সববাংলায়

সিদ্ধিবিনায়ক মন্দির

ভারতের ‘বাণিজ্য নগরী’ মুম্বাই যে ইতিহাস ও সংস্কৃতি সমৃদ্ধ একটি বিখ্যাত শহর, তার নিদর্শন দেখা যায় সিদ্ধিবিনায়ক মন্দিরের (Siddhivinayak Temple) মধ্যে। ভগবান গণেশের উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত, মুম্বাইয়ের প্রভাদেবী এলাকায় অবস্থিত এই মন্দিরটি মুম্বাইয়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় হিন্দু মন্দির। সিদ্ধিবিনায়ক মন্দির মুম্বাই শহরের সবচেয়ে ধনী মন্দির বলেও মনে করা হয়, কারণ এই মন্দিরের বার্ষিক আয় প্রায় দশ থেকে পনেরো কোটি টাকা। এই মন্দিরটি সমগ্র ভারতের মানুষ এবং পর্যটকদের হৃদয়ে একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে রয়েছে। মন্দিরের ধর্মীয় তাৎপর্যের কারণে সাধারণ মানুষ থেকে চলচ্চিত্র তারকা এবং বড় বড় শিল্পপতিরা পর্যন্ত এই মন্দিরে নিয়মিত যাতায়াত করেন। এছাড়া প্রতি বছর গণেশ চতুর্থীতে হাজার হাজার তীর্থযাত্রী এই মন্দিরে সিদ্ধিবিনায়কের দর্শন করতে আসেন।

মুম্বাইয়ের দেউবাই পাতিল (Deubai Patil) ছিলেন মাতুঙ্গার কৃষি সমাজের একজন নিঃসন্তান ধনী মহিলা। তিনি নিজের মতো অন্যান্য দুঃখী বন্ধ্যা মহিলাদের কষ্ট অনুভব করে তাদের ইচ্ছা পূরণের জন্য একটি সিদ্ধিবিনায়ক মন্দির নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। দেউবাই পাতিল নিজে সন্তান সুখ না পেলেও বিনীতভাবে ভগবান গণেশকে অনুরোধ করেন যাতে ওই মন্দিরে আগত সকল নিঃসন্তান মহিলাকে গণেশ সন্তান প্রদান করেন। আর মনে করা হয় যে সিদ্ধিবিনায়ক তাঁর পবিত্র চিন্তাভাবনায় প্রসন্ন হয়ে ওই মন্দিরে চিরকালের জন্য অধিষ্ঠিত থেকে সকল ভক্তের মনোবাঞ্ছা পূরণ করার সিদ্ধান্ত নেন। এই কারণে মন্দিরের সিদ্ধিবিনায়ক মারাঠি ভাষায় বিখ্যাত ‘নবসাচা গণপতি’ বা ‘নবশালা পবনর গণপতি’ নামেও পরিচিত অর্থাৎ তিনি হলেন ইচ্ছা পূরণকারী গণপতি। বিশ্বাস করা হয় যে সিদ্ধিবিনায়কের থেকে কোন ভক্ত খালি হাতে ফেরেন না।

সিদ্ধিবিনায়ক মন্দির সম্পর্কে আরও একটি গল্প প্রচলিত আছে। মুম্বাইয়ের প্রভাদেবী এলাকায় বসবাসকারী শ্রী রামকৃষ্ণ জাম্ভেকর ছিলেন শ্রী আক্কালকোট স্বামী সমর্থের শিষ্য। জাম্ভেকর মহারাজ ছিলেন গণেশের অন্যতম এক মহান ভক্ত। তাঁরা দুজনে বটবৃক্ষের নীচে ঘন্টার পর ঘন্টা নানা আধ্যাত্মিক আলোচনা করতেন। স্বামী সমর্থ তাঁর শিষ্য রামকৃষ্ণ জাম্ভেকর মহারাজকে অপার স্নেহও করতেন। কথিত আছে যে, এক রাতে যখন জাম্ভেকরকে স্বামী সমর্থ জিজ্ঞাসা করেন, যে, সে কী পেতে চায় তখন জাম্ভেকর নিজের জন্য কিছু না চেয়ে শ্রী সিদ্ধিবিনায়কের মহিমাকে আরও ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। এই কথা শুনে স্বামী সমর্থ আনন্দিত হন এবং প্রভাদেবীর শ্রী সিদ্ধিবিনায়কের কাছে গিয়ে তাঁকে মন্দারের একটি চারা রোপণ করার কথা বলেন। তিনি আরও বলেন যে, ওই মন্দার গাছ যেমন ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাবে তেমনই সিদ্ধিবিনায়কের মহিমাও বৃদ্ধি পাবে। এরপর জাম্ভেকর নিজের কাজ সম্পন্ন করে সিদ্ধিবিনায়কের কাছে প্রার্থনা করলে সিদ্ধিবিনায়কের মহিমা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে বলে মনে করা হয়।

