটক থাকার সাজা দেয় আদালত। এর পাশাপাশি যুবতীর শ্লীলতাহানির চেষ্টার দায়ে প্রত্যেক অভিযুক্তকে ১০ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়। মামলা উচ্চ আদালতে উঠলে সেখানেও এই রায় এবং সাজা বহাল রাখা হয়। সর্বমোট ৪১ জন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য ও বয়ান নেওয়া হয়েছিল এই মামলার রায় ঘোষণার জন্য। নিরাপত্তারক্ষী গণেশ বারিক এবং সমীর ঘোষ এই মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, তারা ছিলেন সেদিনের ঘটনার একেবারে অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী। আদালত রায়ে স্পষ্টই লিখেছিল যে কেবলমাত্র দোষীদের বয়স বিবেচনা করে তাদের প্রাণদণ্ড দেওয়া হয়নি।

সার্জেন্ট বাপি সেন হত্যা মামলা কলকাতা পুলিশ বিভাগের ইতিহাসে এক ন্যক্কারজনক অধ্যায়। এই মামলার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সেই নিগৃহীতা যুবতীর প্রকাশ্যে না আসা নিয়েও পরে অনেক সমালোচনা হয়েছে সংবাদপত্রের পাতায়। ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আইনি টানাটানি কিংবা সমাজের কাছে হাজারও অস্বস্তিকর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আতঙ্কেই হয়ত এমনটা সম্ভব বলে অনেকে মনে করেছেন। তাঁকে বাঁচাতে গিয়ে এভাবে এক নিরপরাধ পুলিশ সার্জেন্টের প্রাণহানি আজও কলকাতা শহরের বুকে এক একটা ক্ষত হয়ে থেকে গিয়েছে।   

তথ্যসূত্র


  1. সুপ্রতিম সরকার, 'গোয়েন্দাপীঠ লালবাজার', আনন্দ, ২০১৮, কলকাতা, পৃষ্ঠা ১২৬-১৩৫
  2. https://www.dnaindia.com/
  3. https://timesofindia.indiatimes.com/
  4. https://zeenews.india.com/
  5. https://www.casemine.com/
  6. https://www.anandabazar.com/

আপনার মতামত জানান