১৮০১ সালের ১৯ নভেম্বর মুম্বাইয়ের এই সিদ্ধিবিনায়ক মন্দির ঠিকাদার লক্ষণ বিঠুর (Laxman Vithu) তদারকিতে ও দেউবাই পাতিলের অর্থানুকুল্য ও নির্দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯৯০ সালে মহারাষ্ট্র সরকারের উদ্যোগে ভক্ত ও উপাসকদের নিয়ন্ত্রণের জন্য এই মন্দিরটি সংস্কার করা শুরু হয় ও ১৯৯৪ সালে সংস্কার শেষে সিদ্ধিবিনায়ক মন্দির আধুনিক রূপে সজ্জিত হয়।

জটিল খোদাই এবং অনুপম নকশা হল সিদ্ধিবিনায়ক মন্দিরের অন্যতম আকর্ষণীয় বিষয়। এই মন্দিরের গর্ভগৃহের কাঠের দরজাগুলিতে মহারাষ্ট্রের গণেশের আটটি রূপ অষ্টবিনায়কের ছবি খোদাই করা আছে। ওই গর্ভগৃহের ভিতরের ছাদ সম্পূর্ণ সোনা দিয়ে মোড়ানো। তাছাড়া এই মন্দিরের গর্ভগৃহকে অত্যন্ত পবিত্র এবং শান্তিময় পরিবেশ বলে মনে করা হয়। ২৫৫০ বর্গফুট জায়গা জুড়ে অবস্থিত ইটের তৈরি এই মন্দিরের উপরে রয়েছে একটি কলস। এই মন্দিরে সিদ্ধি নামক জনবহুল প্রধান দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে কোনও অর্থ প্রদান করতে হয় না, তবে শান্তিপূর্ণ রিদ্ধি গেট দিয়ে প্রবেশ করতে গেলে অর্থ প্রদান করতে হয়।

পূর্বে এই মন্দিরের কাঠামোটি খুবই ছোট ছিল, সর্বাধিক ১৫-২০ জন দর্শনার্থী সিদ্ধিবিনায়কের দর্শন করতে পারত। কিন্তু পরবর্তীকাল ভগবানের দর্শনের জন্য ক্রমবর্ধমান ভক্তসংখ্যার জন্য নানা সমস্যা দেখা দিত। তাই সহজ ও দ্রুত দর্শন, ভগবানের সেবা-ভক্তি-সন্তুষ্টি, নৈবেদ্য প্রদান এবং বিভিন্ন ধর্মীয় প্রক্রিয়ার সুবিধা প্রদানের জন্য পুরাতন মন্দির কাঠামোটি সম্প্রসারণ ও সংস্কার করানো হয়। বর্তমান মন্দিরটি হল পাঁচতলা কাঠামোবিশিষ্ট আর ষষ্ঠ তলা হল মন্দিরের চূড়া। মন্দিরের প্রথম তলায় মূলত সিদ্ধিবিনায়কের পুজো করা হয়, দ্বিতীয় তলায় নৈবেদ্য তৈরি করা হয়, তৃতীয় তলায় রয়েছে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সদস্য কক্ষ, চতুর্থ তলার লাইব্রেরীতে রয়েছে ধর্ম,অর্থনীতি, চিকিৎসাশাস্ত্রসহ প্রায় ৮ হাজারের বেশি বই। এছাড়া পঞ্চম তলায় মন্দিরের অনুষ্ঠানের সময় রান্না করা হয়, আর ষষ্ঠ তলায় রয়েছে মন্দিরের চূড়া, যা শক্তি ও ঐশ্বরিকতার প্রতীক। যে সকল ভক্তরা গনেশের মূর্তিটির দর্শন পান না তারা ওই চূড়া দেখে প্রার্থনা করে। মন্দিরের বাইরের অংশে একটি গম্বুজ রয়েছে যা প্রতি সন্ধ্যায় বিভিন্ন রঙের আলোয় সজ্জিত করা হয় ও কয়েক ঘন্টা অন্তর তা পরিবর্তন করা হয়। আর ওই গম্বুজের চারপাশে গ্রিল দিয়ে একটি প্যারাপেট প্রাচীর রয়েছে, সিদ্ধিবিনায়কের মূর্তিটি ছোট মণ্ডপে গম্বুজের ঠিক নীচেই অবস্থিত। মন্দিরের নীচের তলায় ১৩-১৪ ফুট লম্বা প্রশস্ত একটি মণ্ডপ রয়েছে যেখান থেকে ভক্তরা ভগবানের শুভ দর্শন লাভ করেন। এছাড়া মন্দিরের ধর্মশালার জন্য রয়েছে একটি বৃহৎ বিশ্রামাগার।

মন্দিরের গর্ভগৃহে মূল দেবতার দুপাশে সবুজ শাড়ি পরিহিতা ঋদ্ধি এবং সিদ্ধির মূর্তি রয়েছে। এখানে এই দুই দেবী স্থিরতা, পবিত্রতা, সাফল্য, সম্পদ, সমৃদ্ধি, পরিপূর্ণতা ও শান্তির প্রতীক হিসাবে পূজিত হয়। এছাড়া এই মন্দিরের কাছে একটি হনুমান মন্দিরও রয়েছে। আবার এই মন্দিরে যাতে জলের অভাব না হয় তাই মন্দিরের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে একটি হ্রদ ছিল, তবে উনিশ শতকের শেষ দিকে ওই হ্রদটি ভরাট করে দিয়ে তা এখন খেলার মাঠ এবং কাকাসাহেব গাডগিল মার্গের একটি অংশ হয়ে গেছে।

সিদ্ধিবিনায়ক মন্দিরের কেন্দ্রীয় মূর্তিটি হল ভগবান গণেশের। মূর্তিটি একটি কালো পাথর দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল, যার শুঁড় ডানদিকে বাঁকানো। পুরো মূর্তিটি গেরুয়া রঙের এনামেল দিয়ে মোড়ানো এবং সোনার মুকুট দ্বারা সজ্জিত। এই মন্দিরে আড়াই ফুট উচ্চতার গণেশের মূর্তির চারটি হাত রয়েছে, যার উপরের ডান হাতে একটি পদ্মফুল আর বাম হাতে একটি কুঠার আছে। অন্যদিকে ওই মূর্তির নীচের ডান হাতে জপমালা এবং নীচের বাম হাতে সিদ্ধি বিনায়কের প্রিয় খাবার মোদক ভরা বাটি রয়েছে। এছাড়া দেবতার কপালে ভগবান শিবের মতো একটি তৃতীয় চোখ খোদাই করা আছে আর গলায় আছে যজ্ঞোপবিত পবিত্র সুতোর মতো একটি সাপ।

এই মন্দিরে সারা বছর নানা ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়, তার মধ্যে অন্যতম হলো সংকষ্টী চতুর্থী ও গণেশ চতুর্থী। এছাড়া এই মন্দিরে রাম নবমী, হনুমান জয়ন্তী, অক্ষয় তৃতীয়া, গোকুল অষ্টমী, নবরাত্রি, কার্তিক একাদশীর জন্য নানা অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। বিশাল ভিড় আটকানোর জন্য এই মন্দিরে অনলাইনের মাধ্যমে ভগবানের দর্শন লাভ করারও সুযোগ রয়েছে ।

ভক্তরা নিয়মিতভাবে এই মন্দিরে সোনার বিভিন্ন অলঙ্কার, সোনার বার, মুদ্রা ইত্যাদি ভগবানের চরণে দান করেন, যা প্রকাশ্যে নিলামে বিক্রি করে মন্দির কর্তৃপক্ষ অর্থ সংগ্রহ করে। অনেকে বিশ্বাস করে যে এই মন্দিরে কোন অবিবাহিত দম্পতির প্রবেশ করা একেবারে উচিত নয়। এই মন্দিরে মোবাইল ফোন ও ক্যামেরা নিয়ে প্রবেশ একেবারে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মন্দিরে প্রবেশের জন্য ভক্তদের একটি নির্দিষ্ট পোশাকবিধি অনুসরণ করার প্রস্তাব ২০১৫ এসেছিল যা পরে খারিজ করা হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading